kalerkantho


বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

যেভাবে পাকিস্তানকে আবাসভূমি করেছিল আহমদিয়া সম্প্রদায়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ আগস্ট, ২০১৭ ১০:৩৪



যেভাবে পাকিস্তানকে আবাসভূমি করেছিল আহমদিয়া সম্প্রদায়

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর যারা এক দেশে ছেড়ে অন্য দেশ বেছে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছে ভারতের আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনও। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন কাদিয়ানের বাসিন্দাদের অনেকেই সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান।

লাহোরের উপকণ্ঠে পাহাড়ঘেরা একটি শহর রবওয়া, যার বেশিরভাগ বাসিন্দাই আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। অনেক পাকিস্তানি তাদেরকে নাস্তিক ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করে। গত এক দশকেই উগ্রপন্থীদের হামলায় এই সম্প্রদায়ের অন্তত ১০০ সদস্য মারা গেছে। কিন্তু ভারতভাগের সময় আহমদিয়ারা তাদের দেশ হিসেবে নিজেরাই পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিলেন।

নিজের সম্প্রদায়ের আরো অনেকের সঙ্গে ছোটবেলায় ভারত-পাকিস্তান সীমান্তলাগোয়া শহর কাদিয়ান থেকে পাকিস্তানে চলে যান সাবেক পাইলট মাহমুদ খান। তিনি বলেন, 'সবাই যখন পাকিস্তানে চলে আসে, তখন তাদের সবকিছুই সেখানে, ভারতে রেখে আসতে বাধ্য হয়। কখনও তারা সে বিষয়টি তাদের মন থেকে মুছতে পারেনি। '

মাহমুদ খান বলছিলেন, কীভাবে আহমদিয়াবিরোধী দাঙ্গায় তাদের নতুন পাকিস্তানের স্বপ্নভঙ্গ হয়। তিনি বলেন, 'আমার বাবা, আমার চাচারা খুবই উত্তেজিত ছিল যে, আমরা নিজেদের জন্য একটি আলাদা দেশ পেতে যাচ্ছি, যেখানে আমরা আমাদের ধর্মের চর্চা করতে পারব।

প্রথমদিকে অবশ্য তাই ছিল। কিন্তু ১৯৫৩ সালে লাহোরে যখন দাঙ্গা শুরু হলো, তখন তারা ভীত হয়ে পড়ল। আসলেই সেটা ছিল এ রকম ঘটনার সূচনা মাত্র। '

ভারত ছাড়ার পর রবওয়া আহমদিয়াদের জন্য একটি নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা ছিল। হয়তো পুরো পাকিস্তানে এটাই এখনও তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, কিন্তু সহিংসতার হুমকি সব সময়ই তাদের মাথার ওপর থেকেছে।

শহরের প্রবেশমুখে কংক্রিটের দেয়াল আর কবরস্থানে অসংখ্য আহমদিয়ার কবর রয়েছে, যাদের মৃত্যু হয়েছে সন্ত্রাসী হামলায়। তবে এই সম্প্রদায় শুধুমাত্র উগ্রপন্থীদের হামলারই শিকার হয়েছে তা নয়, তারা লক্ষ্য হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রেরও। ১৯৭৪ সালে তাদের অমুসলিম বলে আইনি ঘোষণা দেওয়া হয়। এখনও তারা প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থনা করতে পারে না।

মাহমুদ খান বলেন, 'এখন আমার মনে হয়, আমরা যদি তখন ভারতে থেকে যেতাম, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য বেশি ভালো হতো। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের আইনের পর আমার পরিবারের লোকজন কতটা কষ্ট পেয়েছে- সেটা বোঝাতে পারব না। '

তবে এই সম্প্রদায়ের বয়োজ্যেষ্ঠরা ইতিবাচকভাবে ভাবতে চান। তারা বলছেন, সবার আগ্রহেই এখানেও জাঁকজমকভাবে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাকালীন অন্যতম নেতা ও প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান ছিলেন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। স্বাধীন দেশ হিসেবে দেশটির লক্ষ্য তুলে ধরার বিবৃতি লিখতেও তিনি সহায়তা করেন।

লেখক ওসমান আহমদ বলেন, 'পাকিস্তানে এখন অনেকেই জাফরুল্লাহ খানের নামও জানে না। ' তিনি বলেন, 'পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আহমদিয়া নেতাদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা এখানে খুবই বাস্তব এবং শক্তিশালী প্রচেষ্টা। জাফরুল্লাহ খানকে নিজের রাজনৈতিক পুত্র বলে আখ্যায়িত করেছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এতেই বোঝা যায়, আন্দোলনে তার ভূমিকা কত বেশি ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আহমদিয়া সম্পদায়ের এই মানুষগুলোকে ভুলে যাওয়া হয়েছে এবং এ রকম ব্যাপার এখানে অসহিঞ্চুতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। '

তাদের অভিযোগ, এই সম্প্রদায়ের অন্য গুণী ব্যক্তিরা, যেমন পাকিস্তানের প্রথম নোবেল বিজয়ী আবদুস সালামও দেশে তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। পাকিস্তানের স্বাধীনতার বার্ষিকীতে রবওয়াতেও অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকের মধ্যে স্বীকৃতির জন্য ব্যাকুল আবেদনও রয়েছে।


মন্তব্য