kalerkantho


সাত হতাহতের পরিবারের কষ্টের জীবন

‘শরীরে যে যন্ত্রণা মৃত্যুই ভালো ছিল’

মাদারীপুর

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী, মাদারীপুর   

২১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘শরীরে যে যন্ত্রণা মৃত্যুই ভালো ছিল’

নিহত লিটন মুন্সির স্ত্রী মাফিয়া আক্তার ও মেয়ে নুসরাত জাহান মিথিলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আমার প্রথম জন্মদিন ছিল ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মায়ের মুখে শুনেছি, বাবা ঢাকা থেকে নতুন জামা নিয়ে আসবে। সেই জামা পরে কেক কাটা হবে। কিন্তু বাবা আর আসেননি। ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় বাবা মারা গেছেন। কিন্তু এত বছর পরও বাবাসহ বহু মানুষের অকাল মৃত্যুর বিচার হয়নি। অপরাধীরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অপরাধীদের সঠিক বিচার যেন নিশ্চিত করেন। তাহলে এ ঘটনায় নিহতদের আত্মা শান্তি পাবে।’

কথাগুলো বললেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা নিহত লিটন মুন্সির মেয়ে নুসরাত জাহান মিথিলা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় মাদারীপুরের আরো তিনজন নিহত ও তিনজন আহত হন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও ভালো নেই। এসব পরিবারে শোক ও আতঙ্কের ছায়া এখনো কাটেনি। আহতরা পঙ্গুত্ব নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন।

চানপট্টি গ্রামের আছিয়া বেগম ও আইয়ুব আলী মুন্সির একমাত্র ছেলে লিটন মুন্সি। লিটনের ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে মায়ের অপারেশন করানোর কথা ছিল। গ্রেনেড হামলায় তা সম্ভব হয়নি। সেই কষ্টে মা আজো চোখের জল ফেলেন। আইয়ুব আলী ও আছিয়া বেগম জানান, ছেলেকে হারিয়ে তাঁরা একেবারে শেষ হয়ে গেছেন। এখন তাঁদের চোখের জল ছাড়া আর কিছুই নেই। সরকারের কাছে তাঁরা ছেলে হত্যার বিচার চান। লিটনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মিথিলা প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট বাসা ও রোজার সময় পাঁচ লাখ টাকা সরকারিভাবে পেয়েছে। তাই সরকারের কাছে তারা কৃজ্ঞত।

২১ আগস্ট নিহত শ্রমিক লীগ নেতা নাসিরউদ্দিনের বাড়ি কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের রামপোল গ্রামে। তিনি থাকতেন ঢাকার হাজারীবাগে। দীর্ঘদিন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একসময়ে হাজারীবাগ শ্রমিক লীগের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। নাসির ছিলেন আওয়ামী লীগের বড় ভক্ত। তাই আওয়ামী লীগের মিছিল, সভা-সমাবেশ হলে কেউ তাঁকে আটকে রাখতে পারত না। সভা-মিছিলের আগে থাকতেন, স্লোগান দিতেন। সেই প্রতিবাদী নাসিরউদ্দিনকে জীবন দিতে হলো।

গ্রেনেড হামলায় নিহত আরেক যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু। তাঁর বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর গ্রামে। গ্রেনেড হামলায় নিহত সুফিয়া বেগমের বাড়ি রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামে। ২১ আগস্ট মহিলা নেতাদের সঙ্গে প্রথম সারিতেই ছিলেন সুফিয়া। তিনি সপরিবারে ঢাকায় থাকতেন।

মৃত্যুই ভালো ছিল!

কালকিনি পৌরসভার বিভাগদী গ্রামের মোহাম্মাদ আলী হাওলাদারের ছেলে হালান হাওলাদারের একটি পা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নষ্ট হয়ে গেছে। পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাঁকে। বর্তমানে তিনি ঢাকায় থাকেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হালান বলেন, ‘২১ আগস্ট অনেক শখ করে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শুনতে যাই। হাজারো মানুষ ঠেলে ঠেলে মঞ্চের কাছাকাছি আসতেই বোমার বিকট শব্দ হয়। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এখনো দুই হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক স্প্লিন্টার নিয়ে যন্ত্রণায় বেঁচে আছি।’

কালকিনির ঝাউতলা গ্রামের ওয়াহেদ সরদারের ছেলে আহত সাইদুল হক সরদারও শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে যন্ত্রণায় জীবন যাপন করছেন। বর্তমানে চোখে ঝাপসা দেখছেন। বাঁচার তাগিদে বিভিন্ন কাজকর্ম করেও সুবিধা না হওয়ায় মালয়েশিয়ায় যান। শেষ সম্বল জমিটুকু বেচে বিদেশ গেলেও শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে সেখানেও কিছু করতে পারেননি। ফিরতে হয়েছে দেশে। সাইদুল বলেন, “(২১ আগস্ট) মহাসমাবেশ শুরু হয়। আমি ছিলাম অনেক পেছনে। শেখ হাসিনাকে দেখতে আস্তে আস্তে মঞ্চের ১০-১২ হাত দূরত্বে চলে আসি। মন দিয়ে নেত্রীর বক্তব্য শুনছি। বক্তব্য প্রায় শেষ। ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শেষ করতে পারেননি। এর মধ্যে পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দ পেলাম। চারদিকে কালো ধোঁয়া। মানুষজনের আর্তনাদ। ছোটাছুটি। আমিও কিছু না বুঝে দৌড় দিতে যাব, তখনই তৃতীয় বোমার বিস্ফোরণ। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। বুঝতে পারি, অসংখ্য মানুষ আমার শরীরের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ভাবিনি বেঁচে যাব। বর্তমানে শরীরে যে যন্ত্রণা, এর চেয়ে সেদিন মৃত্যুই ভালো ছিল।”

এ ছাড়া গ্রেনেড হামলায় কালকিনির কৃষ্ণনগর গ্রামের কবির হোসেনের ডান হাত বাঁকা হয়ে গেছে। তিনি ঢাকার একটি বস্তিতে থাকেন। দিনমজুরের কাজ করেন।

আহতরা সেদিনের নারকীয় দৃশ্যের কথা মনে হলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।



মন্তব্য