kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

মাতামুহুরী নদীর রাবার ড্যাম

শনির দশা কাটছেই না

এই নিয়ে চতুর্থবার ছিঁড়ে গেছে রাবার

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শনির দশা কাটছেই না

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাবার ড্যামের রাবার ছিঁড়ে যায়। এতে নদীতে ঢুকে পড়ছে সাগরের লবণপানি। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর বাঘগুজারায় নির্মিত রাবার ড্যামের শনির দশা কাটছেই না। ড্যামটির অদূরে যন্ত্র বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে এবং অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে চতুর্থবারের মতো  রাবার ছিঁড়ে গেছে।

২৩৩ দশমিক ৫০ মিটার দীর্ঘ রাবার ড্যামটি দেশের সবচেয়ে বড়।

গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাবারের জোড়া ছিঁড়ে গেলে নদীতে প্রবেশ করছে লবণাক্ত পানি। এই অবস্থায় চলতি আমন মৌসুমে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের ৫০ হাজার একর জমির চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, ড্যামটির বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হবে। এর পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে ড্যামটির ছিঁড়ে যাওয়া রাবার জোড়া লাগানো যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ড্যামটির রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এটিএম জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জিয়া। তিনি বলেন, ‘দেশের বৃহত্তম এই ড্যাম নির্মাণের সময় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। এ কারণে বার বার বিপর্যয় ঘটছে। একই সময়ে নদীর পালাকাটা-রামপুর পয়েন্টে নির্মিত ড্যামটির এখনো এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়নি। নিম্নমানের কাজ হওয়ায় এবং প্রায় দুমাস ধরে শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে বার বার বিপর্যয় ঘটছে বাঘগুজারা রাবার ড্যামে। ’

চেয়ারম্যান জিয়া আরো বলেন, ‘চতুর্থবারের মতো বাঘগুজারা ড্যামটির রাবার ছিঁড়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের ৫০ হাজার একর জমির আমন চাষাবাদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ড্যামের রাবার ছিঁড়ে যাওয়ার খবরে কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাই টেকসইভাবে ড্যামটির রাবার পুনঃস্থাপনের জন্য কৃষকদের পক্ষে জোর দাবি জানাচ্ছি। ’

বাঘগুজারা ড্যামের কেয়ারটেকার আবদুর রহিম বলেন, ‘সামুদ্রিক অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির তোড়ে ও ড্যামের তলানির বেইজের পাইলিংয়ের গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়ার কারণে চার স্প্যানের মধ্যে দ্বিতীয় স্প্যানের রাবারের জোড়া ছিঁড়ে নদীতে ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়ছে লবণ পানি। জোয়ারের পানির চাপ এতই প্রবল যে, অন্য তিন স্প্যানের রাবারের জোড়াও ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওকে জানিয়েছি। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাতামুহুরী নদীর বাঘগুজারা পয়েন্টে নির্মিত দেশের বৃহত্তম রাবার ড্যামটির একেবারে কাছ থেকে শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে প্রায় দুমাস ধরে বালু উত্তোলন করছিল ১২ সদস্যের একটি প্রভাবশালী চক্র। স্থানীয় ও কৃষকদের ভাষ্যানুযায়ী, ড্যামের একেবারে কাছ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে চতুর্থবারের মতো ছিঁড়ে গেল রাবারের জোড়া। তার ওপর সামুদ্রিক অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ও রয়েছে। বালু উত্তোলনের কারণে এতদিন ধরে রাবারের জোড়া একটু একটু খুলে এবং ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়ছিল ধরে রাখা নদীর মিঠাপানি।

পেকুয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ চৌধুরী রাজু বলেন, ‘বাঘগুজারা রাবার ড্যামের ধরে রাখা মাতামুহুরী নদীর মিঠাপানি দিয়ে পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়নের কৃষকেরা প্রতিবছর চাষাবাদ করেন। কিন্তু বার বার এই ড্যামটির বিপর্যয় কেন ঘটছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সেচসমস্যা দূর করতে প্রায় ৪০ বছর পর অনেক দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ড্যামটি নির্মাণ করলেও প্রতিবছর একাধিকবার ড্যামটির রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যাওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত ওঠছে। বার বার এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিতে ড্যামটির স্থায়ী সমাধান চান কৃষকেরা। ’

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘চতুর্থদফায় বাঘগুজারা রাবার ড্যামের রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যাওয়ার খবর শুনেছি। ছিঁড়ে যাওয়া রাবার দ্রুত জোড়া লাগাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছি। ’

চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলম বলেন, ‘আমন চাষাবাদের মোক্ষম সময়ে বাঘগুজারা ড্যামের রাবার ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। ড্যামটি দ্রুত কার্যকর না করলে ৫০ হাজার একর জমিতে রোপিত আমন ক্ষেতের ফসল গোলায় তুলতে পারবেন না কৃষক। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছি। ’

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, ‘বাঘগুজারা ড্যামের রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ড্যামস্থলে উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পাঠানো হয়েছে। তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করে দেওয়া প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে এবং চলতি আমন মৌসুমের মোক্ষম সময়ের সেচ সমস্যার বিষয়টি মাথায় রেখে জরুরীভিত্তিতে ড্যামটি কার্যকরের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ’

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর দুই পয়েন্টে রাবার ড্যাম দুটি নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। পারিশা অ্যান্ড কম্পানি এবং ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্যাম দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করলে ২০১২ সালে উদ্বোধন করেন তত্কালীন পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। দেশের বৃহত্তম বাঘগুজারা ড্যামটি উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত চারবার রাবারের জোড়া ছিঁড়ে যায়।

উল্লেখ্য, বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়া এই ড্যাম নিয়ে সমপ্রতি কালের কণ্ঠে ‘বালুখেকোদের পৌষমাস, চাষির সর্বনাশ’ শিরোনামে ছবিসহ একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।


মন্তব্য