kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুদ্ধের পথ থেকে পিছিয়ে গেলেন মোদি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১১:৩২



যুদ্ধের পথ থেকে পিছিয়ে গেলেন মোদি

দেশবাসীর রাগের আঁচ ভালোই টের পাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যুদ্ধ নয়, কূটনীতির অস্ত্রেই পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার ইঙ্গিত কোঝিকোড়ের দলীয় মঞ্চেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৮ জন সেনার মৃত্যুর পর দেশবাসীর একটি বড় অংশ চাইছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বদলা। কূটনীতির বার্তা যে দেশবাসীর রাগকে বিশেষ প্রশমিত করতে পারছে না, তা বুঝেই রবিবার লালবাহাদুর শাস্ত্রীর 'জয় জওয়ান, জয় কিষাণ' স্লোগানের আশ্রয় নিলেন মোদি। রবিবার 'মন কি বাত' এ তাঁর ৩৫ মিনিটের বক্তব্যে অবশ্যম্ভাবী ভাবে উঠে এলো উরির হামলা, পাকিস্তানকে পাল্টা আক্রমণ ও কাশ্মীর। জানিয়ে দিলেন, যুদ্ধের রাস্তা ধরতে না চাইলেও উরির হানাদারদের শাস্তি দিতে সেনার ওপরই ভরসা রাখছেন তিনি। এদিকে, মোদির শনিবারের বক্তব্যের সূত্র ধরেই রবিবার বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে ফের একবার পাকিস্তানকে বিঁধেছেন তাঁর ডান হাত অমিত শাহ। মোদির আক্রমণের জবাব শানাতে অবশ্য এ দিনই ময়দানে নেমে পড়েছে পাকিস্তান। ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে, উসকানি দিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন সব অভিযোগ আনছে।

'মন কি বাত' এর সূচনাতেই মোদি স্পষ্ট করে দেন, ''সেনাদের হত্যা শুধু তাঁদের পরিবারের ক্ষতি নয়, সমগ্র দেশের ক্ষতি। আর তাই, ঘটনার দিন যা বলেছিলাম, আজও তারই পুনরাবৃত্তি করব। দোষীরা নিশ্চয়ই শাস্তি পাবে। দেশে ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু কেউ যুদ্ধ চান না। শান্তি আর একতার মধ্যেই দেশের বিকাশ। '' ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রেখে তাঁর বার্তা, ''আমরা সাধারণ নাগরিকরা, রাজনীতিকরা অনেক বেশি কথা বলি, কারণ আমাদের কাছে কথা বলার অনেক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের সেনারা বেশি কথা বলেন না। সেনাবাহিনী বীরত্বেই জবাব দেয়। তাঁরাই আমাদের দেশের গর্ব। '' এ দিন একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের লেখা চিঠি পড়েছেন মোদি। উরির ঘটনার বিরুদ্ধে কিছু করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে সে। নিজের রাগকে ইতিবাচক পথে চালিত করে দেশের জন্যই সে নাকি তিন ঘণ্টা করে বেশি পড়াশোনা করছে। এই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, ''দেশবাসীর এই রাগের মূল্য অনেক। দেশ যে জেগে উঠছে, এটা তারই প্রতীক। এই রাগটা 'কিছু করতে হবে' সেই ভাবনার প্রতিফলন ... ১৯৬৫তে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়, দেশের মনোভাব এমনটাই ছিল।

দেশজুড়ে এমনই রাগ যে, প্রত্যেকেই জাতীয়তাবাদের জ্বরে আক্রান্ত, প্রত্যেকেই দেশের জন্য কিছু করতে চান। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি দেশবাসীর এই মনোভাবকে অভিনবভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন। সাধারণ মানুষকে দেশের জন্য কাজে উদ্বুদ্ধ করতে 'জয় জওয়ান, জয় কিষাণ' স্লোগান তুলেছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর স্বাধীনতার লড়াই এবং তার গঠনমূলক দিকেরও কথা তুলে ধরেছেন মোদি। তাঁর প্রতিটি কথায় স্পষ্ট, দেশবাসীর রাগকে সম্মান জানালেও মোটেই যুদ্ধের পথে যেতে চান না তিনি। তবে, পাকিস্তানকে চাপে ফেলতে সিন্ধু পানিচুক্তি পুনর্বিবেচনা করার কথা আগেই বলেছিল ভারত। সে বিষয়ে আলোচনার জন্য আজ একটি বৈঠকে বসতে পারেন মোদি। পাকিস্তানকে পানি দেওয়া বন্ধ করে দিলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা খতিয়ে দেখবেন তিনি। এ দিনও অবশ্য পাকিস্তানকে জবাব দিতে ছাড়েননি মোদি। উরির হামলার পর দিন থেকেই পাকিস্তান বিভিন্ন ভাবে কাশ্মীরের পরিস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে ভারতকে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে, রবিবারও যার ব্যতিক্রম হয়নি। মোদির স্পষ্ট বার্তা, ''কাশ্মীরের মানুষ দেশবিরোধী শক্তি বুঝতে আরম্ভ করেছেন। বাস্তবটা সামনে আসতেই তাঁরা সেই শক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁরা শান্তির পথে হাঁটা শুরু করেছেন। ''

আমি জানি, তাঁরা শান্তি চান। সন্তান যাতে স্কুলে যেতে পারে, তেমন পরিবেশ চান। কাশ্মীরে শান্তি বজায় রাখতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। কাশ্মীরবাসীর নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের। প্রশাসনই সে কাজ করবে। 'শান্তি, একতা ও সংহতিই উন্নয়নের সহায়ক হবে বলে ভরসা তাঁর। এদিকে, মোদি শনিবার যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু করেছেন অমিত শাহ। দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকের নান্দীমুখ এ দিন তিনি বেঁধে দিয়েছেন উরির প্রসঙ্গ তুলেই। বলেছেন, ''উরির জঙ্গিহানার মূলচক্রীদের বিরুদ্ধে দেশবাসীর রাগ বিজেপি বোঝে। বিজেপি ও কেন্দ্র সরকার শুরু থেকেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কড়া জবাবই দেওয়া হবে। গত ৮ মাসে ১১৭ জন জঙ্গি মারা পড়েছে। জঙ্গিদের অনুপ্রবেশের ছক ১৭বার সেনারা বানচাল করে দিয়েছে। সেই হতাশা থেকেই উরির হামলা। এটা একটা দীর্ঘ যুদ্ধ, যা আমাদের প্রতিবেশী আমাদের সঙ্গে চালিয়েই যাচ্ছে। উরি তো অন্তর্বর্তী গন্তব্য, চূড়ান্ত ফল নয়। চূড়ান্ত জয় আমাদেরই হবে। '' মোদি ও তাঁর সেনাপতির এই হুঙ্কারকে অবশ্য পাকিস্তান পাত্তা দিতে নারাজ। শনিবার দলীয় মঞ্চ থেকে পাক জনগণকে পাক সরকারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করেছিলেন মোদি।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে নিঃসঙ্গ করার সব প্রচেষ্টা যে ভারত চালাচ্ছে, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। এ দিন পাক পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্তা, 'ভারতীয় নেতৃত্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্য করে, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে সুপরিকল্পিত ভাবে মিথ্যে প্রচার চালাচ্ছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ দুঃখজনক। এটা স্পষ্ট, কাশ্মীরে নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর ভারতীয় সেনা যে আক্রমণ শানাচ্ছে, তা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতেই ভারতে ইচ্ছাকৃত ভাবে এটা করছে। ' এ প্রসঙ্গে চর সন্দেহে ধৃত ভারতের নৌসেনা অফিসার কুলভূষণ যাদবের উল্লেখও করেছে পাকিস্তান। তাদের দাবি, কূলভূষণের গ্রেপ্তারই প্রমাণ করে, কী ভাবে বালুচিস্তান-সহ পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশে ভারত সন্ত্রাসমূলক কাজকর্মে ইন্ধন জোগাচ্ছে। প্রতিবেশী যখন আক্রমণ শানাচ্ছে, তখন কিন্তু সুযোগ ছাড়ছেন না বিরোধীরাও। বিএসপি নেত্রী মায়াবতী যেমন বলেই দিয়েছেন, প্রতিবেশীকে জ্ঞান দেওয়ার আগে মোদির উচিত নিজের ঘর সামলানো।

উন্নয়নের লড়াইয়ে পাকিস্তানকে হারানোর কথা বলেছিলেন মোদি। মায়াবতীর কটাক্ষ , 'পাক প্রধানমন্ত্রীকে জনগণের উন্নয়নের পরামর্শ দেওয়া ভালো , কিন্ত্ত প্রধানমন্ত্রীর উচিত তাঁর নিজের সরকারের কাজকর্মও খতিয়ে দেখা। উরির হামলার পর দেশবাসী ক্রুদ্ধ। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ চান , যাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না -ঘটে। 'কংগ্রেসের অভিযোগ , শক্ত হাতে সন্ত্রাস দমন করার যে আশ্বাস মোদী ভোটের আগে দিয়েছিলেন , তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। দিগ্বিজয় সিংয়ের কটাক্ষ , 'মোদির সমর্থকরাও তাঁর এই ভুয়ো আশ্বাস শুনতে শুনতে হতাশ। ' বিজেপির পক্ষে অবশ্য এর জবাব আসেনি। সম্ভবত , প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাগ্যুদ্ধকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিরোধীদের আপাতত ছাড় দিচ্ছেন মোদি। এইসময়


মন্তব্য