kalerkantho


ফেসবুকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের আস্ফালনে লুইসিয়ানা শহরের বর্ণবাদী অতীতের প্রতিধ্বনি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১২:০৮



ফেসবুকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের আস্ফালনে লুইসিয়ানা শহরের বর্ণবাদী অতীতের প্রতিধ্বনি

রবিবারের প্রার্থনা শেষ হওয়া মাত্র নদীতীরবর্তী শহরটির বাসিন্দারা জানতে পারলেন একাকী একজন কালো বন্দুকধারী ব্যাটন রোগ এলাকায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছেন। ওই খবর মিইয়ে যেতে না যেতেই ফেসবুকে একটি বিতর্ক সৃষ্টিকারী বার্তা ভেসে ওঠে।

বার্তাটি পোস্ট করেছেন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা স্কাইলার ডোর, জোনসভিলের শ্বেতাঙ্গ পুলিশ প্রধান। বার্তায় তিনি ওই কৃষ্ণাঙ্গদের 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর তারা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বলেও উল্লেখ করেন।

পোস্টটি অল্প সময়ের মধ্যেই লুইসিয়ানার বাসিন্দাদের দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। জোনসভিলের বাসিন্দাদের ৭০ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ। তারা এই পোস্টকে একটি বর্ণবিদ্বেষী পোস্ট হিসেবেই গণ্য করেছেন। তবে অনেক শ্বেতাঙ্গ আবার পুলিশ কর্মকর্তা স্কাইলার ডোরের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। তাদের মতে, সকলেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিজের মনের কথা বলার অধিকার রয়েছে। দু্ই দিন পর টাউন কাউন্সিল ডোরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।

ওই কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা ছিলেন কালো বর্ণের।

স্কাইলার ডোরের ফেসবুক পোস্ট রাগের জন্ম দিয়েছে। আর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশ থেকেই লোকে ডোরকে উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগাতে থাকে। এমনকি তাকে অসংখ্য নতুন চাকরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এমনকি ডোরের পক্ষে তার এক বন্ধু পদযাত্রার ডাক দিলে পুলিশের শেরিফ সেটি বন্ধে ত্বরিৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং ডোরের বন্ধুকে নিবৃত করেন। কারণ তার ভয় ছিল এতে হয়ত দু্ই পক্ষে গোলাগুলি শুরু হতে পারে।

জোনসভিলে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানে বর্ণবাদী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যেমন পরিস্থিতি ঠিক তেমনি জোনসভিলেও কালো বর্ণের বাসিন্দা এবং পুলিশরা নিজেদেরকে আক্রমণের মুখে রয়েছেন বলে অনুভব করছেন।

ডোরের দাবি তিনি বর্ণবাদী নন। তিনি বলেছেন, তিনি সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধিকারগুলোর জন্য লড়াই করছেন।

ডোর বলেন, "আমি প্রেসিডেন্টর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলাম। সত্যি বলতে কি আমি এখনও তার প্রতি অসন্তুষ্ট। কারণ প্রেসিডেন্ট ওবামা কালো জাতীয়তাবাদী 'সন্ত্রাসী'দের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনই এক সন্ত্রাসী ব্যাটন রোগের তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যাকারী ওই কৃষ্ণাঙ্গ বন্দুকধারী গ্যাভিন লং। আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তা, আমি একজন চিফ। কিন্তু আমি একজন আমেরিকান নাগরিকও বটে। আর আমারও অন্য যেকোনো আমেরিকান নাগরিকের মতোই অধিকার রয়েছে। "

সমালোচকরা অবশ্য বলছেন, ডোরের পোস্টটি শুধু তার বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করেনি বরং তার বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার অতীত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এর মধ্যে অতীতে পুলিশি হেফাজতে এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য ডোরকে দায়ী করার বিষয়টিও রয়েছে।

চারটি বন্যাপ্রবণ নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত জোনসভিল। এর চারদিকে রয়েছে কটন এবং সয়া ফিল্ড। আর রয়েছে কিছু পুরনো বাগানবাড়ি। যেগুলো দাসত্বভিত্তিক অর্থনীতির সাক্ষ্য বহন করছে। যে অর্থনীতি একসময় শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোকে ধনবান করেছিল। এ ছাড়া আদি আমেরিকান টিলাগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে ছোট মাটির স্তুপাকারে। যেগুলো একসময় এখানে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে ছিল।

টিলাগুলোর মাটি অনেক আগেই নির্মাণ প্রকল্পের জন্য কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
২২০০ বাসিন্দার শহরটিও সংকুচিত হয়ে এসেছে। ১৯৮০র দশকের শেষ দিকে পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শহরটির জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে।
"এখানে কিছুই নেই। কোনো চাকরি নেই," বলেন ডোর। যিনি ফ্লেক্স ফিটনেস নামের একটি ব্যায়ামাগার পরিচালনা করেন। যেটি শহরের একমাত্র ব্যায়ামাগার।
ডোর নিজের দেহকেও একজন অলিম্পিক রেসলারের মতোই নির্মাণ করেন। তার পেশিবহুল বাহুতে গোত্রীয় ট্যাটু আঁকা রয়েছে। তিনি ক্যাজুন কাউন্ট্রির মধ্যস্থলে নিউ আইবেরিয়াতে বড় হয়েছেন। যৌবনে পারিবারিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ার কারণেই তিনি পুলিশ হতে চেয়েছেন। প্রথমে তার বড় ভাইকে এক মাতাল ড্রাইভার গুলি করে হত্যা করেন। এরপর তার মা এক অটো দুর্ঘটনায় পানিতে ডুবে মারা যান। ডোরের দৃঢ় বিশ্বাস সেটিও একটি হত্যাকাণ্ড ছিল। যা এখনো রহস্যাবৃত।

ডোর প্রথমে আইবেরিয়া প্যারিশ জেলে কাজ নেন। এরপর পুলিশ কর্মকর্তা হন। ২০১২ সালের মে মাসে তার বিরুদ্ধে ড্যামন আব্রাহাম নামের এক কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

এর দুই মাস পর ডোর জোনসভিলের পুলিশ কর্মকর্তা হন। গত বছর অর্থাভাবে শহরটির পুলিশ বিভাগের জনবল কমিয়ে আনা হয়। আগে ১৪ জন পূর্ণকালীন পুলিশ কর্মকর্তার একজন ছিলেন ডোর। আর এখন তিনি মাত্র দুজনের ইনচার্জ। ৩০ বছর বয়সেই তিনি পুলিশের প্রধান হন।

ডোর ছুটি কাটাতে স্ত্রী ও সৎ মেয়েকে নিয়ে ফ্লোরিডায় গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী শহরের জজ। সে সময়ই তিনি ব্যাটন রোগের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারেন। এর ১০ দিন আগে ডালাসে ৫ পুলিশ কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের খবরে আগে থেকেই তার মন খারাপ ছিল। এবার ব্যাটন রোগের হত্যাকাণ্ডে তার সঙ্গে একত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী ম্যাথিউ জেরাল্ডের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। আর এতেই তিনি ফেসবুকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

এরপরই তাকে নিয়ে অনলাইন এবং অফলাইন দু জায়গাতেই বিতর্কের ঝড় শুরু হয়। আর অবশেষে শহরের মেয়র তাকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন। ডোর ক্ষমা প্রার্থনা করেও রেহাই পাননি। শহরের কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিল তাকে বরখাস্তের পক্ষেই ভোট দেন।

ওদিকে ডোর ৫০টি ভিন্ন ভিন্ন হত্যার হুমকি পেয়েছেন। জোনসভিলের স্থানীয় বাসিন্দা এবং ডোরের সহকর্মীরাও তার চাকরিচ্যুতিতে বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়েন। যারা আগে পরস্পরকে দেখা হলে অভিনন্দন জানাতেন তারা এখন পরস্পর থেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট


মন্তব্য