kalerkantho

পাহাড়ে চাঁদাবাজি

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাহাড়ে চাঁদাবাজি

চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পাহাড়ের মানুষ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে প্রান্তিক চাষি কারো রেহাই নেই। কথামতো চাঁদা না পেলে অপহরণ ও জিম্মি করে চলছে চাঁদাবাজি। আর অস্বীকৃতি জানালে ঘটছে খুনের ঘটনাও।

খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙায় চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরাই ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্তকে খুন করেছে বলে পরিবারের অভিযোগ। আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ওই ঘটনায় আঞ্চলিক একটি সংগঠনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছে। পানছড়িতে দুই ঠিকাদার অপহরণের সঙ্গেও একই সংগঠন জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা। তবে এমন অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আঞ্চলিক সংগঠনটির নেতারা।

খাগড়াছড়িতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুটি অপহরণ ও একটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। পানছড়ির তালতলা এলাকা থেকে দুই ঠিকাদারকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের ৯ দিন পর সামাজিক মধ্যস্থতায় মুক্তিপণের বিনিময়ে তাঁদেরকে ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা।

জানা গেছে, এলজিইডির আওতায় পানছড়ি-গৌরাঙ্গপাড়া সড়কের মরাটিলা পর্যন্ত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজে বড় অংকের চাঁদা দাবি করে স্থানীয় অস্ত্রধারী চাঁদাবাজরা। ওই কাজের ঠিকাদার নাসির উদ্দিন মল্লিক অভিযোগ করেন, চাহিদা মতো চাঁদা পরিশোধে গড়িমসির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ দিয়ে আসছিল সন্ত্রাসীরা। ডেকে নিয়ে দুজনকে ওরা জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণের ওই ঘটনার জন্য অভিযোগের তীর ছিল স্থানীয় একটি আঞ্চলিক সংগঠনের দিকে।

এদিকে মানিকছড়ির বড়ডলু হতে অপহরণের একমাসেও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোরশেদের (২২) খোঁজ মেলেনি। গত ৯ মার্চ জেলা সদরের গিরিফুল নামক এলাকায় মো. স্বপন নামে একজন ফেরিওয়ালা নিখোঁজ হয়েছেন। এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। অবশ্য দুটি ঘটনায় কে বা কারা জড়িত তা কেউ নিশ্চিত করে জানায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পে টাকার পরিমাণ খোঁজ নিয়ে চাঁদার শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। শুধু উন্নয়ন কাজে নয়, পরিবহন সেক্টরে বিভিন্ন সংগঠনের নামে বছরওয়ারি চাঁদা নেওয়া হয়। পাহাড়ি কয়েকটি সংগঠনের ‘টোকেন’ ছাড়া সড়কে গাড়ি ওঠতেই পারে না। চাঁদা না দিলে ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চাঁদাবাজির প্রতিবাদে জেলার পরিবহন সংগঠনগুলো সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচিও পালন করে। প্রশাসনকে আল্টিমেটাম বেঁধে দেওয়া হয়। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কম্পানিগুলো বার্ষিক চাঁদা দিয়েই ওষুধ পরিবহন করতে পারে। এমন কি ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিয়েই করেন ব্যবসা।

শুধু তাই নয়, রামগড়, মানিকছড়ি, লক্ষ্মীছড়িসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদার জন্য গাছ কেটে ফেলা ও আগুন দেওয়ার মতো নতুন ধরনের কৌশল নিয়েছে চাঁদাবাজরা। রামগড় ও মানিকছড়িতে বেশ কয়েকটি বাগানের গাছ কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা।

খাগড়াছড়ি পরিবহন মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব মো. ইউনুছ বলেন, ‘এখন চাঁদাবাজি কমেনি। চাঁদাবাজির ধরন পাল্টে গেছে। প্রকাশ্যের বদলে লুকিয়ে লুকিয়ে চলছে। কে বা কারা চাঁদা দিচ্ছে, কোথায় দিচ্ছে; তাও আমাদের জানানো হয় না। ফলে বছরে পরিবহন সেক্টর হতে কত অংকের চাঁদাবাজি ঘটছে তা বলা মুশকিল। ’

পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের নেতা ও খাগড়াছড়ি পৌরসভার কাউন্সিলর আব্দুল মজিদ অভিযোগ করে বলেন, ‘সারা জেলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি থেকে শুরু করে সবাইকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলের চালকরাও তা থেকে নিস্তার পান না। ’ তিনি এসব চাঁদাবাজির জন্য আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতিকে (এমএন লারমা) দায়ী করেন।

চাঁদার জন্য খুন হন শান্ত! : গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজের পর ২১ ফেব্রুয়ারি রিছাংঝর্না এলাকায় গহিন জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্তর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা ছালে আহমদ কয়েকজনের নামে মামলা করেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত দুজনকে আটক করে।

ছালে আহমদ বলেন, ‘দাবিকৃত চাঁদা না পাওয়ায় হাকিমকে খুন করেছে সন্ত্রাসীরা। ওরা দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। ’ তিনি চাঁদাবাজদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে বলেন, ‘আর কারো ভাগ্যে যেন এমন পরিণতি না ঘটে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকার রাখতে হবে। ’

মাটিরাঙা থানার ওসি সাহাদাত হোসেন টিটো বলেন, ‘চাঁদা নাকি মোটরসাইকেল চুরির জন্য আজিজুল হাকিম শান্তকে খুন করা হয়েছে-বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কারা খুনের ঘটনায় জড়িত তা অনেকটা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। যে দুই জনকে এখনো গ্রেপ্তাার করা সম্ভব হয়নি, তাদের মধ্যে একজন ইউপিডিএফের সক্রিয় সদস্য বলে নিশ্চিত হয়েছি। ’

চাঁদাবাজি ও অপহরণ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনগুলো। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার দপ্তরের সমন্বয়কারী নিরন চাকমা বলেন, ‘ইউপিডিএফের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে এই ধরনের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হচ্ছে। ’ এটি প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মাটিরাঙায় মোটরসাইকেল চালক খুনের ঘটনায় ইউপিডিএফর কোনো সমর্থক জড়িত নন। ’ তিনি ওই ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা দলীয় নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয় অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের দল একটি গণতান্ত্রিক দল। চাঁদাবাজদের কোনো স্থান নেই। অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ’


মন্তব্য