'আঁতাতের এই রায় মানি না, মানব না।' মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আপিল বিভাগের আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশের পর এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার পর দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও আনন্দ মিছিল বের হয়। গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। প্রায় এক বছর সাত মাসের মাথায় গতকাল বুধবার সাঈদীর আপিলের রায়ের পর দেখা গেল ব্যতিক্রম চিত্র। কোথাও আনন্দ-উল্লাস নেই। সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা। ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মহানগর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তাঁরা নগরীর বিভিন্ন সড়কে মিছিল করেছেন। একাত্তরের 'দেইল্ল্য রাজাকার' হিসেবে পরিচিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পরিবর্তে সর্বোচ্চ আদালতের আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশে খুশি নন চট্টগ্রামবাসী। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ জায়া, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষুব্ধ। রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তাঁরা সর্বোচ্চ আদালতের (সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ) প্রতি সম্মান জানালেও আমৃত্যু দণ্ডাদেশে মর্মাহত। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ অনেকে এই রায় নিয়ে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, আঁতাতের এই রায়ের খেসারত সরকারকে এক সময় দিতে হবে। সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সঙ্গে আপস করলেও এদেশের মানুষের কাছে যুদ্ধাপরাধীরা ঘৃণিত হয়েই থাকবে। এদের অপরাধ ক্ষমাহীন। যুদ্ধাপরাধীরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদিকে সাঈদীর রায় নিয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা 'কৌশলী' বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল সাঈদীর ফাঁসির রায় বহাল থাকবে। তবে সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছে তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশের রায় নিয়ে 'কৌশলী' বক্তব্য দিলেও বিএনপি নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। ব্যক্তিগতভাবে কিছু বলব না। ফাঁসির আদেশ বহাল না থাকায় হতাশ শহীদ জায়া মুশতারি শফি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'এক সরকারের আমলে তার (সাঈদী) আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। আরেক সরকার এলে তাকে মাফ করে দেবে। ট্রাইব্যুনালের মতো সর্বোচ্চ আদালতেও সাঈদীর ফাঁসির রায় দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল। এ রায়ে সবাই হতাশ।' চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'মানুষের প্রত্যাশা ছিল সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হবে। কিন্তু এরপরও সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছে তাতে মানুষ সন্তুষ্ট।' সাঈদীর আমৃত্যু দণ্ডাদেশের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেননি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া নগর বিএনপির আরো কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের কেউ ফোন ধরেনি। ইসলামি ফ্রন্টের মহাসচিব এম এ মতিন বলেন, 'রায়ে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিতেই হবে।' পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'সাঈদীর ফাঁসি না হওয়া আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবাই এই রায়ে হতাশ ও হতবাক।' গণজাগরণমঞ্চ চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী শরীফ চৌহান বলেন, 'জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আঁতাতের রায় জনগণ মেনে নিবে না।' ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাকা চৌধুরীর মামলার তিন নম্বর সাক্ষী সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ সিরু বাঙালি বলেন, 'সাঈদী একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ করেছে। সেই ঘৃণিত অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালের মতো সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির প্রত্যাশা থাকলেও তা পূরণ হয়নি।' সংস্কৃতিসংগঠক রাশেদ হাসান বলেন, 'এ রায়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও আহতদের অপমান করা হয়েছে। আদালতের প্রতি আমাদের সম্মান আছে। কিন্তু স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের যদি সর্বোচ্চ শাস্তি না হয় তাহলে কার ফাঁসি হবে?' একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি চট্টগ্রামের বিভাগীয় সমন্বয়ক শওকত বাঙালি বলেন, 'সরকার জামায়াতের সঙ্গে যে আঁতাত করছে তা এতদিন লোকমুখে শোনা যাচ্ছিল। সাঈদীর ফাঁসি না হওয়ায় মানুষের সন্দেহ সত্যি হতে চলেছে। আঁতাতের কারণে সরকার নিজের পতন নিজেই ডেকে আনছে।' বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ শরীফ বলেন, 'সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি হোক তা দেশবাসী প্রত্যাশা করে। আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল সাঈদীর ফাঁসির রায় বহাল থাকবে। কিন্তু আমরা হতাশ।' মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডার মো. সাহাবউদ্দিন বলেন, 'একাত্তরের ঘাতক সাঈদীর ফাঁসি না হওয়ায় আমরা মর্মাহত। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুব্ধ। যুদ্ধাপরাধীদের রেহাই নেই।'