kalerkantho


সরকারকে ধুয়ে মোদিকে জড়িয়ে ধরলেন রাহুল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২১ জুলাই, ২০১৮ ১১:২৬



সরকারকে ধুয়ে মোদিকে জড়িয়ে ধরলেন রাহুল

ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় গতকাল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর কড়া ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আলিঙ্গন করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। ছবি : সংগৃহীত

অনেকক্ষণ ধরে কঠোর ভাষায় কাউকে আক্রমণ করার পর পরক্ষণেই তাকে আলিঙ্গন করবে বক্তা—এই আশা কেউই করে না, বরং কাছে গেলে নেতিবাচক কিছু ঘটার আশঙ্কায়ই মন আঁতকে ওঠে। গতকাল শুক্রবার ভারতের লোকসভায় কংগ্রেস সভাপতি বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সমালোচনামুখর ভাষণ শেষ করে হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জড়িয়ে ধরে এমনই এক নাটকীয় দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ঘৃণার বিনিময়ে কিভাবে ভালোবাসা দিতে হয়, তীব্র সমালোচনা করলেও উদারতা কিভাবে মনে ধরে রাখতে হয়, তা-ই যেন তিনি বোঝাতে চাইলেন।

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারা  বিদ্রূপ করে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে ‘পাপ্পু’ বলে ডাকেন; যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘হাবাগোবা’ বা ‘বোকারাম’। এটা যে তাঁকে ঘৃণা করে ব্যবহার করা হয়, সেটা উল্লেখ করে রাহুল তাঁর আক্রমণাত্মক ভাষণ শেষে হঠাৎ বলে ওঠেন, “আমি জানি, আপনারা আমাকে ‘পাপ্পু’ বলে ডাকতে পারেন। কিন্তু আমি আপনাদের ভালোবাসি।” এ কথা বলেই তিনি নিজের আসন ছেড়ে সোজা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে দাঁড়ান এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরেন।

গতকাল লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা ভোটের বিতর্ক চলাকালে তুমুল হৈচৈয়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় লোকসভার সদস্য ও সরকারি জোটের সদস্যরা রাহুলের এ আচরণকে ইতিবাচক বলে প্রশংসা করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রাহুল ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। তবে লোকসভার স্পিকার বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি। তিনি বিষয়টিকে পার্লামেন্টের রীতিবিরোধী বলে রাহুলকে সতর্ক করে দেন। রাহুলের এই ‘বিজয়’ সহজে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় বিজেপিও। পরে টুইটারে ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষ থেকে লেখা হয়েছে, ‘এই বিনোদনের জন্য আমরা আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে ধন্যবাদ জানাতে পারছি না।’

এনডিটিভি জানায়, আস্থা ভোট হওয়ার কারণেই হয়তো গতকাল রাহুল গান্ধীর ভাষণের মূল টার্গেটই ছিল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেস সভাপতি তাঁর ভাষণ শুরুই করেন মোদি কিভাবে তাঁর ‘ব্যাবসায়িক বন্ধুদের’ আর্থিক সুবিধা দিয়ে আসছেন তার ফিরিস্তি দিয়ে। এনডিটিভির ভাষ্য, লোকসভার অনাস্থা ভোটের ওপর বিতর্কে রাহুল গান্ধী তাঁর দীর্ঘ ও ঝাঁজালো ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করেন।

রাহুল তাঁর ভাষণে ভারতে গণপিটুনিতে মৃত্যু থেকে শুরু করে ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফেল যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তির দুর্নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। রাহুল বলেন, দেশের কৃষকদের কথা, শ্রমিকদের মনের কথা প্রধানমন্ত্রী শুনতে পান না। প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত ধনীদের নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন বছরে দুই কোটি চাকরি দেবেন। কোথায় চাকরি? প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ রুপি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কোথায় সেই রুপি। রাহুলের দাবি, কৃষকের বদলে ধনকুবেরদের ঋণ মওকুফ এই সরকারের অগ্রাধিকার। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের নারী, সংখ্যালঘু, দলিত কেউ সুরক্ষিত নয়। আর এ ব্যাপারে কোনো কথা বলছেন না প্রধানমন্ত্রী।

রাফেল যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই চুক্তি করেছে মোদি সরকার। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ রাফেল চুক্তি নিয়ে মিথ্যা বলেছেন। রাহুল বলেন, কী করে এক হাজার ৬০০ কোটি রুপি হলো একেকটি বিমানের দাম?

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল আরো বলেন, ‘চালাকি ধরা পড়ে যাওয়ায় আমার দিকে তাকাতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী। আমার চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই তাঁর। তাই এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন তিনি।’ রাহুলের এই আক্রমণে হেসে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় রাহুলের হুল ফোটানো বক্তব্য সহ্য করতে না পেরে তুমুল হৈচৈ শুরু করেন সরকারি দলের এমপি। এ অবস্থায় লোকসভার অধিবেশন আট মিনিটের জন্য মুলতবি করে দেন স্পিকার।

পুনরায় অধিবেশন শুরু হলে রাহুলের আক্রমণের ঝাঁজও বাড়তে থাকে। শেষের সহিষ্ণুতার বার্তা দিয়ে রাহুল বলেন, “বিজেপি ও আরএসএস আমাকে ভারতীয় হওয়ার মানে বুঝিয়েছে। আমাকে হিন্দু হওয়ার মানে বুঝিয়েছে। আপনাদের বিরুদ্ধে আমার হাজারো অভিযোগ আছে। আপনারা আমাকে ‘পাপ্পু’ বলেন। কিন্তু তাতে আপনাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এতটুকু ভাটা পড়েনি।”

এর পরই বিরোধী আসন থেকে উঠে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জড়িয়ে ধরেন রাহুল গান্ধী। প্রাথমিকভাবে রাহুলের এ আচরণে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হকচকিয়ে যান। মুহূর্তে সামলে নিয়ে পাল্টা রাহুলের সঙ্গে হাত মেলান মোদি।

পরে অবশ্য রাহুলের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।

‘আপনারা আমাকে পাপ্পু বলেন। আমার প্রতি আপনাদের অনেক ঘৃণা আছে। কিন্তু আমি আপনাদের সবাইকেই ভালোবাসি। দেশে এই সংস্কৃতি চালু করেছে কংগ্রেস।’ এ কথা বলতে বলতে আচমকা নিজের জায়গা ছেড়ে হেঁটে চলে যান মোদির আসনের কাছে। মোদি ছিলেন বসে। ওই অবস্থাতেই রাহুল ঝুঁকে জড়িয়ে ধরেন প্রধানমন্ত্রীকে। সূত্র : এনটিভি, জিবাংলা। 



মন্তব্য