kalerkantho


সৌদি যুবরাজকে কি শেষরক্ষা করতে পারবেন ট্রাম্প?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ২১:১৯



সৌদি যুবরাজকে কি শেষরক্ষা করতে পারবেন ট্রাম্প?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বিদেশি মিত্র ও সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রক্ষার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লক্ষ্যে উভয় পক্ষের জন্য সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজছে সৌদি আরবের রাজপরিবার এবং ট্রাম্প প্রশাসন। উভয় প্রশাসন এমন ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে চাইছে, যুবরাজের সংশ্লিষ্টতা গোপন করা যায়। 

বিভিন্ন দেশের একাধিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ খবর জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এরপরও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এড়াতে পারবেন না যুবরাজ। কারণ, খাশোগির পরিণতি সম্পর্কে সৌদি সরকার শুধু অবহিতই নয়; বরং নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ বেরিয়ে আসছে একের পর এক।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন, খাশোগির বন্ধু-বান্ধবদের বয়ান, পাসপোর্ট ও সামাজিক মাধ্যমের তথ্য সৌদি আরব ও দেশটির যুবরাজের কট্টর সমালোচককে হত্যার নৃশংস চিত্র হাজির করেছে। যা প্রমাণ করে খাশোগিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে যুবরাজের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।

বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, তুরস্কের কর্মকর্তারা খাশোগিকে হত্যার জন্য ১৫ সদস্যের গোয়েন্দা দলের ইস্তানবুল সফরের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা দুর্বৃত্তরা করেছে বলে মেনে নেওয়াটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমানের সঙ্গে ফোনালাপের পর এমনটাই দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা রুডল্ফ ডব্লিউ, জিউলিয়ানি জানিয়েছেন, খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন সৌদি আরব খাশোগিকে হত্যা করেছে।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখন একমাত্র প্রশ্ন হলো, যুবরাজ বা বাদশাহ কি এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন নাকি তাদের খুশি করতে একদল লোক এই কাণ্ড ঘটিয়েছে?

২ অক্টোবর ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেট ভবনে প্রবেশের আগে থেকেই খাশোগিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিলেন যুবরাজ। কয়েক মাস আগেই তিনি খাশোগিকে সৌদি আরবে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সৌদি কর্মকর্তাদের পরিকল্পনার আলোচনা থেকে এটা জানতে পেরেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

নিখোঁজ সাংবাদিকের বন্ধু ও আরব আমেরিকান রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট খালেদ সাফুরি বলেন, সেপ্টেম্বরে যুবরাজের ঘনিষ্ঠ ও সৌদি আরবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সৌদ আল-কাহতানি দেশে ফেরার জন্য খাশোগির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাকে দেশে ফিরলে যুবরাজের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও নিরাপদে দেশে ফেরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। খাশোগি এই বিষয়ে বলেছিলেন, আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন? আমি তাদের একবিন্দুও বিশ্বাস করি না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাশোগির আরেক বন্ধুও যুবরাজের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।

অক্টোবরের ২ তারিখে খাশোগি নিজের বান্ধবীকে বাইরে রেখে ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, সেখানে তার জন্য সৌদি গোয়েন্দাদের ১৫ সদস্যের একটি দল অপেক্ষা করছিল। এই অভিযানের জন্যই তারা রিয়াদ থেকে ইস্তানবুলে আসে। এই দলের বেশ কয়েকজন যুবরাজ ও সৌদি রাজকার্যের সঙ্গে জড়িত।

যেমন- এই দলের একজন খালিদ আয়েদ আলোতুয়াইবি। তিনি বেশ কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন বা উচ্চপদস্থ সৌদি কর্মকর্তাদের সফরসঙ্গী ছিলেন। এই বছরের শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এর তিনদিনের মাথায় যুবরাজ দেশটিতে যান বলে মার্কিন সরকারের সংরক্ষিত পাসপোর্টের তথ্যে জানা গেছে। অনলাইনে আলোতুয়াইবিকে সৌদি রয়্যাল গার্ডের একজন সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা গেছে।

ইস্তাম্বুলে অভিযানে আসা ১৫ সদস্যের দলটির মধ্যে যে ১১ জনের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সেবার যোগসূত্র রয়েছে আলোতুয়াইবি তাদের একজন। ওই ১১ জনের সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, ইমেইল, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-তে ত্রিশ বছরের বেশি কাজ করা সৌদি আরব ও রাজপরিবার বিশেষজ্ঞ এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র গবেষক ব্রুস রেইডেল বলেন, রাজরক্ষী ও রাজসভার সদস্যদের দ্বারা কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে এমন অভিযান পরিচালনা যুবরাজের নির্দেশ বা অনুমতি ছাড়া হয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। হোয়াইট হাউস যুবরাজকে রক্ষায় উদগ্রীব। যদিও সরকারিভাবে এটা ঘোষণার আগেই দুর্বৃত্তদের কাণ্ড বলে চালিয়ে দেওয়াটা ধোপে টিকছে না।

এদিকে, খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবকে রক্ষার চেষ্টার কথা অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আমি কিছুই আড়াল করছি না। তারা আমাদের মিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের আরও মিত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো মিত্র সৌদি আরব। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে অকপটতা ও দায়বদ্ধতার ওপর। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও সন্ত্রাস দমন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা লিসা মোনাকো বলেন, সৌদি আরবের ধারাবাহিক পথচ্যুতির ঘটনার প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন কী করবে তা স্পষ্ট নয়। 

তবে এটা স্পষ্ট যে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে একেবারে ছেড়ে দেবে না। সন্ত্রাস দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীল উদ্যোগের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা আমাদের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু এরপরও আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিভিন্ন দেশকে দায়বদ্ধতার মধ্যে রাখতে পারি এবং সংস্কারের জন্য চাপ অব্যাহত রাখতে পারি।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে তুরস্কের কাছে ফাঁস হওয়া কথোপকথন চেয়েছেন। কিন্তু একান্তে মার্কিন কর্মকর্তারাও মনে করেন, তুর্কি কর্মকর্তাদের দাবি না মানার কোনও কারণ নেই। এখন পর্যন্ত খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ সরাসরি যুবরাজ দিয়েছেন বলে কোনও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইস্তাম্বুলে সৌদি হত্যাকারী টিমের উপস্থিতি ও অভিযান পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানেন না এটা মনে করার কোনও কারণ নেই।



মন্তব্য