kalerkantho

আলো হাতে চলিয়াছেন

ফজলুর রহমানের বয়স এখন ৭৮। এর মধ্যে সাড়ে পঞ্চান্ন বছরই ব্যয় করেছেন শিক্ষাবিস্তারে। মানুষ তাঁকে ডাকে ফজলু মাস্টার বলে। আরো অনেক কথা জেনে এসেছেন বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আলো হাতে চলিয়াছেন

ছবি : বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী

ফুলের নামে স্কুলের ১০টি শ্রেণিকক্ষের নাম। নামগুলো শিক্ষকদেরও শ্রেণিকক্ষে ঢোকার আগে স্মরণ করিয়ে দেয়, ওই কক্ষের প্রতিটি শিশু একেকটি ফুল। এদের ভালোবাসা দিয়েই তৈরি করতে হবে।

 

১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক হানাহানির জেরে মাতৃভূমি (ভারতের ত্রিপুরা) ছাড়তে বাধ্য হন ফজলুর রহমান। সবে তখন ম্যাট্রিক পাস করেছেন। ওই জোরেই কুমিল্লার চান্দিনা থানার বড়কইট প্রাইমারি স্কুলে একটি চাকরি জোগাড় করলেন। বেতন মাসে ৫০ টাকা। সহকারী শিক্ষক। বাল্য বয়স থেকেই তাঁর শিক্ষকতায় আগ্রহ। হিন্দু-মুসলমানে হানাহানি দেখে ভাবতেন, যদি শিশুদের মধ্যে আলো ছড়ানো যায়, তাহলে আগামী দিনের পৃথিবী এই সংঘাত থেকে মুক্তি পাবে। যা হোক, বড়কইট স্কুলে ছিলেন ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর বদলি নিয়ে চলে যান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। যোগ দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলার জামসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৭৫ সালে প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হন। তারপর ষাঁড়েরগজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেলিআব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিম লইয়ারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। অবসরে যান ১৯৯৭ সালে।

 

অবসর, কিন্তু বিশ্রাম নয়

শিক্ষক থাকার সময় অনেকবার খেয়াল করেছেন, শিশুরা গণিতে ভালো করতে পারে না। বলছিলেন, ‘একটি শিশু যদি গণিতে পারদর্শী হয়, তাহলে অন্যান্য বিষয়েও সে ভালো করে। গণিত আসলে মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে। আমি অবসর নেওয়ার পর বাড়ির ধারেকাছের স্কুলগুলোতে যেতাম। শিক্ষকদের বলে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে ক্লাস নিতাম। এভাবে কয়েক মাস ভালোই কাটল। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম, শিক্ষকরা কাজটি ভালো চোখে দেখছেন না। তাই বাদ দিলাম।’ কিন্তু একসময় ফজলুর রহমান দেখলেন, স্কুলগুলোর ছাত্ররা প্রাথমিকে বৃত্তি পাচ্ছে না। তিনি ভাবতে লাগলেন, কেন এমনটা হচ্ছে? বসে থাকতেও পারলেন না। উত্তর খুঁজতে বের হলেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাঠদান করতে থাকলেন। স্কুলের বই পড়ানোর পাশাপাশি মহৎ মানুষের গল্প শোনাতেন, যেন তারা অসাম্প্রদায়িক হয়ে গড়ে ওঠে। তারপর আবার ভাবলেন, এভাবে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কয়টি শিশুকে সুশিক্ষা দিতে পারবেন?

 

নতুন পথচলা

শুরু হয় ফজলু মাস্টারের নতুন পথচলা। শ্রীমঙ্গলের ভোজপুর, সাতগাঁও, লাহারপুর—এমন আরো কিছু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে বললেন, ‘আমাকে একটি ঘর আর একটি উঠান দেন।’ কিন্তু সহজে পেলেন না। তাই আবার ভাবলেন, কত দিন বসে থাকবেন? শেষে ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে ভোজপুর গ্রামের আছিদ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে শুরু করেন দ্য মর্নিং সান স্কুল।

তাঁর উৎসাহ দেখে অবশেষে গ্রামবাসী নিজেরাই এগিয়ে এলো। স্কুলের জন্য চাঁদা তুলতে থাকল। সংগৃহীত ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ভোজপুর গ্রামে স্কুলের নামে জমি কেনা হলো। এবার একটি ঘর দরকার। পতিত জমিতে ফজলু মাস্টার রোপণ করেন দ্রুত বর্ধনশীল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ছয় বছর পর গাছ বিক্রি করে স্কুলঘর তৈরির কাজে হাত দেন। এ সময় নিজের পেনশনের কিছু টাকাও যোগ করেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এরপর স্থানীয় এমপি উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদকে ধরেন। তিনি ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেন। এভাবেই শেষ হয় স্কুলঘরের কাজ। স্কুল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারও তৈরি করেন। স্কুল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। স্কুলের নিবন্ধন নেন। স্কুলটিতে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২৫। শিক্ষক আছেন ১১ জন। শিক্ষকদের বেশির ভাগই আশপাশের গ্রামের উদ্যমী তরুণ-তরুণী। আছেন একজন আয়াও।

 

স্কুলটিই তাঁর সব

স্কুলের শিক্ষার্থীরা ট্যালেন্টপুলসহ সাধারণ বৃত্তি পেতেও শুরু করেছে। স্কুলটি ঘিরেই ফজলুর রহমানের সব স্বপ্ন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে স্কুলে আসেন। গাছের পরিচর্যা, মাঠ পরিষ্কার করা তাঁর প্রতিদিনের কাজ। তারপর ক্লাসরুমের দরজা খোলেন। বাড়ি ফেরেন স্কুল ছুটি হয়ে সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী বাড়ির পথ ধরলে। মর্নিং সান কেজি স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও উপজেলার সিন্দুরখান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শৈলেন্দ্রকুমার শর্মা বলেন, ‘ফজলুর রহমান স্যার অনেক গুণের অধিকারী। তিনি শুধু করিতকর্মাই নন; একজন দক্ষ শিক্ষক এবং প্রশাসক। তাঁর সততা প্রশ্নাতীত। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুসুলভ মনোভাবের কারণে তিনি তাদের মনে খুব অল্প সময়েই জায়গা করে নিতে পারেন। এটা সবাই পারে না। এককথায় তিনি শিক্ষকদের আদর্শ।’

স্কুলটির সামনে শিশুদের খেলার জন্য বড় মাঠ রয়েছে। এখানে প্রতিদিন স্কুল শুরুর আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত। শিক্ষার্থীদের পাঠ করানো হয় দেশপ্রেমের শপথবাক্য। ফুলের নামে স্কুলের ১০টি শ্রেণিকক্ষের নাম হয়েছে জুুঁই, বেলি, চামেলি, ডালিয়া, শাপলা, কৃষ্ণচূড়া, গন্ধরাজ, সূর্যমুখী, গোলাপ ও রজনীগন্ধা। এমন নামকরণের কারণ বলতে গিয়ে ফজলুর রহমান বললেন, ‘প্রতিটি শিশুই একেকটি ফুল। পরিচর্যা করলে এরাও সমাজে ফুলের মতোই সৌরভ ছড়াবে। নামগুলো শিক্ষকদেরও শ্রেণিকক্ষে ঢোকার আগে স্মরণ করিয়ে দেয়, ওই কক্ষের প্রতিটি শিশু একেকটি ফুল। এদের ভালোবাসা দিয়েই তৈরি করতে হবে।’

ছাত্ররা ছড়িয়ে পড়ছে

স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে আরিফুল ইসলাম ও পারভেজ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে লিটন চন্দ্র পাল। ফখরুল ইসলাম পড়ছে নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফজলুর রহমানের বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতাও করছেন।

 

তিনি ক্রীড়ামোদীও

অবসরে যাওয়ার আগে অনেকবার তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কুমিল্লার ময়নামতী এবং সিলেটে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। একবার ময়নামতী যাওয়ার পথে সঙ্গে ছিল ১১টি শিশু। রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পর এদের কয়েকজন বাড়ি ফেরার জন্য কান্না শুরু করে। কী করে শিশুদের সামাল দিলেন? জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, ‘চকোলেট খাইয়ে, ঠাকুরমার ঝুলির গল্প বলে, শিশুদের সঙ্গে লুডু খেলে পুরো ইভেন্ট শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরেছি। সেবার শিশুদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং সামলানো আমাকে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করে।’

স্কুলের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্কুলের আঙিনায় সবজিবাগান করেছেন ফজলুর রহমান। শিক্ষার্থীদের পারিবারিক সবজিবাগান গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টিতে এটি বেশ সহায়ক হয়। শিশুরা হাতে-কলমে এগুলো শেখে। সবজি বিক্রির টাকা দিয়ে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এতে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে বলেও মনে করেন তিনি।

সংস্কৃতিমনা ফজলুর রহমান শতাধিক দেশাত্মবোধক গান লিখেছেন। পথনাটকও রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে ‘রাজাকারের ফাঁসি’ উল্লেখযোগ্য।

 

ব্যক্তিগত ফজলুর রহমান

১৯৪০ সালের ১ নভেম্বর ফজলুর রহমানের জন্ম, অবিভক্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিশালগড় মহকুমার নাড়াউড়া গ্রামে। বাবার নাম গনি মিয়া এবং মা লেজু বেগম। তিনি ছিলেন মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। ফজলুর রহমান ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন বিশালগড় হাই স্কুল থেকে। এরপর ভর্তি হন সেখানকার এমবিবি কলেজে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে আর পড়া হয়নি। চলে আসতে হলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকরিরত অবস্থায় ১৯৭০ সালে আইএ পাস করেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে তাঁর স্ত্রী মারা যান। এক ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা তিনি। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। পড়িয়েছেন স্নাতক পর্যন্ত। ছেলে এইচএমবি পাস করে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। পুত্রবধূ স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শ্রীমঙ্গল উপজেলার পূর্ব লাহারপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে বাস করেন।

 

কিছু স্মৃতি কিছু কথা

১৯৭৫ সাল। ষাঁড়েরগজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনি প্রধান শিক্ষক। সে সময় কখনো কখনো শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে, গাছতলায় পাঠদান করতেন। ভাবতেন, প্রকৃতির সাহচর্যে শিক্ষার্থীদের মন বড় হবে। তারা উদার হবে। এলাকায় সাড়া পড়ে যায়। অনেক স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি তাঁকে স্কুলে নেওয়ার জন্য শিক্ষা অফিসে তদবির শুরু করে। পরে তিনি জামসী স্কুলে বদলি হলে স্কুলের ছাত্রসংখ্যাও বেড়ে গিয়েছিল। ফজলুর রহমান বলেন, ‘এত বেশি ছাত্র ভিড় করেছিল যে ভর্তি নিতেও পারছিলাম না, আবার ফেরাতেও পারছিলাম না। ছাত্রদের এ ভালোবাসাই আমার জীবনের সেরা সম্বল।’

পশ্চিম লইয়ারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যেদিন ফজলুর রহমান অবসরে যান, সেই দিনটির কথা তিনি কোনো দিন ভুলবেন না। সেদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। কখনো মুষলধারে, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি। তবু হাজারো মানুষের সমাগম হয়েছিল। লইয়ারকুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক ছাড়াও জামসী, তেলিআব্দা, ষাঁড়েরগজ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেও শিশুরা অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। ফুলের তোড়া, কলম, ছাতা, বই—এসব উপহার তাঁর হাতে তুলে দেয়। কোনো কোনো শিশু তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। পশ্চিম লইয়ারকুল এলাকাবাসী তাঁর গলায় পরিয়ে দেয় সোনার মেডেল।

 

তাঁর স্বপ্ন

অবসরে যাওয়ার আগের ৩৩ বছরের স্কুলজীবনে তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে ছাড়া আর ছুটি কাটাননি। বাল্যকালে একবার বসন্ত হয়েছিল। এরপর আর অসুস্থ হয়েছেন বলে মনে পড়ে না। এই বয়সেও পুরোপুরি সুস্থ। বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় আরো অনেক দিন কাজ করতে পারব। কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে পছন্দ করি। স্কুলটি ঘিরেই আমার স্বপ্ন। দেশপ্রেমের চেতনা মনে ধারণ করে আমার স্কুলের ১০ রকমের ফুল সমাজে প্রস্ফুটিত হবে। তার সৌরভে সমাজ হবে অসাম্প্রদায়িক ও আলোকিত। এটাই আমার স্বপ্ন। ৫০ টাকা বেতনে শিক্ষকতার পেশা শুরু করি। আর যখন অবসরে যাই তখন আমার বেতন ছিল ছয় হাজার টাকা। আমি তো মক্কা শরিফ যেতে পারব না। কারণ আমার টাকা-পয়সা নেই। আমি মনে করি, মর্নিং সানের শিশুদের সুশিক্ষা দিয়েই সওয়াব অর্জন করা সম্ভব। আমি আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে ফরিয়াদ করি, স্কুলের চেয়ারে বসেই যেন আমার মৃত্যু হয়’—বলেন ফজলু মাস্টার।



মন্তব্য