kalerkantho

মসজিদে হামলাকারীকে ‘জঙ্গি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয় না কেন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ২২:২২ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মসজিদে হামলাকারীকে ‘জঙ্গি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয় না কেন?

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যাকারী অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট প্রথমে তাকে বলা হচ্ছিল বন্দুক হামলাকারী। শুক্রবার হামলার পর অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্ট্রেলীয় যুবক ব্রেন্টন ট্যারান্টকে এভাবেই বর্ণনা করা হয়। কিন্তু নিউজ়িল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন মুখ খুলতেই বদলে গেল একাংশের বয়ান।

প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন বললেন, ‘নিঃসন্দেহে এটা জঙ্গি হামলা।’ তারপর পশ্চিমা গণমাধ্যমের কেউ কেউ হামলাকারীকে সন্ত্রাসী বললো। কেউ সরাসরি কেউ আবার সতর্ক ভাবেই উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়ে। ঘটনার দিনই জানা যায় হামলার আগে ব্রেন্টনের সেই ইশতেহারের কথা। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল শ্বেত সন্ত্রাসের চেহারা আর মুসলিম ও অভিবাসীদের প্রতি তার বিদ্বেষ। তবু তাকে জঙ্গি বলতে এত দ্বিধা কেন সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

টুইটারে প্রথম সারির একটি মার্কিন দৈনিকের পুরনো শিরোনাম পোস্ট করে পাকিস্তানি তরুণী মরিয়ম মহসিন দেখালেন, ২০১৫ সালে প্যারিসে ব্যঙ্গ-পত্রিকা শার্লি এবদোর দপ্তরে হামলাকে জঙ্গি হামলা বলা হলেও, নিউজ়িল্যান্ডে তা বন্দুক হামলা।

পাকিস্তানি সাংবাদিক বিলাল মুঘল যেমন বলছিলেন, ‘ঘাতক ব্রেন্টন মুসলিম হলে বোধহয় জঙ্গি বলতে সুবিধা হতো। কেউ কেউ সুর পাল্টালেও ব্রিটিশ কয়েকটি দৈনিক বন্দুক হামলাকারীই লিখে যাচ্ছে।’

কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে হামলাকারীর কষ্টের অতীতের গল্প তুলে ধরে পাঠককে প্রভাবিত করা হচ্ছে বলেও মনে করেন সাংবাদিক বিলাল। তার প্রশ্ন, ‘কই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জঙ্গিদের তো কেউ নরম মনোভাব দেখায় না। অতীতের গল্প বলে বর্তমানের নৃশংসতাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই।’

কিন্তু গোটা বিশ্বে এমনই এক চক্রান্ত চলছে বলে জানালেন কলকাতার মনঃসমাজকর্মী মোহিত রণদীপ। তার দাবি, ‘নিউজ়িল্যান্ডের হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ধর্মের কথা বলে সন্ত্রাসের পাশাপাশি ধেয়ে আসছে চরম দক্ষিণপন্থীদের আগ্রাসনও। অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ভারতেও অভিবাসী ভয় দেখানো হচ্ছে। বোঝানো হচ্ছে, বাইরের দেশ থেকে এসে ওরা তোমার সব কেড়ে নেবে। তাই রুখে দাঁড়াও।’

ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান অথবা মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর আর ব্রিটেনের ব্রেক্সিট সবই এক সুতোয় বাঁধা বলে অভিমত মোহিতের। তার কথায়, ‘জঙ্গিকে জঙ্গি বলার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের এই দ্বিধা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এটা বিপজ্জনক।’

এই সমস্যা থেকে উত্তরোণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অতিথি শিক্ষক সৌরভকুমার শাহির বললেন, ‘শ্বেত সন্ত্রাস চেপে যাওয়াটা পশ্চিমা গণমাধ্যমের খুব স্বাভাবিক বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও এমন।’

অস্ট্রেলীয় ব্রেন্টন কোন কারখানায় তৈরি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভটা কোথায় সেই প্রশ্নও জরুরি। তার পেছনে কাদের হাত আছে সেটাও একটা প্রশ্ন। শাহি যদিও বললেন, ‘এই ব্রেন্টন ট্যারান্টদের যেভাবে তৈরি করা হয়, সেটাই রহস্যের। সামনে আসে না বলে হামলার আসল মাথাটাকেই তো চেনা যায় না।’

তবু জঙ্গি ব্রেন্টনের দীর্ঘদিনের পুষে রাখা মুসলিম বিদ্বেষ আর অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা দেখা যায় তার প্রকাশিত ইশতেহারে। কোর্টে মুচকি হাসি আর হাতের আঙ্গুলের মধ্যে শ্বেতাঙ্গদের ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করে।

তার ব্যবহৃত মেশিনগানে লেখা তার ‘নায়কদের’ নাম। যাদের কেউ সুইডেনে গুলি করে হত্যা করেছিল দুই শরণার্থী শিশুকে। কেউ বা পাক্কা জঙ্গি কেউ কানাডার মসজিদে হত্যা করেছিল ছয়জনকে। ভেনিসের এক সেনা কর্মকর্তা, যে চুক্তি ভেঙে নির্বিচারে হত্যা করেছিল যুদ্ধবন্দি তুর্কিদের। এদের কেউ পঞ্চদশ শতাব্দীর, কেউ আবার একেবারে বর্তমানের।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

মন্তব্য