kalerkantho


আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ডের আড়ালে এ কী চলছিল!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ২১:৪৬



আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ডের আড়ালে এ কী চলছিল!

বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেই আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরমহলের ছবিটা একেবারেই ‘আধ্যাত্মিক’ সুলভ নয়। ভারতের দিল্লির স্বঘোষিত ধর্মগুরু বীরেন্দ্র দেব দীক্ষিতের আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ‘সেবা’ই ছিল যৌনতা। আধ্যাত্মিক পাঠ দেওয়ার নাম করে কিশোরী থেকে যুবতীদের ডেকে আনা হত আশ্রমে। তারপর তাদের নামানো হত দেহ ব্যবসায়। বিগত ৪০ বছর ধরে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল দীক্ষিত।

দিল্লিতে দীক্ষিতের আশ্রমে পুলিশি অভিযানের সময় খোঁজ মেলে অনেক গোপন কুঠুরির। যেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল আশ্রমের মেয়েদেরও। সেই কুঠরিগুলিতেই চলত দেহ ব্যবসা। ১৪ বছরের কিশোরীকেও ফুসলিয়ে নিয়ে আসা হত আশ্রমে। যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে, সর্বক্ষণ নজরদারি চালানোর জন্য আশ্রম ছয়লাপ ছিল সিসিটিভিতে। কিন্তু কীভাবে এই বিশাল সাম্রাজ্যের ডালাপালা বিস্তার করেছিলেন দীক্ষিত? তা জানার পর সত্যিই চমকে উঠতে হয়।

৭৫ বছরের ‘বাবা’র মূল টার্গেট ছিল ব্রাহ্ম কুমারীরা। ‘মাতা’ ও ‘ভাই’দের নিয়ে এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল দীক্ষিত। যাঁরা উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থান ঘুরে নিম্ন মধ্যবিত্ত এলাকায় সৎসঙ্গ অথবা গীতা পাঠের আয়োজন করতেন। ভক্তদের মধ্যে তাঁরা প্রচার করতেন, বাহ্ম কুমারীদের প্রতিষ্ঠাতা লেখরাজ কৃপালানি-র আত্মা বিরাজ করছে দীক্ষিতের মধ্যে।

এরপর ভক্তদের নিয়ে ৭দিনের একটি ধ্যানসভার আয়োজন করা হত। যেখানে তাঁদের শোনানো হত দীক্ষিতের বাণী। ভক্তরা দীক্ষিতকে ভগবানের অংশ বলে ভাবতে শুরু করতেন। ভক্তদের নানাবিধ নিয়মবিধি মেনে চলতেও নির্দেশ দেওয়া হত। বলা হত, স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে যৌনতা থেকে বিরত থাকতে হবে, হাল্কা খাবার খেতে হবে, সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মানুষজন থেকে দূরে থাকতে হবে। এভাবে ভক্তদের মগজধোলাই সম্পূর্ণ হলে, তারপরই নিশানা হত তাঁদের কন্যাসন্তানরা। আধ্যাত্মিক পাঠ দেওয়ার নাম করে আশ্রমে ডেকে নেওয়া হত ভক্তদের কন্যাসন্তানদের।

সুকৌশলে আশ্রমের সম্পত্তি বাড়াতেন বীরেন্দ্র দীক্ষিত। ভক্তদের মধ্যে প্রচার করা হত তিনি ভগবান। ‘ভগবান’ রুষ্ট হলে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন ভয় দেখানো হত। এরপরই বলা হত, ভক্তরা যদি এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়, তাহলে অবশ্যই স্বার্থত্যাগ করে ‘ভগবান’কে কিছু ‘দান’ করতে হবে। এভাবেই ভক্তদের কাছ থেকে জমি, টাকা আদায় করে নিতেন দীক্ষিত। ‘ভগবান’ রুষ্ট হওয়ার ভয়ে ভক্তরাও লাখ লাখ টাকা, বিঘার পর বিঘা জমি ‘দান’ হিসেবে দীক্ষিতের নামে লিখে দিতেন।

কিশোরী থেকে যুবতীদের আশ্রমে আনার পর, প্রথমেই নিজের রাজ্যের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হত। পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হত। মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে হলে পরিবারের লোকজনদের আসতে হত আশ্রমেই। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর আশ্রমের বড় হলে নিজের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতেন পরিবারের লোকেরা। কিন্তু সাক্ষাতের সময় উপস্থিত থাকতেন আশ্রমের ‘মাতা’ ও ‘ভাই’য়েরা। অনেকসময় দেখাও হত না, ফিরে আসতে হত খালি হাতেই।

আশ্রমের একটু বয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের দেওয়া হত ‘সেবাদার’-এর দায়িত্ব। তাঁরাই ছিলেন আশ্রমের বাইরের নিরাপত্তা বেষ্টনী। আশ্রমের ‘বহেন’ ও ‘মাতা’দের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগের কোনো উপায়ও ছিল না। বন্ধ দরজার আড়ালেই থাকতেন বহেন ও মাতারা। কেমন ছিল এই বহেনদের জীবন? রাত ২টা-আড়াইটার সময় ঘুম থেকে তোলা হত বহেনদের। তারপর তাদের শোনানো হত বীরেন্দ্র দেব দীক্ষিতের ‘বাণী’। আশ্রমের টিভি সেটগুলিতে চলত এই বাণী।

এরপর দীক্ষিতের ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে বলা হত বহেনদের। শুরু হত ঘণ্টাখানেকের জন্য ধ্যান পর্ব। ভোর ৪টার মধ্যে গোসল সেরে তৈরি হতে হত বহেনদের। তারপর সারাদিন ধরে তাঁদের ‘মুরালি’ শুনতে হত। ব্রাহ্ম কুমারীদের বিশ্বাস, ভগবান শিব মুখে মুখে আধ্যাত্মিকতার পাঠ দিয়েছিলেন লেখরাজ কৃপালানিকে। মৌখিক সেই পাঠই ‘মুরালি’ নামে পরিচিত। বীরেন্দ্র দেব দীক্ষিত নিজের ইচ্ছাকেই এই ‘মুরালি’-র আড়ালে পেশ করত।

বহেনদের ভয় দেখানো হত আশ্রম ছেড়ে গেলে বাবা, মায়েদের ক্ষতি হবে। তাঁদের ওপর অভিশাপের খাঁড়া নেমে আসবে। এরপর বীরেন্দ্র দীক্ষিত যদি সেদিন সেই আশ্রমে আসতেন, তখন বহেনদের মধ্যে ৮-১০ জনকে বেছে নেওয়া হত ‘গুপ্ত প্রসাদ’-এর জন্য। আশ্রমের এক সেবিকা জানিয়েছেন, এই ‘গুপ্ত প্রসাদ’ আসলে যৌনতারই কোড! 

যাঁদের এই ‘গুপ্ত প্রসাদ’-এর জন্য নির্বাচন করা হত, তাঁদেরকে বলা হত রানি। আর বীরেন্দ্র ছিল তাঁদের ‘কৃষ্ণ’! ভগবান কৃষ্ণের মত তাঁরও ১৬ হাজার রানি রাখার অধিকার রয়েছে, এমনটাই প্রচার করতেন মাতারা। এমনকি আশ্রমে বহেন ও মাতাদের ঋতুচক্রের দিনক্ষণ নিয়ম করে নথিভুক্ত করে রাখা হত বলেও জানিয়েছেন ওই সেবিকা।



মন্তব্য