kalerkantho


মুসলিম ঐতিহ্য মুছে ফেলতেই কি আহমেদাবাদের নাম পরিবর্তন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১২:০০



মুসলিম ঐতিহ্য মুছে ফেলতেই কি আহমেদাবাদের নাম পরিবর্তন?

ছবি অনলাইন

ভারতের গুজরাট রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদের সঠিক উচ্চারণটা কী? এটি নিয়ে বিভ্রান্তি যেন কাটছেই না। এই শহরের দুটো উচ্চারণই চালু আছে - অ্যামদাবাদ ও আহমেদাবাদ - এবং পর্যবেক্ষকরা বলে থাকেন মূলত যারা শহরের মুসলিম শাসনে ঐতিহ্যটা মানতে চান না, তারাই আহমেদাবাদ থেকে 'হ'-টা বাদ দিয়ে দেন।

সাতশো বছর আগে আহমেদ শাহ্-র প্রতিষ্ঠিত এই শহর কীভাবে ধীরে ধীরে এই 'হ' বর্জন করছে! গুজরাটের প্রধানতম শহরে পা রাখার পর যে কোনও বহিরাগতর মনে হওয়াটা স্বাভাবিক - এই শহরের আসল নামটা কী?

অভিজাত এলিসব্রিজ এলাকায় হয়তো লোককে বলতে শুনবেন অ্যামদাবাদ বা আমদাভাদ - কিন্তু সবরমতী নদী পেরিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত তিন দরওয়াজা এলাকায় গেলেই পরিষ্কার শুনতে পাবেন আহমেদাবাদ।

এয়ারপোর্টে লেখা 'আহমেদাবাদ', কিন্তু বাইরে বিলবোর্ডে 'আমদাভাদ' সিটি সাইটসিয়িংয়ের বিলবোর্ড।

রহস্যটা পরিষ্কার হল গুজরাট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান, অধ্যাপক মুকেশ খটিকের কথায় - যিনি পরিষ্কার বললেন রাজ্যে যারা একটু মুসলিম-বিরোধী মানসিকতার, তারা কিছুতেই শহরের নামে হ-টা উচ্চারণ করতে চান না।

তার সহকর্মী অধ্যাপক হিতেশ প্যাটেলও বলছিলেন, গুজরাটের ভেতরে এখন হ-বর্জিত অ্যামদাবাদ-টাই যেন স্বাভাবিক উচ্চারণ হয়ে উঠেছে।

প্রফেসর প্যাটেলের কথায়, "স্থানীয়রা এখন সবাই আমদাবাদ বা অ্যামদাভাদ-ই বলেন। তবে যারা বাইরে থেকে আসেন, তাদের অনেকে এখনও আহমেদাবাদও বলেন।"

"এই শহরের নামে এই এইচ ফ্যাক্টর-টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই এইচটা আপনি বলছেন কি না তা থেকে বোঝা যায় আপনি এই শহরের মুসলিম ঐতিহ্য বা সংস্কৃতিকে কোন চোখে দেখেন। এককালে তো এই আহমেদ শব্দটা পুরো বাদ দিয়ে শহরের নাম কর্ণাবতী রাখারও দাবি উঠেছিল, যদিও এখন আর সেটা তত বড় কোনও ইস্যু নয়", জানাচ্ছেন তিনি।

শহরে শাসক দল বিজেপির সদর দফতরে কথা হয়েছিল দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও পুরো আহমেদাবাদ জোনের সভাপতি কমলেশ প্যাটেলের সাথে।

মি প্যাটেল নিজের পরিচয় দেন বিজেপি-র 'কর্ণাবতী অঞ্চল প্রমুখ' হিসেবে, আহমেদাবাদ বা অ্যামদাবাদ কোনও শব্দই পারলে তিনি উচ্চারণ করেন না।

সুলতান আহমেদ শাহ্-রও আগে চালুক্য বংশের হিন্দু রাজা কর্ণদেও সবরমতীর এই নগরীর পত্তন করেছিলেন - তাই আহমেদাবাদের বদলে শহরের নাম কর্ণাবতী হওয়া উচিত, এ কথাও বিশ্বাস করেন অনেকেই।

বিবিসি গুজরাটি বিভাগের ঋষি ব্যানার্জিও বলছিলেন, গুজরাটিরা এখন বেশির ভাগই শহরের নাম আমদাবাদ বলে থাকেন।

তার কথায়, "গুজরাটিরা এই এইচ-টাকে তত গুরুত্ব দেন না, তারা সবাই অ্যামদাবাদই বলেন। আর এই শহরের পুরনো নাম হল কর্ণাবতী, কিন্তু মুসলিম শাসক আহমেদ শাহ রাজা কর্ণদেওকে যুদ্ধে হারিয়ে এই শহর বসিয়েছিলেন - তাই তাকে যারা সম্মান দেখাতে চান তারা এখনও আহমেদাবাদ বলে থাকেন।"

এমন কী রাজ্যের জনসংখ্যার যে প্রায় দশ শতাংশ মুসলিম - তারাও আজকাল শহরের এই দুরকম নামই উচ্চারণ করছেন।

"বহু মুসলিম পরিবার শত শত বছর ধরে গুজরাটে আছেন - তারাও কিন্তু দেখেছি এখন গুজরাটিতে আমদাভাদ আর হিন্দিতে আহমেদাবাদ, এভাবে বলে থাকেন", বলছিলেন ঋষি ব্যানার্জি।

তিনি আবার আমাকে বলছিলেন, আহমেদাবাদ থেকে এই 'হ' বাদ যাওয়াটা ঠিক সাম্প্রদায়িক কারণে নয়, বরং এটা এক ধরনের গুজরাটিকরণ।

প্রতীক সিনহার কথার, "গুজরাটিতে এখন আমদাবাদটাই চলে। ওরা বলেন, 'হু আমদাবাদ নো ছু' - মানে আমি আমদাবাদ থেকে আসছি। কিন্তু ইংরেজিতে আবার ওরাই আহমেদাবাদ বলেন - যে নামটা হয়তো আহমেদ শাহ্-র থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা হয়। আমদাবাদ হল সেই আহমেদাবাদেরই গুজরাটিফিকেশন!"

তবে 'আহমেদ' নামেই যে গুজরাটের অ্যালার্জি কতটা, তা বোঝা যায় যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, কংগ্রেস নেতা আহমেদ প্যাটেলকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বানানোর জন্য পাকিস্তান চক্রান্ত করছে।

কংগ্রেস কাউকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলেই ধরেনি, তার পরও যেভাবে আহমেদ প্যাটেলের নাম টেনে আনা হয়েছে তাতে বোঝা শক্ত নয় কেন গুজরাটিরা আজকাল 'আমদাভাদ' বা 'অ্যামদাবাদ' বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা


মন্তব্য