kalerkantho


হুইলচেয়ারে চড়ে সিরিয়া থেকে জার্মানিতে আসা কিশোরী এখনো আশাবাদি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৭:৪৯



হুইলচেয়ারে চড়ে সিরিয়া থেকে জার্মানিতে আসা কিশোরী এখনো আশাবাদি

গত বছর সিরিয় কিশোরী নুজিন মুস্তাফা (১৭) জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস এর কবল থেকে বাঁচতে হুইল চেয়ারে চড়ে সিরিয়া থেকে ৩ হাজার ৫০০ মাইল পাড়ি দিয়ে জার্মানি আসেন। এখন তিনি কোলনের একটি শহরতলীর স্কুলে জার্মানিতে আশ্রয়ের জন্য করা আবেদনের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।

এতো সব সমস্যা সত্ত্বেও কী কারণে তিনি এখনো জার্মানিতে আশ্রয় পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদি তা ব্যাখ্যা করে বলছিলেন ব্রিটনের দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিককে। তার প্রত্যাশা অ্যাঙ্গেলা মের্কেল তাকে ফিরিয়ে দেবেন না।
হুইল চেয়ারে বসেই সিরিয়া থেকে জার্মানি পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসিক অভিযানে আইএস জঙ্গিদের চোখকে ফাঁকি এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ও বণ্য কুকুরের পালকে এড়িয়ে আসতে হয়েছিল তাকে। এখন তার হুইলচেয়ারটি ভাঁজ করে বারান্দায় রাখা। আর তিনি বসে আছেন বসত ঘরের ধুসর বর্ণের একটি মলিন সোফায়। একই ফ্ল্যাটে তার দুই বোন এবং চার ভাতিজিও থাকেন। একটি ঝুরঝুরে জার্মান বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছিলেন।
১৯৯৯ সালে বছরের প্রথমদিনেই নুজিন মুস্তাফার জন্ম হয়েছিল উত্তর সিরিয়ার মানবিজে। আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ শহরে ১১ সদস্যের একটি কুর্দী পরিবারে তার জন্ম। নুজিন জানান, মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তার পরিবার কখনোই ধর্ম নিয়ে উন্মাদনায় ভুগতো না। তিনি ও তার বোনেরা এবং কাজিনরাই ছিলেন স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের একমাত্র নারী শিক্ষার্থী যারা মাথায় হিজাব পরতেন না বা কোনো ঘোমটা দিতেন না।
নিজের কুর্দী সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নিয়েও খুবই গর্ববোধ করেন নুজিন। আর এই আত্মপরিচয় তার দেশের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভুমিকা পালন করে। নুজিন তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, “সিরিয়ার পুরো জনগোষ্ঠী বাশার আল-আসাদের পক্ষ এবং বিপক্ষ এভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলেও কুর্দিরা শুধু নিজেদের পক্ষেই রয়েছেন। কারণ তারা কাউকেই বিশ্বাস করেন না। ” সানডে টাইমসের সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান ল্যাম্বের স    ঙ্গে একত্রে নুজিন তার স্মৃতিকথামূলক বইটি লিখেছেন। ক্রিস্টিয়ান ল্যাম্ব পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাইয়ের আত্মজীবনীরও সহলেখক ছিলেন।

ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আইএস যেদিন মানবিজের ১০০ মাইল দূরে অবস্থিত রাক্কায় নিজেদের সদর দপ্তর স্থাপন করে সেদিনই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল নুজিন এবং তার পরিবার। তারা জানতো যে, সিরিয়ার বৃহত্তম নৃতাত্বিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণেই তারা আইএস জঙ্গি সংগঠনের টার্গেটে পরিণত হবে। ফলে তার পরিবার তুরস্কে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশেষ করে নুজিনের জন্য ওই যাত্রাটি ছিল বেশ আয়াসসাধ্য। কারণ নির্দিষ্ট সময়ের ৪০ দিন আগেই জন্মগ্রহণের ফলে নুজিন ‘ট্রেট্টা-স্প্যাসটিসিটি’ নামের এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। নুজিন জানান, তার পা দুটোর ওপর তার মস্তিষ্কের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নুজিন বলেন, “আমার পা দুটোর নিজস্ব একটি জীবন আছে। আমি কথা বলার সময় তারা শুন্যের দিকে লাথি ছুঁড়ে মারে। পায়ের গোড়ালিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভেতরের দিকে ঢুকে যায়। পায়ের আঙ্গুলগুলোও যখন-তখন নিচের দিকে বেঁকে যায়। পদমূল ওপরের দিকে উঠে যায়। ফলে আমি হাঁটতে পারি না। ”

কিন্তু শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও নুজিন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ব্যাতিক্রমী এবং অগাধ কৌতুহলের অধিকারী হিসেবে গড়ে ওঠেন। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে বসে নুজিন একটানা স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দেখতেন। ডিজনি কার্টুন, বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যচিত্র এবং ফুটবল ম্যাচগুলো নিয়মিতই দেখতেন নুজিন।
কিন্তু তুরস্কের গাজিয়ানটেপে অবস্থানের সময় ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয়ের পরপরই নুজিনের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। নুজিন বলেন, “আমি ইউটিউবে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত গান এবং যাদুঘরগুলি দেখতাম। এরপর আমি সেসবের তৈরি হওয়ার দিন তারিখ এবং শিল্পীর নামও মনে রাখতাম। ”
নুজিন আরো বলেন, “আমার একান্ত গভীর আগ্রহ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে। যেমন আমি ভাবতাম গুগল আবিষ্কার করল কে, ধন্যবাদ সের্গেই ব্রিন; টন অ্যান্ড জেরির উদ্ভাবক কে, উইলিয়াম হান্না ও জোসেফ বারবারা; মি. বিনের চরিত্রটি রূপদান করেছেন কে, রোয়ান এটকিনসন, প্রসঙ্গক্রমে। ”
নিরক্ষর ছাগল ব্যবসায়ী বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া নুজিন সম্প্রতি ওয়ার অ্যান্ড পিসের অডিও শুনেছেন, পড়েছেন প্রাইড অ্যান্ড প্রিজুডিস, এমা, সেন্স অ্যান্ড সেনসিবিলিটি, জেন আয়ার এবং চার্লস ডিকেন্সের অ্যা টেল অফ টু সিটিস।
তিনি ইংরেজি শিখেছেন তার প্রিয় মার্কিন সোপ অপেরা, ডেজ অফ আওয়ার লাইভস দেখে দেখে। তুরস্ক থেকে গ্রিস, এরপর মেসিডোনিয়া হয়ে সার্বিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া হয়ে জার্মানিতে পাড়ি দেওয়ার সময় তার এই ইংরেজির জ্ঞান বেশ কাজে লেগেছে। তার বাবা-মা অবশ্য তুরস্কের গাজিয়ানটেপেই রয়ে গেছেন। সীমান্তরক্ষী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা তাকে ছোট্ট মুস্তাফা গোত্রের সর্দারে পরিণত করেছে।
গত বছর সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরি সীমান্তে গিয়ে জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন নুজিন। সেখানে বিবিসির সাংবাদিক ফার্গ্যাল কিনের সঙ্গে তার সাক্ষাত হয়। নুজিন তাকে বলেন, তিনি ভবিষ্যতে মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে চান এবং ব্রিটেনের রানীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে চান।
নিজের স্মৃতিকথামূলক বইয়ে নুজিন জার্মানদের জাতীয় চরিত্র নিয়ে প্রথমদিকে কিছুটা বিহ্বলতায় ভোগার কথাও উল্লেখ করেছেন। সেখানে জার্মানদের সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ ছিল: “এই লোকেরা মেশিনের মতো। তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খান এবং ট্রেন মাত্র দু মিনিট দেরি করলেই অত্যধিক মানসিক চাপে আক্রান্ত হন। ”
অবশ্য কয়েক মাস পরে নুজিনও এতে অভ্যস্ত হয়ে যান। গত বছরের অক্টোবরে নুজিন শারীরিক প্রতিবন্ধীদের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর অসাধারণ দ্রুত গতিতে জার্মান ভাষা শিখে ফেলেন নুজিন। গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জার্মান ও ইংরেজির মিশেলেই কথা বলছিলেন।
এমনকি জার্মানদের কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন-যাপনের ছন্দও তিনি রপ্ত করে নিয়েছেন। নুজিন বলেন, “জার্মানরা সত্যিই গর্বিত মানুষ। তারা সব সময়ই এক নম্বরে থাকার চেষ্টা করেন। আর এ কারণেই ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সাথে তাদের এক ধরনের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীতা চলে। কিন্তু আমিও একই প্রবৃত্তি অর্জন করছি। আর আমিও সত্যিকার অর্থেই কঠোর পরিশ্রম করতে ভালোবাসি। এমনকি যদিও এতে আমাকেও আবেগহীন রোবটের মতোই মনে হবে তথাপি আমিও এক নাম্বার হতে চাই। ”
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে চান নুজিন। মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়া তার দূরবর্তী লক্ষ্য। কিন্তু তাতে যদি তিনি সফল হতে না পারেন তাহলে তার ভিন্ন স্বপ্ন আছে বলেও জানান নুজিন। সম্প্রতি ভূগোল এবং জীববিজ্ঞান বিষয়েও তার আগ্রহ জন্মেছে।
তবে জার্মান আমলাতন্ত্রের ধীরগতির খপ্পরে পড়ে তার এসব স্বপ্ন আর বেঁচে থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করে করা আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে নুজিন একটু অস্থির হয়ে পড়েন। পরে তার ভাই ব্যাখ্যা করে বলেন, গত এক বছর ধরে তারা জার্মানিতে বসবাসের অনুমতি পত্রের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কবে তা হাতে পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সম্প্রতি অ্যাঙ্গেলা মের্কেল ঘোষণা করেছেন, যেসব শরণার্থী গত বছর জার্মানিতে এসে পৌঁছেছেন তাদের সকলকেই চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই নিবন্ধিত করা হবে। কিন্তু নুজিনের আর তর সইছে না। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নুজিনের হাতে আর মাত্র তিন মাস সময় আছে তার বাবা-মাকে জার্মানিতে নিয়ে আসার জন্য। তিনমাস পর তার ১৮ বছর পূর্ণ হবে। নুজিনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল অপেক্ষা করতে তার কেমন লাগছে। উত্তরে তিনি বলেন, “আমি এখন অপেক্ষা করার ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতা অর্জন করেছি। আর জার্মান সরকারের উচিৎ এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাতে জার্মানিতে আশ্রয়ের অনুমতির প্রক্রিয়া জর্মানির তৈরি গাড়িগুলোর মতোই দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। ”
নুজিন মুস্তাফার আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের বেশিরভাগই এখন ইউরোপে বসবাস করছেন। একমাত্র তার বোন জামিলা এখনো সিরিয়ার কোবানিতে বসবাস করছেন।
নুজিন বলেন, “বিশ্বব্যাপী এখন যা ঘটছে তার সবই ভয়ঙ্কর। আমার একটি মৌলিক বিশ্বাস হলো কেউই ভালো বা খারাপ হয়ে জন্মান না। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে কাজটি আমাদেরকে করতে হবে তা হলো মানবতার ওপর আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা পুনরুদ্ধার করা। তবে আমি এখনো আশাবাদি। আপনি যতক্ষণ আশাবাদি থাকবেন ততক্ষণ আপনি যথেষ্ট ভালো অবস্থানে থাকবেন। ”
জার্মানিতে আসার সময় অ্যাঙ্গেলা মের্কেল নুজিনের জন্য যেন রানী জেনোবিয়ার নবঅবতাররূপে আবির্ভুত হন। তৃতীয় শতকে সিরিয়ার পালমিরা সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন ছিলেন রানী জেনোবিয়া। যিনি সিরিযার সব সমস্যার সমাধান করে জনজীবনে সমৃদ্ধি ফিরিয়ে এনেছিলেন। এক বছর আগে স্থানীয় নির্বাচনে খারাপ করার পর যেসব রাজনীতিবিদ আগে অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের সমর্থক ছিলেন তারাও এখন তার সমালোচনা করছেন। বিশেষ করে শরণার্থী ইস্যুতে বেশি সমালোচিত হচ্ছেন মের্কেল। নুজিনের মধ্যে কি এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগ আছে?
নুজিন বলেন, “আমার মনে হয় অ্যাঙ্গেলা মের্কেল সেসব শরণার্থীদের কারণে একটু চাপে আছেন যারা জার্মানিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। এসব শরণার্থী আমাদের সকলকেই বাজেভাবে উপস্থাপন করছেন। আমি বরং বলতে চাই, অ্যাঙ্গেলা মের্কেল জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কল্যাণই করছেন: শরণার্থীদের ভালোবাসায় জার্মানির অবস্থা আরো ভালো হচ্ছে। মের্কেল ভালোই করছেন। আর আমি আশা করি তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না। ”
তবে শরণার্থী ইস্যুতে জার্মানদের মনোভাব এখন কিছুটা বদলে গিয়েছে বলেও জানান নুজিন মুস্তাফা। নুজিন বলেন, “আমি এখন দেখতে পাচ্ছি যে, অনেকেই শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর ব্যাপারে তাদের মনোভাব বদলে ফেলেছেন। কিন্তু আমার ধারণা তারা জানেন তারা ঠিক কাজটিই করছেন। বিশ্বের আর যে কোনো মানুষদের মতো শরণার্থীদের মধ্যেও ভালো এবং খারাপ এই দুই ধরনের মানুষই আছেন। জার্মানি যদি সকলকেই সমভাবে স্বাগত জানায় তাহলে খারাপ প্রকৃতির শরণার্থীরা জার্মানির ক্ষতি করতে লজ্জা পাবে। জার্মানি যদি শুধু তাদের উপকারই করতে থাকে আর তারা জার্মানির ক্ষতিই করতে থাকে তাহলে একটা সময়ে গিয়ে আর তারা জার্মানির ক্ষতি করে মনে কোনো আনন্দ পাবেন না। এবং অবশেষে তার জর্মানির ক্ষতি করা বন্ধ করবেন। ”
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


মন্তব্য