kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুই বছরে ইউরোপজুড়ে ১০ হাজার অভিবাসী শিশু নিখোঁজ!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ১৫:৪৬



দুই বছরে ইউরোপজুড়ে ১০ হাজার অভিবাসী শিশু নিখোঁজ!

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুলিশ বহিনীর গোয়েন্দা ইউনিট এর হিসেব মতে, গত দুই বছরে প্রায় ১০ হাজার অভিবাসী শিশু ইউরোপজুড়ে নিখোঁজ হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের তদন্ত প্রোগ্রাম প্রশ্ন করেছে কেন এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হয়েছে? তাদের ভাগ্যেই বা কী ঘটেছে?

মিসিং চিলড্রেন ইউরোপ এর মহাসচিব ডেলফিন মোরালিস এর মতে, "নানা কারণে শিশুরা একাকী ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে।

এদের অনেককেই তাদের বাবা-মায়েরা এই আশায় পাঠিয়েছেন যে এতে হয়ত তারা একটি উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। তবে অনেক শিশুকে পাচারকারীরা তাদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। অনেকে আবার তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েছে। "

মিসিং চিলড্রেন ইউরোপের মতে, ইউরোপে অভিবাসী হওয়া শিশুদের ৯১ শতাংশই ছেলে শিশু। যাদের ৫১ শতাংশই আবার এসেছে আফগানিস্তান থেকে। তবে এখন প্রচুর সংখ্যক মেয়ে শিশুও একাকী ইউরোপে অভিবাসী হচ্ছে। আর নিখোঁজ হওয়া শিশুদের বয়সও কমছে। গত বছর প্রথমবারের মতো মাত্র চার বছরেরও কম বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু নিখোঁজ শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটেছে? তা কেউই জানেন না। কারণ সিরিয়া, আফগানিস্তান বা ইরিত্রিয়া থেকে আগত একটি শিশু যখন গ্রিস বা ইটালিতে নিখোঁজ হয় তখন তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করা হয় না। কিছু সীমান্ত সংস্থা শুধু একটি নিখোঁজ রিপোর্ট নথিবদ্ধ করে রাখে।

এখন অবশ্য আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে যে, চোরাচালানকারীরা যেসব শিশুকে ইউরোপে নিয়ে আসেন তাদের বেশির ভাগকেই মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়। পাচারকৃত শিশুদেরকে এরপর পতিতাবৃত্তি বা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়।

গুলওয়ালি পাসারলে ১২ বছর বয়সে আফগানিস্তান ছেড়ে ব্রিটেনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। যাত্রার পরপরই চোরাচালানকারীরা তাকে তার ভাইয়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এরপর প্রায় এক বছর ধরে দুর্গম যাত্রাশেষে তিনি ব্রিটেনে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে, লরির পেছনে লুকিয়ে থেকে, চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে এবং তুরস্কের প্রাপ্তবয়স্কদের জেলে দুই সপ্তাহ বন্দি থাকার পর ভূমধ্যসাগরের তীরে এসে পৌঁছান। এরপর মাত্র ২০ জনের একটি নৌকায় ১২০ জন লোক চড়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু মাঝখানে গিয়ে নৌকাটি ভেঙে পড়ে। ভাগ্যক্রমে উপকূলরক্ষীদের সহযোগিতায় তারা উদ্ধার হন। এরপর গুলওয়ালিকে প্রথমে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশের হাত থেকে তিনি সেনা সদস্যদের হাতে পড়েন। সেখানে তার হাত পায়ের আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। এরপর তাকে চরমতম দুঃসংবাদটি দেওয়া হয়। তাকে বলা হয় যে, তাকে হয় একমাসের মধ্যে চলে যেতে হবে আর নয়ত তাকে চালান করে দেওয়া হবে। ওদিকে তিনি ইতিমধ্যেই জানতে পারেন যে, তার ভাই ব্রিটেনে পৌঁছে গেছে। ফলে গুলওয়ালি গ্রিসের শরণার্থীশিবির থেকে পালিয়ে যান এবং অদৃশ্য হয়ে যান।

আরও অনেকের সঙ্গে গ্রিস থেকে আন্তমহাদেশীয় রেলপথ ধরে তিনি ফ্রান্সের ব্রিটেন সীমান্তে এসে পৌঁছান। ধরা পড়ার পর আঙুলের ছাপ দেখে যেন তাদেরকে শনাক্ত করা সম্ভব না হয় সে জন্য তাদের অনেকে নিজেদের আঙুলের ছাপ আগুনে পুড়িয়ে মুছে ফেলেন বা আঙুলগুলি পুরোপুরি কেটে ফেলেন।

ফ্রান্সের ক্যালে থেকে কলাবাহী একটি লরিতে চড়ে তিনি ব্রিটেনে প্রবেশ করেন। এর পাঁচ বছর পর গুলওয়ালি উদ্বাস্তু স্ট্যাটাস পান। এরপর তিনি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। গত বছর তিনি তার ওই দুর্ধর্ষ ব্রিটেন যাত্রাকে উপজীব্য করে 'দ্য লাইটলেস স্কাই' নামের একটি বই লেখেন।

গুলওয়ালির সঙ্গে আরো অনেকেই ব্রিটেনে অভিবাসী হয়েছিল। কিন্তু কেউই তার সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি। তাদের বেশির ভাগই ইউরোপের জটিল আশ্রয়দান পদ্ধতি এড়িয়ে গিয়ে বরং অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকেই বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন।

উল্লেখ্য, গত বছর প্রায় ৯০ হাজার নিঃসঙ্গ শিশু ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সমস্যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি ইউরোপের জনগণও বিষয়টির প্রতি চোখ বন্ধ করে রেখেছে এবং দেখেও না দেখার ভান করছে।

ব্রিটেন, জার্মানি এবং কানাডা বলেছে গ্রিস ও ইটালিতে আসা শরণার্থীদের থেকে তারা আরো বেশি বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে। কিন্তু একবছর পরও এসব গালভরা আশ্বাসের একটিও পূরণ করা হয়নি। এমনকি জনগণও বিষয়টি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছেনা। কিন্তু কেন?

আসলে পুরো ইউরোপজুড়েই চলছে নীরব অর্থনৈতিক মন্দা। যে কারণে দেশে দেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চলছে ব্যয় সংকোচন নীতির বাস্তবায়ন। ফলে সাধারণ জনগণও এখন আর শরণার্থীদের প্রতি নজর দেওয়ার ফুরসৎ পাচ্ছেন না। এ ছাড়া অভিবাসী এবং জঙ্গিদের মধ্যে যোগসূত্রের অভিযোগের কারণেও জনগণ তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
সূত্র : বিবিসি


মন্তব্য