kalerkantho


রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ বর্বরতার চিত্র জাতিসংঘের রিপোর্টে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১১:০৫



রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ বর্বরতার চিত্র জাতিসংঘের রিপোর্টে

জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের রিপোর্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে উঠে এসেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার অভিযোগ।

শুক্রবার জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর রিপোর্টটি প্রকাশ করে। ৪৩ পৃষ্ঠার রিপোর্টে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞ, গণধর্ষণ, কাছে থেকে গুলি করে হত্যা, ছুরি দিয়ে জবাই, পুড়িয়ে ও পিটিয়ে হত্যা, শিশুদের অমানবিকভাবে হত্যা, গুম, ধর্ষণ ছাড়াও যৌন সহিসংতা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, শারীরিক নির্যাতন, নির্মমভাবে পেটানো ও হত্যার হুমকি, মানসিক নির্যাতন, আটকে রেখে নির্যাতন প্রভৃতির বর্ণনা রয়েছে।

গত বছরের ৯ অক্টোবর সীমান্ত চৌকিতে এক সন্ত্রাসী হামলায় মিয়ানমারের নয়জন 'বর্ডার গার্ড পুলিশ' (বিজিপি) নিহত হয়। তার জের ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। এতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রায় ৬৬ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন প্রকাশের লক্ষ্যে একটি 'ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন' পাঠায়। এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ডার গাই জার গ্রামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, 'আমাদের গ্রামে দুটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়।

হেলিকপ্টারগুলো ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে আমাদের গ্রামের ওপর চক্কর দেয়। হেলিকপ্টার থেকে অনবরত গ্রামবাসীর ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এসব হেলিকপ্টার প্রায় ছাদের কাছ দিয়ে উড়তে থাকে। হেলিকপ্টার হামলায় আমার ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির সাতজন সদস্য নিহত হন। '

জাতিসংঘ রিপোর্টে বলা হয়, রাখাইনের ইয়াই খাত চুং গোয়া সন গ্রামের ১৪ বছর বয়সী এক মেয়েকে আগেই সৈন্যরা ধর্ষণ করেছে। মেয়েটি দেখেছে তার মাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছুরি দিয়ে আঘাত করে তার দুই বোনকে হত্যা করা হয়েছে।

মেয়েটি বলেছে, 'সেনাবাহিনী এসেছে দেখে আমার ৮ ও ১০ বছর বয়সী দুই বোন দৌড়াচ্ছিল। তাদের গুলি করা হয়নি। আমার দুই বোনকে ছুরি দিয়ে জবাই করা হয়েছে। '

শুধু শিশু নয়, ১৮ বছর বয়সী এক মেয়ে বলেছেন, 'আমার মায়ের বয়স ৬০ বছর। সেনাবাহিনী আসার পর আমার মা দৌড়াতে পারেননি। ফলে সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করে। ' একই গ্রামের এক পুরুষ বলেছেন, তার বাবাকে সেনাবাহিনী হত্যা করে। গ্রামটিতে সেনাবাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা অনেক বেশি ছিল। গ্রামের এক প্রত্যেক্ষদর্শী বলেছেন, 'আর্মি আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়ে আমার বৃদ্ধা শাশুড়ি এবং শ্যালিকাকে পুড়িয়ে মারে। ' এ গ্রামের অপর একটি ঘটনা হলো- বয়স্কদের বাড়ি থেকে বের করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। তারপর আর্মি তাদের চারপাশে শুকনো ঘাস ও কাঠ রেখে তাতে আগুন দেয়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের রিপোর্টে আরও বলা হয়, ১১ বছর বয়সী একটি মেয়ে বলেছে, 'আর্মি আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমাদের সন্দেহ করে। তারা আমার মাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। চারজন সৈন্য তাকে ধর্ষণ করে। আমার মাকে ধর্ষণ করার আগে আমার বাবাকে তারা জবাই করে। আমার বাবা গ্রামে নামাজ পড়াতেন। তার কিছু সময় পর তারা আমার মাকে বাড়ির ভেতরে রেখে বাড়িতে আগুন দেয়। এর সবকিছুই ঘটেছে আমার চোখের সামনে। '

লং ডন গ্রামের এক বাসিন্দা জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রতিনিধিদলকে বলেছেন, 'আমি এবং আরও ৮৫ জনকে সেনাবাহিনী ঘিরে আমাদের হাত পেছনের বেঁধে ফেলে। আমাদের একটি খোলা জায়গায় নিয়ে আমাদের নিচের দিকে মাথা রেখে বসতে বলা হয়। তারা রাইফেলের বাঁট আর কাঠের লাঠি দিয়ে আমাদের মারতে থাকে। তারা আমাদের লাথি মারে। তাদের নির্যাতনে আমাদের শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পাঁচজন আর্মির উপর্যুপরি শারীরিক নির্যাতনে একজন বয়স্ক লোক আমাদের চোখের সামনেই মারা যান। '

ইয়া তুই খিনের ৪৬ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বলেছেন, 'আমি ও আমার পরিবার এবং অন্য রোহিঙ্গারা এক রাতে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য একটি মাছ ধরার নৌকায় উঠি। আমরা নদীর মাঝখানে ছিলাম। ওই সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। বুলেট এসে আমাদের নৌকার ওপর আঘাত হানে। নৌকা ডুবে যায় এবং আমরা সবাই নদীতে পড়ে যাই। দুই ও চার বছর বয়সী আমার তিন চাচাতো ভাইবোন নদীতে ডুবে যায়। দ্বিতীয় নৌকার বেশ কয়েকটি শিশু ডুবে যায়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী এবং জেলেরা আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। '

একই গ্রামের একজন পুরুষ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পালানোর বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, 'তারা মহিলা, কম বয়সী মেয়ে এবং পুরুষদের আমাদের গ্রামের একটি মাঠে নিয়ে যায়। তারা বলতে গেলে গোটা গ্রামের মানুষকেই ওই মাঠে নিয়ে যায়। তাদের মধ্য থেকে ১৭ জনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ছয়জন সুন্দরী নারী ও কম বয়সী নারীও ছিলেন। '

দার গি জার গ্রামের ২২ বছর বয়সী এক নারী বলেছেন, 'আমার স্বামী কোথায় আছেন সে কথা আমার কাছে একজন জানতে চাইল। আমি বললাম, আমি জানি না। তখন তারা আমার বাড়ি জ্বালিয়ে দিল। তারপর বলল, সত্য কথা বল তাহলে তোকে ছেড়ে দেব। তারপর তারা আমাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। '

ইয়া খাত চংগা সন গ্রামের ২৫ বছর বয়সী এক নারী বলেন, 'আমাকে ধর্ষণ করার সময় তারা বলে, আমি নাকি আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশ) এর জন্য রান্না করেছি। '


মন্তব্য