লবণবাহী ট্রলারে চাঁদাবাজি সুযোগ-335200 | দ্বিতীয় রাজধানী | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


মেঘনা নদীর তিন স্থান

লবণবাহী ট্রলারে চাঁদাবাজি সুযোগ বুঝে ডাকাতি

আসিফ সিদ্দিকী   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মেঘনা নদীর তিন স্থানে ডাকাতি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যমুখী লবণবাহী ট্রলার। নদীর চর গজরিয়া, আলেকজান্ডার ও কটরিয়া মাছঘাট এলাকা অতিক্রমের সময় একদল যুবক অস্ত্রের মুখে মাঝি-মাল্লাকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করছে। সুযোগ বুঝে ডাকাতিও করা হচ্ছে। চাঁদা নেওয়ার সময় এরা ‘জল পরিবহন কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের’ নাম ব্যবহার করছে।

এ প্রসঙ্গে লবণ পরিবহনে নিয়োজিত চট্টগ্রাম কার্গো ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মকছুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই তিন স্থান পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির ট্রলারে এসে কিছু সশস্ত্র যুবক লবণবাহী ট্রলারের মাঝি-মাল্লাদের জিম্মি করে চাঁদাবাজি করছে। সুযোগ বুঝে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি আবার চাঁদা না দিলে অপহরণও করা হচ্ছে।’

তিনি জানান, ‘জল পরিবহন কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের’ নামে এই চাঁদাবাজি চলছে। কথিত রসিদে ২০০ টাকা লেখা হলেও আদায় করা হচ্ছে দুই হাজার টাকা! ওই চক্রের কাছে লবণ পরিবহনকারীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি পুলিশের চট্টগ্রামের ডিআইজি ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

লবণবাহী ট্রলারের মালিক ও শ্রমিকরা জানান, দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদনকারী অঞ্চল কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা। চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালীতেও কিছু লবণ উৎপাদন হয়। সড়কপথে লবণ পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সব লবণ নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঠের বোটে (ট্রলার) পরিবহন হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের পশ্চিম পটিয়ার শাহমীরপুর থেকে লবণবাহী ট্রলারগুলো মেঘনা নদী হয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এই ধরনের ট্রলারের সংখ্যা ১৭০টির মতো।

জানা গেছে, প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি ট্রলার জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে মেঘনা নদীর ওই তিন স্থান হয়ে চলাচল করতে গিয়ে কখনো রাত আবার কখনো খুব ভোর হয়ে যায়। এসব এলাকা অতিক্রম করতে গিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে ট্রলারগুলো।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ২০১৪ সালের ৬ মার্চ জল পরিবহন কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিনকে ডাকাতির সময় কোস্টগার্ড হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। সেই ঘটনায় কমলনগর থানায় একটি ফৌজদারি মামলা হয়। আদালত তাঁকে জেলে পাঠায়। পরে তিনি জামিনে এসে আবার একই কৌশলে ‘চাঁদাবাজি-ডাকাতি’ করে আসছেন।

চট্টগ্রাম জল পরিবহন কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেঘনা নদীতে নিরাপত্তার জন্য শ্রমিকদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি ছোট নৌকায় তাঁরা ৭/৮ জনে বিভক্ত হয়ে পাহারা দেন। এ জন্য শ্রমিকরা কেউ ১০ টাকা, আবার কেউ ৫০ টাকা করে চাঁদা দেন।’

২০০ থেকে ২০০০ টাকা আদায়ের ঘটনা সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন। ট্রলার থামিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে কেন জানতে চাইলে নুর উদ্দিন বলেন, ‘ওটা শ্রমিকদের চাঁদা নয়, পাহারা দেওয়ার খরচ। কিন্তু কোস্টগার্ড ও পুলিশ থাকার পরও তাঁদের নিরাপত্তা কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনুমতি নিয়েই আমরা কাজটি করেছি।’ তবে খবর নিয়ে জানা গেছে, এই ধরনের কোনো অনুমতি প্রশাসনের নেই।

চট্টগ্রাম কার্গো ট্রলার মালিক সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদা আদায় করতে হলে সশস্ত্র অবস্থায় মাঝরাতে ট্রলার থামিয়ে কেন করতে হবে? আর বৈধ শ্রমিক সংগঠন হলে সদস্যরাই চাঁদা পরিশোধ করবে। সেটি মালিকদের কাছ থেকে কেন আদায় হবে! আমরা এ ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

মেঘনা নদীর ওই এলাকা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের আওতাভুক্ত। এ বিষয়ে কোস্ট গার্ডের অপারেশন্স অফিসার লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রামগতি পয়েন্টে রাতে টহল বাড়ানোর কারণে আগের চেয়ে চাঁদাবাজি-ডাকাতি কমেছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশাল এলাকায় সীমিত লোকবল ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছি।’

অভিযোগ রয়েছে, রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ‘জল পরিবহন কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করা হয়েছে। চাঁদাবাজির বৈধতা দিতে এটি একটি নতুন কৌশল। কারণ সংগঠনটির অফিস চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে। ট্রলারগুলো অবস্থান করে মাঝিরঘাটের কাছাকাছি এলাকায়। ফলে চাঁদা আদায় করতে মেঘনায় যাওয়ার সুযোগ নেই।

শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন থেকে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম অফিসের উপ-শ্রম পরিচালক নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সদস্যদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের বিষয়টি অবহিত হয়েছি। বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করে দেখব। যদি সত্য প্রমাণিত হয়, অবশ্যই সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়নের ব্যানারে এই ধরনের চাঁদা আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ। শুনেছি, এর আগেও সংগঠনটির সভাপতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হয়েছেন।’

মন্তব্য