kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


এই সময়ের প্রতিবেদন

ব্রাসেলসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন আইএসের শিকড়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ২১:৩৮



ব্রাসেলসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন আইএসের শিকড়

জমজমাট ব্যস্ত একটা শহর৷ কিছু জায়গা আবার খুব শান্ত৷ পোস্ট কার্ডের ছবির মতো সুন্দর সব পার্ক আর স্কোয়্যার৷ হিরে আর চকোলেট, খেলা আর বিয়ারের জন্য বিখ্যাত শহরটা৷

তবে এই মুহূর্তে এই শহর কুখ্যাত৷ ইউরোপে সন্ত্রাসবাদীদের সবচেয়ে সক্রিয় আঁতুড়ঘর হিসেবে৷ মঙ্গলবার সন্ত্রাসের মুখে রক্তাক্ত, নতজানু শহরটার নাম--- ব্রাসেলস! পুলিশের সন্দেহ, ১৩০ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া প্যারিস হামলার ছক করা হয়েছিল এখান থেকেই৷ এখানেরই এক অ্যাপার্টমেন্টে গা ঢাকা দিয়েছিল প্যারিস হামলার মূলচক্রী সালাহ আবদেসলাম৷ তার সহকর্মী ফিদায়েঁরা যখন মরছে প্যারিসের রাস্তায়, তখন নিজের সুইসাইড বেল্টটা প্যারিসের রাস্তায় ফেলে এই ব্রাসেলসেই পালিয়ে এসেছিল সালাহ৷ 'আমাকে বাঁচাও' বলে ফোন করে সাহায্যের জন্য ডেকেছিল বন্ধুদের৷

কিন্তু আবদেসলাম তো ধরা পড়েছে! হ্যাঁ, পড়েছে বটে, কিন্তু সেটা যতটা না পুলিশি তত্‍‌পরতায়, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যের জোরে৷ তার সন্ধানে নেমে প্রথমে হাল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল পুলিশ৷ কিন্তু মঙ্গলবার তার গোপন ডেরার খোঁজে যেতেই পুলিশের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে গুলি৷ পুলিশ বুঝে যায়, তারা বুনো হাঁসের পিছনে তাড়া করছে না, সত্যিই ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! তাতেও প্রথমে বরাত খোলেনি পুলিশের৷ কারণ, সালাহ-র এক স্যাঙাতকে যত ক্ষণে পুলিশ গুলি করে মারতে পেরেছে, তত ক্ষণে ছাদের কার্নিশ বেয়ে বেমালুম ভাগলবা আবদেসলাম নিজে! তিন দিন পরে শুক্রবার অবশেষে আর একটি অ্যাপার্টমেন্টে অবশেষে ভরদুপুরে তাকে কোণঠাসা করে ফেলে পুলিশ৷ শেষ হয় গত চার মাস ধরে চলা আন্তর্জাতিক পুলিশি অভিযান৷

শেষ হল কি? সালাহ-কে ধরা হয়েছে ঠিক কথা, ফ্রান্সের মাটিতে বিচারের জন্য তার প্রত্যর্পণের জন্য অপেক্ষা চলছে, এ কথাও ঠিক৷ কিন্ত্ত তার আগে ইউরোপের মাটিতে নাশকতা ঘটানোর আর কী চক্রান্ত সালাহ কষেছে, সে সম্পর্কে জেরার মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি সে৷ তাই মনে করা হচ্ছে, মঙ্গলবার যে ভয়াবহ জঙ্গি হানার শিকার হয়েছে ব্রাসেলস, তা আসলে সালাহরই মস্তিষ্কপ্রসূত৷ ঘটনা হল, আল-কায়দার যখন বাড়বাড়ন্ত, তখন বেলজিয়ামের রাজধানীকে ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিল ওসামা বিন লাদেনের অনুচরেরাও৷

কিন্তু কেন এত শহর ছেড়ে ব্রাসেলসকেই আঁতুড়ঘর হিসেবে বেছে নিয়েছে আইএস-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি? এর পিছনে বেশ কিছু 'স্ট্র্যাটেজিক' কারণ আছে৷ এক, প্যারিস, আমস্টারডাম, কোলোন, স্ট্রাসবুর্গ, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট, বার্লিন-সহ একঝাঁক ইউরোপীয় শহর ব্রাসেলস থেকে গাড়ি বা ট্রেনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ৷ এবং এই শহরগুলোয় পাড়ি দিতে এত দিন কোনও চেকিংয়ের বালাই ছিল না৷ ইদানীং প্যারিস হামলার পর তা-ও ইমিগ্রেশনে কড়াকড়ি হয়েছে৷

দ্বিতীয় তথ্যটি এর চেয়েও ভয়াবহ৷ তা হল, পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি থেকে যারা পশ্চিমি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আইএসের হয়ে রুখে দাঁড়াতে সিরিয়া পাড়ি দিয়েছে (অনেকটা সৌদি আরব থেকে আফগানিস্তানে পাড়ি দেওয়া মুজাহিদিনদের কায়দায়), তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি সংখ্যায় জিহাদিরা গিয়েছে বেলজিয়াম থেকেই৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন , ২০১২ থেকে অন্তত ৫০০ মহিলা -পুরুষ মুজাহিদিন হিসেবে সিরিয়া এবং ইরাক পাড়ি দিয়েছেন৷ এঁদের মধ্যে যাঁরা দেশে ফিরেছেন , তাঁদের মধ্যে শ'খানেক মানুষকে ইতিমধ্যেই গ্রেন্তার করা হয়েছে৷ কিন্ত্ত ঘটনা হল , এই হিসেবটা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরাও খুব একটা নিশ্চিত নন৷ তাঁদের সন্দেহ , সংখ্যাটা হতে পারে এর থেকে অনেক অনেক বেশি৷ এবং এদের মধ্যে যাঁরা দেশে ফিরছেন , তাঁরা হয়ে উঠছেন আইএস -এর নতুন 'রিক্রুটার'৷ এ ভাবেই সবার অগোচরে সন্ত্রাসের ভয়াবহ আঁতুড়ঘরে পরিণত হচ্ছে বেলজিয়াম , যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রাসেলস৷

তিন , মুসলিমদের একাংশকে প্রান্তিক করে রাখা এবং চাকরি -বাকরির ক্ষেত্রে সুযোগের অভাবকেও পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে আইএস৷ বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া অনেক মুসলিমই মনে করেন , তাঁরা নিজভূমে পরবাসী৷ তাঁদেরই মগজধোলাই করে ইরাক আর সিরিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি৷ তলায় তলায় বেড়ে চলেছে সন্ত্রাসের এই শিকড়৷ কেউ কোনও প্রতিবাদ করছে না কেন ? কারণ একটাই , তলায় তলায় আইএস -এর ভয়৷ এই ত্রাস কতটা তা মোলেনবিক শহরতলিতে গেলেই বোঝা যাবে৷ এখানে মূলত শ্রমিক শ্রেণির বাস৷ কাউকে গিয়ে প্রতিবাদের কথা জিজ্ঞেস করুন৷ কারও কাছ থেকে কোনও সাড়া পাবেন না৷ যাঁরা আইএস -এর 'নিয়োগ ' পদ্ধতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের প্রতিনিয়ত মোবাইলে হুমকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে৷ মিডিয়ায় মুখ খোলার উপরে জারি হয়েছে ফতোয়া৷ বেলজিয়ামের এক ইমাম শেখ সুলেইমান ফন অ্যাল সখেদে বলছেন , 'আমরা এমন একযুগে বাস করি , যখন প্রতিবাদী হয়ে রুখে দাঁড়ানো বিপদেরই নামান্তর৷'

বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যখন অ্যালের সঙ্গে কথা বলেছেন , তখন তাঁর চারপাশে মোতায়েন দেহরক্ষীরা৷ তা সত্ত্বেও ধর্মান্তরিত এই ইমাম বলছেন , 'আমি কিন্ত্ত ভয় পাই না৷ আমি শুধু সতর্ক থাকছি , লুকিয়ে থাকছি না৷ যা হওয়ার তা তো কেউ ঠেকাতে পারবে না৷'

কিন্ত্ত এ সব ছাপিয়ে মঙ্গলবারের পর মাথাচাড়া দিচ্ছে আরও একটা প্রশ্ন৷ কলকাতা সম্পর্কে যেমন গোয়েন্দারা বলে থাকেন , এই শহর তাদের যাতায়াতের 'সেফ করিডর ' বলেই এখানে নাশকতা ঘটাতে চায় না সন্ত্রাসবাদীরা৷ তা হলে যে ব্রাসেলসে আইএস সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুড়ঘর , সেই শহরকেই তারা জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য বেছে নিল কেন ? এ উত্তর কারও কাছে নেই৷ না আছে আবদেসলামের কাছে , না বেলজিয়ান পুলিশের কাছে৷ যাঁর জীবন -মৃত্যু নিয়ে বরাবরের ধোঁয়াশা , সেই আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি হয়তো বলতে পারবেন!


মন্তব্য