kalerkantho


কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙালি অজপাড়া গাঁয়ের বধু!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ২১:১১



কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙালি অজপাড়া গাঁয়ের বধু!

কানাডার কিউবেক প্রদেশের মন্ট্রিল আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমানের কালনার মধ্যে কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব। সেই দূরত্ব মুছে দিল প্রেম। আঠাশ বছর বয়সী ক্যাথরিন ওয়ালেট আর ত্রিশ বছর বয়সী টিঙ্কু রায়ের প্রেম। অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে ক্যাথরিনের ঠিকানা এখন কালনা শহর লাগোয়া আশ্রমপাড়ার শ্বশুরবাড়ি। 

দুর্গাপজার সপ্তমীর দিন সাতপাকে বাঁধা পড়া ক্যাথরিনই এখন টিনের চালের নীচে, পাটকাঠির বেড়ায় ঘেরা বাড়ির নয়নের মণি।

প্রেম কাহিনিটা সিনেমা কাহিনীর মতোই। ক্যাথরিনের বাবা সিলেস ওয়ালেট আর মা হেলেনি ফ্রেচেট, দুজনই নার্সের চাকরি করেন। বোন ভ্যালেরিকে নিয়ে বছরখানেক আগে ভারতে বেড়াতে এসেছিলেন ক্যাথরিন। ঘুরতে ঘুরতে উত্তরাখণ্ডের হৃষিকেশের একটি যোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দেন কানাডার তরুণী। সেখানে আলাপ ও প্রেম যোগ প্রশিক্ষক টিঙ্কুর সঙ্গে। সেই প্রেম আরও গাঢ় হয়, পরিণতি গড়ায় বিয়েতে।

আশ্রমপাড়ার নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান টিঙ্কু। চার ভাইয়ের মধ্যে সেজ। বাবা শিবানন্দ সেলুনের সামান্য আয় থেকে মানুষ করেছেন চার ছেলেকে। দারিদ্র থেকে মুক্তি পেতে টিঙ্কু লড়াই শুরু করেছিলেন বেশ কয়েকবছর আগেই। ২০১১-তে সোনারপুরের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর বছর দুয়েক তিনি ছিলেন দুবাইয়ে। ২০১৪ সালে বাড়ি ফিরে কালনা কলেজ থেকে যোগের একটি সার্টিফিকেট কোর্স করেন। তার পর হরিদ্বারে গিয়ে যোগগুরু রামদেবের আশ্রমে ছিলেন মাস তিনেক। পরে হৃষিকেশের লক্ষ্মণঝুলার কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকার পাশাপাশি ওই এলাকার কয়েকটি যোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পার্টটাইম প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

২০১৭-র অক্টোবরে বোনের সঙ্গে ভারতে বেড়াতে আসেন শিক্ষিকা ক্যাথরিন। কানাডাতে চার বছরের মাস্টার্স করার পর সেখানকার একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। হৃষিকেশের যোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে টিঙ্কুর সঙ্গে আলাপের পর প্রেম। টিঙ্কু জানান, প্রথম দেখাতেই ক্যাথরিনকে ভালো লেগে গিয়েছিল তাঁর। ক্যাথরিন বলেন, মানুষ হিসাবে টিঙ্কুকে তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। গত জানুয়ারিতে কালনায় এসে টিঙ্কুর বাড়িতে সপ্তাহ দুয়েক কাটিয়েও যান ক্যাথরিন।

এ বছরের সেপ্টেম্বরে দুজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক হয়, মহাসপ্তমীতে হবে বিয়ে। এই সম্পর্কে সম্মতি দেন ক্যাথরিনের অভিভাবকরা, যাঁরা আদতে ফরাসি বংশোদ্ভূত। পুরো বাঙালি রীতি মেনে ক্যাথরিন বাঁধা পড়েন সাত পাকে। সুদূর কানাডা থেকে মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করেন ক্যাথরিনের মা-বাবা।

হাতে শাখা আর সিঁথিতে লাল সিঁদুর, পরনে আটপৌরে শাড়ি। একেবারে নতুন সাজগোজে ইতিমধ্যেই শ্বশুরবাড়িতে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন ক্যাথরিন৷ জীবন ক্রমশ বদলে যাচ্ছে তাঁর। সামান্য বাংলা বলতে পারেন। বাংলায় সাবলীল হওয়ার জন্য তালিমও নিচ্ছেন।

কী ভাবে শিখছেন? প্রশ্ন করতে ঘরের ভিতর থেকে একটা খাতা নিয়ে এসে দেখান ক্যাথরিন। বোঝান, কী ভাবে বাংলা শিখছেন তিনি। যেমন, ‘হাউ আর ইউ’ লিখে তার পাশে ইংরেজিতে লেখা ‘তুমি কেমন আছো’৷

ক্যাথরিন বলেন, ‘গত শীতে কালনায় এসে নলেন গুড়ের রসগোল্লা খুব ভালো লেগেছিল আমার। এখানকার অন্যান্য সন্দেশ, মিষ্টিও ভালো লেগেছে।’ শুধু কী তাই, রুটি আর বেগুনভাজাও খুব প্রিয় তাঁর। কানাডায় রান্না করতেন ক্যাথরিন, কিন্তু এখানকার রান্নার পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও ফেলে আসা দেশের রান্না করতে পারছেন না। 

এই ক’দিনেই আপন হয়ে ওঠা বৌমার সর্বক্ষণ খেয়াল রাখছেন শাশুড়ি দীপ্তি রায়। বললেন, ‘ছেলে আর বৌমা দু’জনেই নিরামিষ খান। তাই ওঁদের জন্য থালা-বাসন সব আলাদা রেখেছি।’ পূর্বস্থলী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, সম্পর্কে ক্যাথরিনের ননদ মনিকা কীর্তনিয়ার পছন্দ হয়েছে বৌদিকে। বলেন, ‘বৌদি খুব খোলা মনের। মুখে সব সময় হাসি লেগে রয়েছে৷ এই কয়দিনেই সকলের আপন হয়ে উঠেছে৷’

এ বার পুজায় টিঙ্কুদের পাড়ায় আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন ক্যাথরিন। টিঙ্কুদের বাড়ির পাশেই পুজা হয়। সবার কৌতূহল বাঙালি বাড়ির মেম বৌকে ঘিরে। ক্যাথরিনও জানালেন, পুজা খুব উপভোগ করেছেন। স্বামীকে নিয়ে ১৫ নভেম্বর কানাডা পাড়ি দিচ্ছেন তিনি। কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে ফিরবেন শ্বশুরবাড়িতে।



মন্তব্য