ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হতে যাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ও আর্থিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো।
তাদের মতে, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু আর্থিক বিধিনিষেধ শিথিল হলে তেহরান তার দীর্ঘদিনের মিত্র হিজবুল্লাহকে আরো বেশি অর্থ সহায়তা দিতে পারবে। এতে ২০২৪ সালের যুদ্ধের পর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সুবিধা হবে গোষ্ঠীটির।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধের পথ তৈরি করতে পারে। যদিও চুক্তির বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
চুক্তির আলোচনায় লেবানন
ইরানের চাপে এই সমঝোতার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে লেবাননের পরিস্থিতিও। গত ২ মার্চ ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে হামলা চালানোর পর নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এরপর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালায়। এতে সেখানকার হাজারো মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হন।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ইরান ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, ইসরায়েল যদি দক্ষিণ লেবাননে হামলা বন্ধ না করে, তাহলে তেহরান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
হিজবুল্লাহকে বাড়তি সহায়তার আশ্বাস
একাধিক কূটনৈতিক ও লেবানিজ সূত্র জানিয়েছে, ইরান হিজবুল্লাহকে আশ্বাস দিয়েছে যে তাদের স্থগিত সম্পদ মুক্ত হলে সংগঠনটি আরো বেশি আর্থিক সহায়তা পাবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি।
হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইরানের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যদি কোনো অর্থ সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছে যায়, তাহলে সেই অর্থ মুক্ত করা হবে না।’
তিনি আরো দাবি করেন, নতুন সমঝোতা ইরানকে তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উৎসাহ দেবে। কারণ তা না হলে চুক্তির সুবিধা ভোগ করা সম্ভব হবে না।
চাপে লেবানন সরকার
সমঝোতার ফলে হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত লেবানন সরকারের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক মোহানাদ হাজে আলি বলেন, ‘ইরানের বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা হিজবুল্লাহর জন্য গেম-চেঞ্জার হতে পারে। এতে তারা সমর্থকদের সহায়তা করতে এবং রাজনৈতিক জোটগুলো পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবে।’
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নটি পেছনের সারিতে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েল প্রত্যাহার নিয়ে টানাপোড়েন
ইরান দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার দাবি করছে। তেহরানের মতে, লেবাননে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি নতুন সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
হিজবুল্লাহও বিশ্বাস করে, ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে না নিলে ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাবে না।
অন্যদিকে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে হিজবুল্লাহ স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েলি সেনা লেবাননে অবস্থান করা পর্যন্ত তারা অস্ত্র নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি উপস্থিতি হিজবুল্লাহর ‘প্রতিরোধ আন্দোলন’-সংক্রান্ত রাজনৈতিক অবস্থানকে আবারও শক্তিশালী করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো নিক ব্ল্যানফোর্ড বলেন, ‘ইসরায়েলি দখলদারিত্ব হিজবুল্লাহর প্রতিরোধের বয়ানকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। ফলে এখন সরকারের জন্য হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি সতর্ক করেন, যদি আবার সংঘাত শুরু হয়, তাহলে লেবাননের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।




