kalerkantho

গুরুদক্ষিনা

আমাকে কবি বলে ডাকতেন

রিজিয়া রহমান কথাসাহিত্যিক

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আমাকে কবি বলে ডাকতেন

ছবি : কাকলী প্রধান

লেখক হব—এমন চিন্তা ছোটবেলায় কখনো মনে বাসা বাঁধেনি। যাঁরা ক্লাসে পড়াতেন, মনে হতো তাঁদের মতো হব। সে সময় বাবা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, বড় হয়ে কী হবে? বলেছিলাম টিচার হব। আমি ফরিদপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে পড়েছি। স্কুলে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন কমলাদি। খুব সুন্দর করে পড়াতেন। ক্লাসে আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন। আদর করতেন, আবার শাসনও করতেন। খুব ইচ্ছা হতো তাঁর মতো হব। ক্লাস থ্রি থেকেই কবিতা লিখতাম। লেখক হব—এমন কোনো বাসনা থেকে নয়, নিছক ভালো লাগা থেকে লিখতাম। আমার আরেকজন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন এটিমন আপা। তিনি আমার লেখা পছন্দ করতেন। কবিতা পড়ে প্রশংসা করতেন। সব সময় আমাকে কবি বলে ডাকতেন। আরেকজন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন সুনীলাদি। সুন্দর, স্নিগ্ধ আর রুচিশীল জীবন যাপন করতেন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের খুবই ভালোবাসতেন। অবশ্য সব শিক্ষকের মধ্যেই তখন এই গুণ ছিল। সুনীলাদি প্রকৃতি খুব ভালোবাসতেন। আমাদেরও প্রকৃতিকে উপলব্ধি করতে নানা টিপস দিতেন। তাঁর জীবনযাপন খুবই প্রভাবিত করত আমাদের। ছাতা নিয়ে স্কুলে যেতাম। বৃষ্টি হলে বন্ধুরা মিলে ছাতা উড়িয়ে দিতাম, তারপর দৌড়ে গিয়ে ধরতাম। বৃষ্টিতে ভিজতাম। এটা খুব ভালো লাগত। এই যে সৌন্দর্যবোধ, রুচিবোধ, পরিষ্কার-পরিছন্নতা, বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ করা—সবই আমাদের শিখিয়েছেন তাঁরা। বই পড়ার পাঠটাও আমি সুনীলাদির কাছে পেয়েছি। তিনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন জানি না। তাঁর কাছ থেকে যে আদর্শ ও শিক্ষা পেয়েছি, তা এখনো আমার প্রেরণা। তাঁর দেওয়া শিক্ষা এখনো আমার মনে আছে এবং জীবনকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে।

কলেজেও অনেক শিক্ষকের স্নেহে বেড়ে উঠেছি। তখন পাকিস্তান আমল। ইডেন কলেজ ও কোয়েটা গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে পড়েছি। পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মিস মিনহাজ। অসম্ভব ভালো পড়াতেন। উচ্চ স্বরে কথা বলতে পারতেন না। দূর থেকে আমি বুঝতে পারতাম না। তিনি উর্দুতে ক্লাস নিতেন। আমি উর্দু ভালো বুঝতাম না। তিনি পরে আমার কাছে এসে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি একজন শিক্ষকের এই যে মমত্ববোধ এবং সাহায্য করার ইচ্ছা, এর কোনো তুলনা হয় না। বাঙালিদের প্রতি তাঁর আলাদা মমত্ববোধ ছিল। ইডেন কলেজে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন খোদেজা খাতুন। ভালো পড়াতেন এবং মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত ভালো। আমাদের কোনো শিক্ষকই কোচিং করে বেড়াতেন না। খোদেজা ম্যামের বড় গুণ, তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের বুঝতে পারতেন। কার কোনটা পড়লে ভালো হবে, জানতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন ড. মাহমুদ। ক্লাসে যখন লেকচার দিতেন, টুঁ শব্দটি হতো না। তাঁর লেকচার খুব মন দিয়ে শুনতাম। ফলে বাসায় আর পড়ার প্রয়োজন হতো না। তিনি শুধু একজন ভালো শিক্ষকই ছিলেন না, একজন অসম্ভব ভালো মানুষও ছিলেন। আমার প্রিয় শিক্ষকদের কেউই আজ আর বেঁচে নেই। আমাদেরই মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাঁরা থাকবেন কেমন করে। কিন্তু তাঁদের দেওয়া শিক্ষা এখনো আমার জীবন চলার প্রেরণা।

♦ অনুলিখন : আতিফ আতাউর



মন্তব্য