kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি

‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। ’ বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ওই কবিতায় উঠে এসেছে নদীমাতৃক আবহমান বাংলার চিত্র।

কিন্তু ছোট ফেনী নদীর তীরে দেখা যায় এর ব্যতিক্রম। বৈশাখ আসতে এখনো মাস দেড়েক বাকি। এর মধ্যেই শুকিয়ে চৌচির নদীর বিশাল এলাকা। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নদীটির নাব্যতা না থাকায় চাষাবাদ করতে পারছেন না স্থানীয় ৩২ হাজার কৃষক। অনাবাদি রয়েছে চার হাজার হেক্টর জমি।

শীত মৌসুমে নদীর তলদেশ শুকিয়ে থাকায় ইরিচাষ ও রবিশস্য চাষ করতে পারেন না এখানকার কৃষক। অপরদিকে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আমন চাষও ব্যাহত হয়। এছাড়া নদীতে পানি না থাকায় হাজার হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন।

ফলে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাঁরা। ছোট ফেনী নদী চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী থেকে শুরু হয়ে নোয়াখালীর সন্দ্বীপ চ্যানেলে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। নদীর ফেনীর অংশে কুমিল্লার গুনবতী ব্রিজ থেকে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত ৬০ কি.মি. নদী। এই নদীর সাথে ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলার ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর চাষাবাদ উপযোগী জমি রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট ফেনী নদীর নাব্যতা না থাকায় নদীর বেশির ভাগ অংশ এখন মরুভূমি। নদীর দুপাশে প্রায় চার হাজার হেক্টর খালি জমি পড়ে আছে। তবে নদীর কিছু স্থানে গভীর হওয়ায় সেখানে সামান্য পরিমাণ পানি থাকলেও তা কৃষকের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কোথাও কোথাও কৃষকরা গভীর নলকূপের পানি দিয়ে চাষাবাদ করে হতাশায় ভুগছেন।

ওই নদীর পানি দিয়ে ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া, বালিগাঁও, শর্শদী ইউনিয়ন, দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর, মাতৃভূঞা, রাজাপুর, সিন্দুরপুর ইউনিয়ন, সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা, চরমজলিশপুর ও চরদরবেশ ইউনিয়নসহ প্রায় ১০-১২টি ইউনিয়নের কৃষক ইরিগেশন করার লক্ষ্যমাত্রা থাকে। গত ৯ বছর ধরে তা নেই।

সোনাগাজী উপজেলার কাজিরহাট রেগুলেটরটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা ও শুকনো মৌসুমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সমুদ্রের জোয়ারে লবণাক্ত পানি ও নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার  বর্ষার মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতে নদীর নিচু অংশের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বন্যা দেখা দেয়। যার ফলে একদিকে ব্যাহত হয় আমনচাষ, অন্যদিকে পানিতে ডুবে যায় বাড়িঘর ও কোটি টাকার মাছের ঘের। আর শীত মৌসুমে পরিমাণ মতো পানি না থাকায় ইরিচাষ ও রবি শস্যচাষ করতে পারেন না কৃষক। যার ফলে চার হাজার হেক্টর আবাদি জমির কৃষক গত ৯ বছর ধরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া নদীর কূলে যেসব জেলে মাছ ধরে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁরাও মাছ না পাওয়ায় এখন অভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফেনীর উপ-পরিচালক মো. নূরুল হক জানান, কাজিরহাট রেগুলেটরটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকের চার হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ হয়নি। এতে করে ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, এর আগে মুছাপুর রেগুলেটরেরর কাজ শেষ না হওয়ায় কাজীরহাট রেগুলেটরের ৫ কিলোমিটার উজান থেকে বিরলী ব্রিজের ৫ কিলোমিটার উজানে নদী ড্রেজিং-এর ৯ কোটি টাকার প্রকল্প ফেরত চলে গেছে।

চলতি বছর আবার এডিবির অর্থায়নে নদী খননের জন্য সাড়ে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হিসেবে শুধু একটি বাঁধই দেখা গেছে। ওই প্রকল্পের আওতায় সোনাগাজীর তালতলীঘাট থেকে সিলোনিয়া পর্যন্ত খননের জন্য ছালেহ আহম্মদ, আরাধনা এন্টারপ্রাইজ ও নাহিয়ান ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড বিল্ডার্সকে কাজ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ মে ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে।

প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, মুছাপুর রেগুলেটরের নিয়ন্ত্রণের জন্য জেনারেটর স্থাপনের কাজ চলছে। এ জেনারেটর স্থাপন ও  নদী খননের কাজ শেষ হলে আগামী বছর থেকে এই এলাকার কৃষক ফসল ফলাতে পারবেন।

সিলোনিয়ার কৃষক আবদুল হাই জানান, গত ৯ বছরে একদিকে বন্যা, অপরদিকে পানি স্বল্পতার জন্য চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এবার তিনি কয়েক বিঘা জমিতে রবি শস্যের আবাদ করছেন। নদী খননের জন্য তলানীতে জমা পানিও সরিয়ে নেয়ায় তিনি ফসলে সেচ না দিতে পারায় ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বিরলী এলাকার জেলে খুরশিদ আলম কালের কণ্ঠকে জানান, নদীতে মাছ ধরে পরিবার চলে। গত কয়েক বছর যাবত বর্ষায় বন্যা ও শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।


মন্তব্য