kalerkantho


আমেরিকার নার্সিং হোমে মৃত্যুপথযাত্রীদের ধর্ষিত হওয়ার করুণ কাহিনী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০২:২৩



আমেরিকার নার্সিং হোমে মৃত্যুপথযাত্রীদের ধর্ষিত হওয়ার করুণ কাহিনী

আমেরিকার প্রায় সহস্রাধিক নার্সিং হোমে অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী ও প্রতিবন্ধী বয়স্ক নারীরা সেবাসহকারীদের হাতে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছেন। সম্প্রতি সিএনএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন করুণ কাহিনী ওঠে এসেছে।

এসব নারীদের অনেকেই কথা বলতে পারে না। তারা তাদের শয্যা ত্যাগ ও প্রাকৃতিক কাজকর্মের জন্য ব্যক্তি ও হুইলচেয়ারের উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন কারণেই তাদের স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। আরোগ্য লাভের জন্য তারা নার্সিং হোমে আসেন। কিন্তু এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নাসিং হোমগুলোতে তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

লুইস গোমেজ নিখুঁত নার্সিং সহকারী হিসেবে পরিচিত। যিনি তার কাজকে পছন্দ করেন এবং বহু লোককে সেবা দিয়েছেন। তার যত্নে হোমের অধিবাসীরা তাদের বাড়ি চলে গিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যক্তিটিই এখন অন্য এক ইমেজে আবির্ভূত হয়েছেন।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করা গোমেজের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযোগ ওঠেছে। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির বিভিন্ন অভিযোগের ইতিহাস সত্ত্বেও তাকে একের পর এক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।  

যৌন নির্যাতনের শিকার এক ভিকটিমের কন্যা বলেন, আপনার মা মারা গেছেন- এমন ফোনকলের জন্য আপনি হয়ত প্রস্তুত কিন্তু ‘আপনার মা ধর্ষিত হয়েছেন- এমনটি শুনার জন্য নিশ্চয় আপনি প্রস্তুত নন।

দেশটিতে প্রায় ১ হাজার নাসিং হোমের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের এমন অকল্পনীয় ঘটনা ঘটছে। সেখানে অরক্ষিত সিনিয়াররাই ধর্ষিত ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং সেটি হচ্ছে তাদের দেখাশুনা করার জন্য বেতনভূক্ত কর্মচারীদের হাতেই।

এটা জানা অসম্ভব ঠিক কত ভিকটিম এসব যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে, দেশটির রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় তথ্য এবং ভিকটিম পরিবারগুলোর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রকদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে ইস্যুটি এতটা ব্যাপক যা যেকোনো ব্যক্তিরই কল্পনাকেও হার মানাবে।

এমনকি অনেক ক্ষেত্রে, এসব নার্সিং হোমের কর্তাব্যক্তিরা এবং সরকারি কর্মকর্তা এসব কিছু জেনেও না জানার ভান করছেন কিংবা তা বন্ধে কোনো কিছুই করছেন না।

এর পিছনে কখনো নির্ভেজাল এবং এমনকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা কাজ করছে। এছাড়াও, যারা মনে বা স্বরণ করতে পারেন না ঠিক কি ধরনের ঘটনা তাদের ওপর ঘটেছে কিংবা তাদের অপরাধীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন; সেসব ক্ষেত্রে নার্সিং হোমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা এসব নারীদের রক্ষার প্রচেষ্টায় অক্ষম হচ্ছেন।  

সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের পরিবারগুলো প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই ব্যর্থ হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নার্সিং হোমের তদন্তে অযথা সময়ক্ষেপন করা হয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।

এসব কারণে পুলিশ গোড়াতেই এসব ঘটনাকে অসম্ভাব্য হিসাবে মনে করে থাকে। ভিকটিমদের স্মৃতিশক্তি লোপ কিংবা কল্পনাপ্রসূত অভিযোগের দোহাই দিয়ে তা খারিজ করে দেয়।

পদ্ধতিগত এই ব্যর্থতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, এমনকি অপরাধীরাও তাদের অপরাধের অভিযোগ থেকে সহজেই মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

৮৩ বছর বয়সী, কথা বলতে অক্ষম। রুখে দাঁড়াতে অক্ষম। তিনি আরো বেশি অরক্ষিত ছিলেন যে, তিনি কিশোরী বয়সে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে পালিয়ে ছিলেন। বস্তুত, যখন সে ধর্ষিত হয়েছিল তখন একজন শিশু হিসেবে তিনি অরক্ষিত ছিলেন। মর্যাদা যা তিনি তার সারা জীবনে পেয়ে এসেছেন। কিন্তু এই বয়সে ধর্ষণের শিকার ইতোমধ্যে তাকে কঠিন 'আলঝাইমার্স' রোগে ভোগাচ্ছে। মায়া ফিশার, তার মায়ের ধর্ষিত হওয়ার কাহিনী ২০১৫ সালে আদালতে এভাবেই বর্ণনা করেন।

একটি নার্সিং হোমের সহকারী তার মাকে ধর্ষণ করায় আদালত ওই ধর্ষককে দোষী সাব্যস্ত করে। অশ্রুজল নয়নে ফিসার তার মায়ের গল্প বিস্তারিত বর্ণনা করেন।

তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন কিভাবে একজন কিশোরী মেয়ে হিসেবে তার মা ধর্ষণ থেকে বাঁচতে তার পরিবারের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া থেকে পালিয়েছেন ও জাপানি সৈন্যদের দ্বারা অল্পবয়সী মেয়েরা কিভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। পরে নাসিং হোমে তাকে দেখাশোনা করার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির দ্বারা কিভাবে ধর্ষণের শিকার হন তারও বর্ণনা দেন।  

একজন নারী নার্স জর্জ পিনগবাগ নামে তারই এক পুরুষ নার্সিং সহকারী ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভোর সাড়ে চারটায় মিনিয়াপলিসের 'ওয়াকার মেথডিস্ট' স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৮৩ বছর বয়সী সনিয়া ফিশারের রুমে দেখতে পান। লোকটির কোমর থেকে পা পর্যন্ত কোন পোশাক ছিল না। তার মায়ের এডাল্ট ডায়াপার তার বিছানার উপর খোলা অবস্থায় ছিল। এ ঘটনা ওই সহকর্মী দেখে ফেলা্য় ৭৬ বছর বয়সী পিনগবাগ থতমত করতে থাকেন। তিনি জানান যে, সে জানত সেখানে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে।

মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অসহায় মানুষদের সঙ্গে তৃতীয় মাত্রার অপরাধমূলক যৌন আচরণের বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় জর্জ পিনগবাগকে ইতোমধ্যে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

রায় দেয়ার সময় এক আবেগপূর্ণ বিবৃতিতে বিচারক পিনগবাগকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি (পিনগবাগ) ভিকটিম ও তার পরিবারের জীবনকে ধ্বংস করার চেয়েও খারাপ কিছু করেছেন। অসুস্থ ও বয়স্ক এক নারীর সঙ্গে এ ধরণের ঘটনার মাধ্যমে একজন শুশ্রুষাকারী হিসেবে তিনি জনসাধারণের আস্থার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

বিচারক এলিজাবেথ কাটার শাস্তির শুনানিতে বলেন, 'তুমি কর্তৃত্বের সীমা ভঙ্গ করেছে। তুমি যা করেছ তার প্রভাব সুদূর প্রসারী। এটি নাসিং হোমে কর্মরত সকল শুশ্রুষাকারীকে আক্রান্ত করেছে। যারা ওই সেবার অধীনে আছে তাদেরকেও সমান আক্রান্ত করেছে। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের প্রিয়জনদেরকেও কষ্ট দিয়েছে। '

পিনগবাগ শুনানিতে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং কারাগারে বাইবেল নেয়ার পরিকল্পনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার আইনজীবী তার এই ইচ্ছাপূরণের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন।

প্রসিকিউটর জানান, পিনগবাগের এমন কর্ম এটাই প্রথমবার নয়। তার যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে ওই নাসিং হোমে এর আগেও একই কর্মের জন্য 'ওয়াকার মেথডিস্ট' কর্মকর্তারা তাকে তিনবার বরখাস্ত করেন। এরমধ্যে অন্তত দুটি ক্ষেত্রে তিনি প্রধান সন্দেহভাজন ছিলেন।

২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে। একাধিক রোগে আক্রান্ত ৬৫ বছর বয়সী এক নারীর সঙ্গে যৌনমিলনের অভিযোগ ওঠে। অন্যটি, ৮৩ বছর বয়সী অন্ধ ও বধির নারীকে যৌন নির্যাতন। ফিশারের মা জানান, তিনি একাধিক বার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং প্রতিবারই মধ্যরাতে।  

ফিশারের মা লাঞ্ছিত হওয়ার মাত্র সাত মাস আগে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। অন্ধ হওয়ার কারণে যদিও ওই নারী তার নির্যাতনকারীকে চিহ্নিত করতে পারেননি। পরে ওই নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে সেবা দেয়ার জন্য রাতে দায়িত্বপালনরত পিনগবাগসহ অন্যান্য পুরুষ কর্মীদের সাসপেন্ড করা হয় এবং তদন্তে পিনগবাগের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে।  

তবে, এসব অভিযোগের কোনটিই হোম কিংবা রাষ্ট্র দ্বারা প্রমাণ করা যায়নি। বছরের পর বছর ধরে 'ওয়াকার মেথডিস্টে' পিনগবাগ রাতের শিপ্টে কাজ করেছেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের এক ভোরে তার এই অপকর্ম অন্য এক নারী সহকর্মী দেখে ফেলায় তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়ছে।  

নার্সিং হোমের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের আরও কিছু অভিযোগ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযোগ ওঠেছে সেখানে সেবাদানকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

সিএনএনের বিশ্লেষনে এমন আরো কয়েকটি ঘটনা কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা সত্যিই পীড়াদায়ক।


মন্তব্য