kalerkantho


বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা কেমন আছেন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ মে, ২০১৮ ০৯:২৯



লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা কেমন আছেন

লেবাননে বুর্জ আল বারাজনেহর একটি শরণার্থী শিবির। সেখানে একেকটা বাড়ির মাথায় উড়ছে ফিলিস্তিনি পতাকা। সরু সরু রাস্তা। ওপরে মাকড়সার জালের মতো পেঁচানো বিদ্যুতের তার।

স্পিকারে খুব জোরে জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল একটি গাড়ি।

এই শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা খুব একটা সুখকর নয়। বেঁচে থাকার অর্থ রোজগারের জন্য কোনো কাজ নেই। বসবাসের পরিবেশও খুব খারাপ। এই ক্যাম্পে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবসে কথা বলছিল  পেছনে ফেলে আসা তাদের বাড়িঘর সম্পর্কে।

একজন শরণার্থী বলেন, 'আমাদের জন্য এই নাকবা খুব খারাপ একটি দিন। নিজেদের দেশ ও ভূমির কথা আমাদের মনে পড়ে। এ রকম একটি খারাপ পরিবেশে আমরা কেন বসবাস করছি?'

আরেকজন নারী শরণার্থী বলেন, 'আমার বয়স ১৫। লেবাননেই আমার জন্ম। এখানেই আমি বড় হয়েছি। কিন্তু আমার দাদা-দাদি, নানা-নানি সবাই তাদের ফেলে আসা জীবনের কথা বলেন। আমার বাবা-মাও সেসব দেখেননি। কিন্তু তারপরও তারা ফিলিস্তিনে ফিরে যেতে চান। আমিও চাই ফিরে যেতে।'

এটিকে ক্যাম্প বলা হলেও এখানে কোনো তাবু নেই, নেই অস্থায়ী বাড়ি-ঘরের কোনো কাঠামো। কিন্তু তারপরও এটিকে ক্যাম্প বলা হয় কেন? কারণ ফিলিস্তিনিরা মনে করেন লেবাননের এই জায়গাটি তাদের অস্থায়ী ঠিকানা। তারা স্বপ্ন দেখেন ৭০ বছর আগে তারা যেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন, কিম্বা তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে, সেখানে তারা একদিন ফিরে যাবেন।

'নিজের ভূমি থেকে দূরে থাকা খুব কঠিন। সেখানে আমরা যেতেও পারি না। আল্লাহ চাইলে আমি আমার নিজের দেশে মরতে চাই। আমি চাই সেখানেই আমার কবর হোক। আমার বিশ্বাস একদিন আমরা ফিরে যাবো এবং সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে'-বলেন একজন।

লেবাননের এরকম বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করেন প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী। তাদের বেশিরভাগই ১৯৪৮ সালের ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের সময় নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন, কিম্বা তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ৭০ বছর আগের ১৫ মে, ফিলিস্তিনিরা যে দিনটি পালন করে নাকবা দিবস হিসেবে। শরণার্থীরা বহু বছর ধরে লেবাননে বসবাস করলেও তাদের জীবনযাপন অনেক সীমিত। বঞ্চিত অনেক অধিকার থেকেও।

এরা যে শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে শরণার্থী হয়েছেন-তা নয়। লেবাননেও একটি জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে  তাদের যুদ্ধ চলছে। দেশটিতে এতরকমের গোষ্ঠী রয়েছে যে কখন কোনো গ্রুপ কার সঙ্গে যুদ্ধ করছে- সেটা বুঝতে পারাও খুব কঠিন।

লেবাননের জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন সবসময়ই বিস্ফোরকের মতো। বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে লেবাননের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের অনেকের  কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। নির্ধারিত ক্যাম্পের বাইরে আর কোথাও তাদের বসবাসের অনুমতি নেই। তারা জায়গা জমি কিম্বা বাড়িঘরও কিনতে পারে না।

জানা আল মাওয়া এই ক্যাম্পেরই একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, 'ফিলিস্তিনি ছেলেমেয়েরা ছেঁড়া ও ময়লা জামা কাপড় পরে। তারা যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায় তাদেরকে দেখা হয় বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে।'

'এখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা মনে করে তারা যদি লেবানিজ সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করেন তাহলে তারা হয়তো তাদের ফিলিস্তিনি পরিচয় হারিয়ে ফেলবেন'-  বলেন তিনি। লেবাননের একজন এমপি নাদিম জামায়েল মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকার দিতে তার দেশ এখনও প্রস্তুত নয়।

'ফিলিস্তিনিরা এখানে আছেন শরণার্থী হিসেবে। তাদের নাগরিকত্ব বা অন্যান্য অধিকার দেওয়া সম্ভব নয়। সেরকম কিছু হলে, লেবাননের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে সম্প্রীতি রয়েছে- সেটা নষ্ট হবে। সেটা করতে দেওয়া যাবে না।'  



মন্তব্য