kalerkantho


নারীরা বিশ্বস্ত হয় পুরুষ ফেরেববাজ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৫:০১



নারীরা বিশ্বস্ত হয় পুরুষ ফেরেববাজ

মাইকেল ওলফের 'ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি' গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? জানতে পড়ুন বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

নানা বিচারেই ট্রাম্প একজন নারীবিদ্বেষী, তবে কর্মক্ষেত্রে তাঁকে পুরুষের তুলনায় বেশি নারীঘেরা দেখা যায়। নারীতে বেশি বিশ্বাস তার, পুরুষদের রাখেন ১০ হাত দূরে। অফিসে কর্মরত নারীদের তিনি পছন্দ করেন, তাদের প্রয়োজন বেশি বোধ করেন, নিজের বেশির ভাগ কাজে নারীদের ওপর আস্থাও রাখেন। ট্রাম্প মনে করেন, পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি বিশ্বস্ত। পুরুষের শক্তিমত্তা ও দক্ষতা তুলনামূলক যদি বেশি হয়ও, তাদের নিজস্ব মতলব থাকে বেশি—এ হচ্ছে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি। নারীরা, কিংবা ট্রাম্পের দেখা নারীরা পুরুষদের সামনে রেখেই নিজেদের লক্ষ্যে এগোয়, যদি পুরুষটি ট্রাম্পের মতো হয়। তাঁর বিশ্বাস, নারীরা, অন্তত তিনি যাদের পছন্দ করেন, তারাই তাকে বেশি ভালো বুঝতে পারে পুরুষদের তুলনায়। এক বন্ধুকে ট্রাম্প বলেছিলেন, নারীদের মধ্যে এক ধরনের আত্মসচেতনতাবোধ থাকে। তাঁর কাছাকাছি থাকে যে শিক্ষানবিশটি তিনি একজন নারী। আর সবচেয়ে বিশ্বাস বেশি যে নারীটিতে, তিনি অবশ্য ইভানকা, প্রেসিডেন্ট-কন্যা।


আরো পড়ুন: চিনে নেওয়া যাক ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের


ট্রাম্পের সঙ্গে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন এমন অনেকে বলে থেকেন, মানুষটির মধ্যে এক ধরনের আড়াল আছে, কিছু কথা বলেন না, বুঝে নিতে হয়। ট্রাম্পের দরকার হয় শুধু বিশেষ না, সবিশেষ যত্নের। তাঁর নারীবিদ্বেষ মনোভাব যেমন রয়েছে, আছে যৌনতাবোধ লুকিয়ে রাখার একটা সার্বক্ষণিক প্রবণতা। যারা বিষয়টি মেনে নেয়, কিংবা গায়ে মাখে না বা এতে আনন্দ পায় অথবা আত্মরক্ষা করতে পারে, কেবল তারাই তাঁকে ভালো বুঝতে পারে।

শেষ দিকে এসে ট্রাম্পকে কাছ থেকে দেখেছেন যেসব নারী, তাঁদের একজন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা কেলিয়ান কনওয়ে। মারসারস কম্পানির মাধ্যমে আসা কনওয়ে ক্যাম্পেইনের দিনগুলোতে সহায়তা করেছেন, পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে প্রেস সেক্রেটারি হওয়ার প্রস্তাব দেন। ট্রাম্পের মাধ্যমে চাকরি হয়েছে কনওয়ের স্বামীরও। কনওয়ে এই বইয়ের (ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি) লেখককে বলেছেন, 'ট্রাম্প ও আমার মা দুজনই টিভির পোকা এবং দুজনই মনে করেছি পদটি অনেক বড়।' ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলের তথ্য ফাঁস নিয়ে যখন হুলুস্থুল, অভিযোগের আঙুল কনওয়ের দিকেও ওঠে। রেগেমেগে ওভাল অফিসে কনওয়ে হুমকি দেন, 'তাহলে আমি চলেই যাই।' ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল : আমার প্রশাসনে তোমার স্থানটি সব সময়ের জন্য; তুমি এখানে আট বছর থাকবে। ট্রাম্পের আস্থাভাজন হওয়ার পরও হোয়াইট হাউসের ডানপন্থীদের চর অভিযোগে কনওয়েকে একঘরে হতে হয় এবং এ জন্য তিনি গণমাধ্যমকেই দায়ী করেন। আড়ালের সত্যটা হচ্ছে, গণমাধ্যম প্রকাশ্যে আহত করলেও তাদের কারণে বাস্তবে ট্রাম্প-কনওয়ে সম্পর্ক আরো গভীর হয়।


আরো পড়ুন: ট্রাম্প বড় ভালো মানুষ : স্টেফানি


আরেক নারী ২৬ বছর বয়সী হোপস হিকস প্রচারের দিনগুলোতে পাশে ছিলেন ট্রাম্পের, পরে হোয়াইট হাউসেও স্থান হয়, দায়িত্ব-গণমাধ্যম নজরদারি। হিকস ট্রাম্পের কাছাকাছি আসেন কন্যা ইভানকার মাধ্যমে। হিকস ইভানকার বরাবরই বিশ্বাসভাজন ছিলেন। পাশাপাশি দেখলে মনে হবে, হিকসই প্রেসিডেন্ট-কন্যা আর তাঁর স্ত্রী হচ্ছেন ইভানকা।

নতুন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে ঢুকলে হোয়াইট হাউসে করেসপনডেন্টস ডিনার হবে, এটি দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। অংশ নিতে অতি উৎসাহী ছিলেন ট্রাম্পও। কিন্তু তাঁর লোকজনের ভয় হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সব না কেঁচে গণ্ডূষ করে ফেলেন। ভয়টি বোঝানো হলো এবং ট্রাম্পও নৈশভোজে না যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন কনওয়ে, হিকসসহ অন্যরা।

প্রেসিডেন্সির ঠিক ১০০তম দিনে বিকেল ৫টার পর হোয়াইট হাউস বিটের সাংবাদিকরা ওয়াশিংটন হিল্টনে জড়ো হয়েছেন। মেরিন ওয়ানের উদ্দেশে উড়াল দিলেন প্রেসিডেন্ট, সঙ্গে ব্যানন, কনওয়ে, হিকসসহ আরো অনেকে। বিমানে কাঁকড়ার কেক খেতে খেতে শততম দিন পূর্তির সাক্ষাৎকার দিলেন প্রেসিডেন্ট ফেস দ্য ন্যাশনের জন ডিকারসনকে। মাটিতে নেমে দুই অনুষ্ঠানে পৃথক বক্তব্য দিলেন প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর কর্মীরা জাতিকে দেখালেন, ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে ডিনারে বসে বন্ধুদের ফোন করার মতো তুচ্ছ কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন না! তাঁরা চেষ্টা করছিলেন ট্রাম্পকেও ভুলিয়ে রাখতে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ঘুরেফিরেই খোঁজ নিচ্ছিলেন সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে কী হচ্ছে জানতে; এ নিয়ে তিনি মজা করতে চাইছিলেন।

'কুত্তার বাচ্চাটা এফবিআইপ্রধানকে ছাঁটাই করার চেষ্টা করতে যাচ্ছে', বলেছিলেন ফক্স নিউজের সাবেক সিইও রজার এইলস, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পর। মে মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে অ্যাটর্নি জেনারেল সেশন ও তাঁর ডেপুটি রড রোজেনস্টাইনকে নিয়ে মিটিং করে গেলেন ট্রাম্প। দুজন এফবিআইপ্রধান কোমেকে বরখাস্ত করার মতো দোষ কেন খুঁজে পাচ্ছে না, ট্রাম্প তিরস্কারও করলেন। আরো একটি বৈঠক হয়েছিল ওই সপ্তাহে। রুদ্ধদ্বার সে বৈঠকে ট্রাম্প বললেন : সব ডেমোক্রেটরা কোমেকে ঘৃণা করে। এফবিআই এজেন্টরাও তাঁকে ঘৃণা করে, তাদের ৭৫ শতাংশের চক্ষুশূল কোমে (হিসাবটি কুশনারের দেওয়া)। কোমেকে বরখাস্ত করা হলে দলের চাঁদা তোলায়ও সুবিধা হবে। মেয়ে, মেয়েজামাই, ব্যানন, ম্যাকগান—সবাই হাজির ছিলেন সভায়। উপদেষ্টা ম্যাকগান প্রেসিডেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, রুশ তদন্ত কোমে নিজে করছেন না, তাঁকে সরিয়ে দিলেও তদন্ত থামবে না। খেপে উঠলেন ট্রাম্প : 'কোমে একটা ইঁদুর। ইঁদুরে চারপাশ ছেয়ে গেছে। জন ডিন, জন ডিন। তোমরা জান, জন ডিন কী করেছিলেন নিক্সনের?' আসলে এভাবেই ট্রাম্প ব্যক্তি মানুষকে দিয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। জন ডিনের ওপর খেপেছেন ট্রাম্প, কারণ এক টক শোতে ডিন ট্রাম্প-রাশিয়া তদন্তকে ওয়াটারগেটের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্যানন জানেন, কোমের পেছনে ট্রাম্পকে লাগিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে প্রেসিডন্ট-কন্যা ও প্রেসিডেন্ট-জামাতা রয়েছেন। তাই বাধা দিতে চাইলেন। প্রিবাসের পক্ষ নিয়ে ব্যানন বললেন, 'এফবিআইপ্রধানকে সরিয়ে কী লাভ! রুশ কেলেঙ্কারি গণমাধ্যমের জন্য ৩ নম্বর স্টোরি। কোমেকে হটানো হলে সে খবর এক নম্বরের।' ট্রাম্প শুনলেন না। ওই সপ্তাহে আবহাওয়া খারাপ। প্রেসিডেন্ট গলফে গেলেন না। মেয়ে, মেয়েজামাই ও মিলারের সঙ্গে সলাপরামর্শ চালিয়ে গেলেন কিভাবে কোমে থেকে রেহাই পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্ট ৮ মে সোমবার ওভাল অফিসের সভায় প্রিবাস ও ব্যাননকে জানালেন, এফবিআইপ্রধান আর থাকছেন না। প্রায় একই সময় সালি ইয়াতেস সিনেটের বিচার বিভাগীয় কমিটির অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ উপকমিটিতে হাজির হলেন, সঙ্গে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের সাবেক পরিচালক জেমস ক্ল্যাপার। জানুয়ারিতে ট্রাম্প ছাঁটাই করেছিলেন সালিকে। এই বেদনা নিয়ে ১০ জানুয়ারি থেকে চুপই ছিলেন সালি। সাক্ষ্য দিতে এসে কংগ্রেসকে ঠাণ্ডা মাথায় আদ্যোপান্ত বললেন ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি তথা আগুন ও উন্মত্ততার কাহিনি। বিষয়টি কানে যেতেই ট্রাম্প অগ্নিশর্মা : 'কে এই সালি? কেউ ছিল না। আমি তাকে তুলে এনেছিলাম। আমার কারণেই আজ তাকে মানুষ চেনে।'

পরদিন ৯ মে মঙ্গলবার সকালেও প্রেসিডেন্ট কোমে ইস্যুতে আগের অবস্থানে থাকলেন। তাঁর  সমর্থনে ইভানকা ও কুশনার। শেষ চেষ্টা হিসেবে চিফ অব স্টাফ প্রিবাস প্রেসিডেন্টকে বললেন : 'একটি কাজ শুদ্ধভাবে যেমন করা যায়, ভুলভাবেও করা যায়। কোমে টিভির খবর দেখে কেন বরখাস্তের খবরটি পাবেন? তাঁকে ডাকেন, কথা বলেন, প্রক্রিয়াটি সুন্দর হবে, প্রফেশনালও হবে।' মনে হলো, শুনে প্রেসিডেন্ট খানিকটা ধাতস্থ হলেন। আসলে তিনি তর্ক এড়ালেন। যথারীতি নিজের চিন্তায় কাউকে ঢুকতে দিতে চাইলেন না। সেদিন বেশির ভাগ সময় কোমেকে সরানোর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন ট্রাম্প। ওদিকে তাঁর নির্দেশে অ্যাটর্নি জেনারেল সেশনস ও তাঁর ডেপুটি রড রোজেনস্টাইন এফবিআইপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা তৈরি করেছেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের আওতায় নেই! সেই অভিযোগনামায় বলা হবে, হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল কেলেঙ্কারির তদন্ত কোমে যথার্থভাবে করেননি। এভাবেই প্রেসিডেন্ট এফবিআই, বিচার বিভাগ, এমনকি কংগ্রেসের অনেকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রায় কাছাকাছি চলে গেলেন। পরিণতির বিচারে দেশটির প্রেসিডেন্সির ইতিহাসে মোটা দাগে লেখা হয়ে থাকবে একটি তথ্য : যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক যুগের একজন প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে এফবিআই পরিচালককে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

বিকেলের দিকে ট্রাম্প চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি মেয়ে ও মেয়েজামাইকে জানালেন এবং ৫টার একটু আগে ট্রিগার চাপলেন। এ ঘটনায় দুই ভাগ হয়ে গেল হোয়াইট হাউস। একদিকে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পরিবার, অন্যদিকে ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত, হতভম্ব অন্য কর্মীরা। ব্যানন শেকসপিয়রীয় স্টাইলে বললেন, 'মেয়ে একদিন টেনে নামাবে বাবাকে।' ট্রাম্প মনে করলেন, ঘটনাটি তাঁকে আরো একবার নায়ক বানাবে। উল্লসিত ট্রাম্প পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা জনে জনে ফোন করে কৃতিত্ব জাহিরেরও চেষ্টা করলেন।

মে ১৭। কোমেকে ছাঁটাইয়ের পর ১২ দিন কেটে গেছে। দুঃসাহসিক এক কাজ করলেন রোজেনস্টাইন। হোয়াইট হাউস ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে অবহিত না করেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তকাজ নজরদারির জন্য নিয়োগ দিলেন সাবেক এফবিআই পরিচালক রবার্ট মুয়েলার। রোজেনস্টাইন এক ধরনের আত্মতৃপ্তিই বোধ করছিলেন এই ভেবে : তিনি যা করেছেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের জন্য তা বড় নৈতিক আঘাত হতে হবে। ব্যানন বিস্ময়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ট্রাম্প জানেনই না তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে!

 


মন্তব্য