kalerkantho


যুদ্ধাপরাধী ও দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চান নারী মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল

শামীম খান   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



যুদ্ধাপরাধী ও দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চান নারী মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল

মাগুরার নারী মুক্তিযোদ্ধা মাছরুরা পারভিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘরের একটি কক্ষে সর্বোচ্চ ১০ ওয়াটের একটি বৈদ্যুতিক বাতি। বাকি দুটি কক্ষে অন্ধকার। তার মধ্যেই সংসারের কাজ করছেন মাছরুরা। এই বাড়ির কক্ষগুলোতে বাইরের আলো তেমন ঢোকে না। দিনের বেলায় যেটুকু আলো না হলেই নয়, সেটুকু জ্বালিয়ে ঘরের কাজ সারেন তাঁরা। আলো এত কম কেন? বললেন, ‘বেশি পাওয়ারের বাল্ব জ্বালালে প্রতি মাসে সরকারি বৈদ্যুতিক যে বিল আসে তা দেওয়া কষ্টকর। এ কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যের দেওয়া সৌরবিদ্যুতের এই স্বল্প আলোর বাতি জ্বালাই। খুব প্রয়োজন না হলে পিডিবির বিদ্যুৎ কাজে লাগাই না।’

এ দৃশ্য মাগুরার নারী মুক্তিযোদ্ধা মাছরুরা পারভিনের ভাড়া বাড়ির। পুরো নাম মাছরুরা পারভিন বুলবুল (৬৩)। বাবার বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়ায়। এই গ্রামের শাহাদত আলীর মেয়ে তিনি। বর্তমানে মাগুরা শহরের নতুন বাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে স্বামী, চার মেয়ে ও এক বোন নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। সম্প্রতি এই বাড়িতেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জানা যায় তাঁর অভাবী বর্তমান ও গর্বিত অতীতের কথা। মাছরুরার চার মেয়ের মধ্যে তিনজন স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। অন্যজন পড়ছে উচ্চ মাধ্যমিকে। তাঁদের পেছনে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সঙ্গে রয়েছে মাগুরার সংসার খরচ। স্বামী ইউনুস আলী স্বল্প আয়ের মানুষ। তা-ও নিয়মিত নয়। মাছরুরা নকশিকাঁথা সেলাই করে সামান্য কিছু আয় করেন। বাকি টাকার জোগান দেন রেড ক্রিসেন্টে  কর্মরত মাছরুরার ছোট বোন তাছলিমা। মূলত তাঁর টাকায়ই চলছে মাছরুরার সংসার।

‘এ সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে এখনো বিয়ে করেনি তাছলিমা,’ কথাটা বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবার চোখ মুছলেন এই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে জীবনের চরমতম ঝুঁকি নিয়ে কোমরে পিস্তল গুঁজে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি। একাত্তরের দিনগুলোতে রেকি করেছেন মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। কখনো পাগলের বেশে, কখনো ভিন্ন পরিচয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন রাজাকার ও পাকিস্তানি আর্মিদের গতিবিধি।

মাছরুরা বলেন, ‘চোখের সামনে কত অমুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কত ভালো আছেন তাঁরা। কিন্তু দীর্ঘ ৪৮ বছরে আমি সরকারি ভাতা পাওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত পেলাম না। বরং দিন যত যায়, তত বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার জীবনযাপন। দুর্বিষহ কষ্ট আর দুঃখ ঘিরে ফেলছে আমাকে।’

একাত্তরের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মাছরুরা বলেন, ‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মাগুরার শ্রীপুরের খামারপাড়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে ওঠে। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। আমার বাবা শাহাদত আলী মিয়া ছিলেন পেশায় আইনজীবী ও মহকুমা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। বাবার নির্দেশে আমার বড় দুই ভাই আলী মোর্তেজা ও দৌলত মিয়া মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। আর আমাদের বাড়ির ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে করতে আমি অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যোগ দিই শ্রীপুরের আকবর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের দলে। বাবা ও মায়ের এ ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন থাকায় কাজটি আমার জন্য সহজ হয়। সে সময় আমার সঙ্গে যোগ দেন সদর উপজেলার রাউতড়া গ্রামের হাসিবা ও মাহফুজা নামের দুই বোন, শ্রীপুরের খামারপাড়ার আঁখিরন, টুপিপাড়ার লাইলি, আবালপুরের হাবিবা ও শাইলি নামের অন্য দুই বোন, দায়েপোলের রাহেলাসহ আরো আটটি মেয়ে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন। বাকিরা কে কোথায়, কী অবস্থায় আছেন, জানি না।

‘আমরা এই ৯ জন প্রথম অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিই সে সময়কার স্থানীয় গেরিলা কমান্ডার গৌরীচরণপুরের মোকাদ্দেস হোসেনের কাছে। তিনি আমাদের হাতে-কলমে অস্ত্র চালানো শেখান। টিপতে লেগেছিল কয়েক সেকেন্ড। তবু অস্ত্র চালনায় দক্ষতা বাড়াতে টানা দুই মাস ধরে চলেছে আমাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। এ জন্য আমাদের বাড়ির পাশে একটি বাগানে টিন দিয়ে তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল নিশানা। প্রথম দিন প্রত্যেকে চার রাউন্ড করে রাইফেলের গুলি ছুড়েছিলাম। এরপর বুকে সাহস আরো বেড়ে গিয়েছিল।

‘প্রশিক্ষণ শেষ হলে আমাদের প্রত্যেককে পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকারদের গতিবিধি লক্ষ করার জন্য রেকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমরা ছেঁড়া কাপড় পরে পাগলের বেশে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি। এ সময় আমার কাছে কোমরে পিস্তল গুঁজেই আমি রেকি করতাম। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দিতাম। পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্প বসার কারণে একদিন সকালে স্থানীয় রাজাকার ছালাম মুন্সী, কারি মিয়ার সহযোগিতায় পাকিস্তানি আর্মিরা আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। কিন্তু জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা এই বাড়িতেই তাঁদের ক্যাম্প চালিয়ে গেছেন।’

যুদ্ধের শুরুতে একদিন পাকিস্তানিদের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন মাছরুরা। দিন-তারিখ সুনির্দিষ্ট করে মনে নেই। তবে এটুকু স্মরণ আছে, সময়টা ছিল ভোরবেলা। অজস্র তালি দেওয়া একটা কাপড় পরে খামারপাড়ার একটি পুকুরে কাপড় ধোয়ার ছলে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি নজর রাখছিলেন তিনি। শতাধিক পাকিস্তানি সেনার একটি গ্রুপ রাজাকারদের সহযোগিতায় হঠাৎ করেই ওই অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। তারা মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন মিয়ার বাড়ি আক্রমণ করতে সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি হঠাৎ করেই তাদের সামনে পড়ে গেলে হানাদাররা তাঁর দিকে অস্ত্র তাক করে। গুলি করার আগমুহূর্তে তাদের সঙ্গে থাকা শ্রীপুর থানার ওসি উর্দুতে ‘ভুখা হ্যায়’ বললে তারা অস্ত্র নামিয়ে আকবর হোসেন মিয়ার বাড়ির দিকে চলে যায়।

‘আমি অন্য পথ দিয়ে দৌড়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আসার খবর দিই। যুদ্ধের সময় এ রকম অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে আমাকে।’

মাছরুরা জানান, শ্রীপুরের গয়েশপুর, টুপিপাড়া, খামারপাড়া, গাংনালিয়া, বরিশাট, দরিবিলা, দাইরপোল ও মিনগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন বেশে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কখনো একত্রে, কখনো বা বিচ্ছিন্নভাবে অন্য মেয়েরা একইভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁরা সব সময় রেকি করার পাশাপাশি যেকোনো মুহূর্তে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে থাকতেন। অধিনায়ক আকবরের নির্দেশে তাঁরা যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে সশস্ত্র অবস্থায় আলফাপুর মিনগ্রামের যুদ্ধে অংশ নিতে যান। এ সময় তাঁদের প্রত্যেকের কাছে রাইফেল ছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল প্রথমে সেখানে গিয়ে সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশ নিতে। ওই যুদ্ধে তাঁদের অবস্থান ছিল মিনগ্রামে। অন্যদিকে পাকিস্তানি আর্মিরা অবস্থান করছিল আলফাপুরে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানিদের ১৫ জনের মতো সদস্য মারা গিয়েছিল, যার মধ্যে তিনটি লাশ সেখানে পড়ে ছিল। তাঁদের আক্রমণের মুখে অন্য লাশগুলো সঙ্গে নিয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে গিয়েছিল। এই যুদ্ধ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত ২০টির মতো অস্ত্র মাছরুরাদের দখলে আসে। এটি তাঁদের শক্তি ও সাহস আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।

মাছরুরার অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল পাশের জেলা ঝিনাইদহের কামান্নায়। ২৬ নভেম্বর রাতে এখানে একটি বাড়িতে অবস্থান নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাকিস্তানিরা অতর্কিতে হামলা চালালে এক রাতেই ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। মাছরুরা তখন কামান্নার পাশের গ্রাম বগুড়া বড়বাড়িতে রেকির দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে বসেই কামান্নার হত্যাযজ্ঞের খবর পান। ভোরে গিয়ে দেখেন, সারি সারি মুক্তিযোদ্ধার লাশ। সে এক নির্মম হৃদয়বিদারক দৃশ্য, যা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না তিনি।

মাছরুরা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম দেশের জন্যই। এ কারণে বিজয়ের পর ব্যক্তিস্বার্থে কারো কাছে হাত পাতিনি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠানোর জন্যও কোনো রকম যোগাযোগ করিনি। তবে সন্তানদের কারণে কিছুদিন হলো তালিকাভুক্তির চেষ্টা করছি, যা এখনো প্রক্রিয়াধীন। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বাহিনীপ্রধান মরহুম আকবর হোসেন মিয়া ও সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোল্যা নবুয়ত আলী এ ব্যাপারে আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। প্রত্যয়ন সনদও দিয়েছেন। কিন্তু এখনো সরকারি ভাতার তালিকায় আমার নাম ওঠেনি। ভাতার জন্য আমিসহ মোট ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ আদালতে মামলা করেছি।’

মাছরুরা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর এসএসসি পাস করি। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে লেখাপড়া হয়নি। ১৯৮২ সালে মাগুরা সদর উপজেলার শিবরামপুর গ্রামের ইউনুস আলীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। এত বছরের সংসারজীবনে আমি চার মেয়ের জননী। আমার স্বামী ইউনুস আলী একজন স্বল্প আয়ের মানুষ। সংসার চালাচ্ছি অনেক কষ্টে। বিশেষ করে মেয়েদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে অনেক সময় বিনিদ্র রাত কাটে। দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতি নামে একটি সংগঠন দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি।’

মাছরুরা আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে ৪৮ বছর হলো। কিন্তু আমাদের জীবনযুদ্ধ ও একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখে যাওয়ার যুদ্ধ তো শেষ হয়নি এখনো। এখনো যুদ্ধাপরাধী ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নানা ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনের স্তরে স্তরে এখনো রয়েছে তাদের অনুসারী। তাদের দমন করতে না পারলে প্রকৃত সমৃদ্ধি বারবার বাধাগ্রস্ত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মান ও সহায়তা দিচ্ছেন তার জন্য আমরা গর্বিত। এই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নয়ন আরো গতিশীল হবে। আমরা বিশ্বের প্রধানতম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। বঙ্গবন্ধু তো সেই স্বপ্নেই মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, যা আজ বাস্তবায়নের পথে।’

‘আমি কী পাব সেটি এখন আর ভাবি না। তবে রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি উন্নত বাংলাদেশ দেখে যেতে পারলেই সব পাওয়া হবে আমাদের।’ শেষটা এভাবেই করলেন মাছরুরা।

লেখক : মাগুরা প্রতিনিধি



মন্তব্য