kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্যান্সার চিকিৎসায় আশা 'যুগান্তকারী' টিকা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৪ মার্চ, ২০১৬ ২২:০৮



ক্যান্সার চিকিৎসায় আশা 'যুগান্তকারী' টিকা

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশার আলো৷ শরীরের যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতদিন তেমন একটা অংশ নিত না ক্যান্সার মোকাবিলায়, সেই ব্যবস্থাকে জাগিয়ে আরও শক্তিশালী করে তুলে ক্যান্সার চিকিত্সায় এক ধাপ এগিয়ে গেল ইংল্যান্ড৷ যে টিকার পরীক্ষা এখন চলছে লন্ডনে, তা যদি সফল হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে আগ্রাসী এই মারণ রোগ প্রতিরোধে। কেমন সে পরীক্ষা?

যেন ফৌজি অপারেশনের ছায়া-জঙ্গিরা ঘাঁটি গেড়েছে৷ কমান্ডোরা জেগে ওঠো, তৈরি হও! কেন? ক্যান্সার নিরাময়ে বিজ্ঞানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা হল, এক থেকে অন্যান্য অঙ্গে এই রোগের অতি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া৷ টানা কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকে নির্মূল করলেও, শরীরের সুস্থ কোষকেও মেরে দেয়৷ ঘটনা হল, ক্যান্সারের কোষ যেহেতু শরীরেরই অংশ, তাই তার বিরুদ্ধে তেমন লড়াই করে না শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও (যাকে অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটি বলে)৷

নতুন টিকায় এই ইমিউনিটিকেই 'জাগিয়ে তুলে 'প্রায় 'লেলিয়ে ' দেওয়া হচ্ছে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে! লন্ডনের গাই'স অ্যান্ড সেন্ট টমাস হাসপাতালে এক ব্রিটিশ মহিলার উপর 'ভেপার' নামে টিকাটির প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে৷ বছর পঁয়ত্রিশের কেলি পটারের জরায়ুতে ক্যান্সার ধরা পড়ে৷ পরে যকৃত্ ও ফুসফুসেও তা ছড়িয়ে পড়ে৷ কেলি ছাড়াও আরও এক রোগিণীকে এই পরীক্ষার জন্য বাছা হয়েছে৷ টিকার পুরো কোর্সটি সম্পূর্ণ হতে ১৮-২৪ মাস লাগবে৷ মোট ৩০ জন রোগীর উপর এই দু'বছর ধরে পরীক্ষা চলবে৷ বাকিদের বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷

কীভাবে কাজ করবে এই টিকা? যে ভাবে শরীরের রোগপ্রতিরোধক ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে ব্যবহার করে শরীরকে আগে থেকে যে কোনও ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে 'তৈরি' রাখে যে কোনও টিকা৷ বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বিভাজনের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের অবিরাম ভাবে বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে 'হিউম্যান টেলোমারেজ রিভার্স ট্রানস্ক্রিপটেজ '(এইচটার্ট) নামে এক উত্সেচক৷ সেই উত্সেচকের গঠনমূলক প্রোটিনের সামান্য অংশ 'ভেপার' টিকায় রাখা হয়েছে৷

যা (অ্যান্টিজেন হিসেবে) ইনজেকশনের সাহায্যে রক্তে মিশিয়ে দিলে তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় শরীরে রোগপ্রতিরোধক অ্যান্টিবডি রাসায়নিক তৈরি হবে৷ এই অ্যান্টিবডি শরীরে আগে থেকে থাকা ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করবে৷ তবে সুস্থ কোষগুলির কোনও ক্ষতি করবে না৷ এমনিতে মুশকিলটা হল, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সাধারণত সুস্থ কোষ আর ক্যান্সার কোষের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না৷ ফলে ব্যবস্থাও নিতে পারে না৷ তাই, অন্যতম ক্যান্সার প্রোটিনের অংশ দিয়ে তৈরি অ্যান্টিজেন প্রয়োগ করে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষগুলির বিরুদ্ধে সতর্ক আর তত্পর করে তোলাটা নতুন গবেষণার অন্যতম অঙ্গ৷

এই প্রক্রিয়া আরও নিশ্চিত করতে টিকার পাশাপাশি রোগিদের কম ডোজের কেমোথেরাপি ওষুধও দেওয়া হবে৷ গাই'স অ্যান্ড টমাসে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কর্মসুচির প্রধান জেমস স্পাইসারের কথায়, 'আগের বিভিন্ন পরীক্ষায় ক্যান্সারের টিকার কার্যকারিতাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল রোগপ্রতিরোধক কোষগুলি৷ এই প্রবণতা থামাতে এবং টিকার কার্যকারিতা বাড়াতে অতিরিক্ত (কেমোথেরাপির) ওষুধ প্রয়োগ এই গবেষণার অনন্য বৈশিষ্ট্য৷ এই চিকিত্সায় সাড়া দেবে না, এমন কঠিন টিউমার কমই আছে৷ সবে প্রথম পর্যায়ের (ফেজ-ওয়ান) পরীক্ষা চলছে৷ এই টিকা নিরাপদ, এটুকু জানি৷ কিন্তু এটা সত্যিই কার্যকরী হবে কি না, সময়ই বলবে৷ 'যাঁর উপর ভেপারের প্রথম পরীক্ষা হল, সেই কেলি পটার কী বলছেন? বেকেনহ্যামের এই বাসিন্দার কথায়, 'গাই'স হাসপাতালেই আমার চিকিত্সা চলছিল৷ এই যুগান্তকারী পরীক্ষার অংশ হতে পেরে গর্ব হচ্ছে৷ গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম ইনজেকশন নিয়েছি৷ আরও সাত বার আসতে হবে৷

চিকিত্সকরা বলেছিলেন, জ্বরের লক্ষণ দেখা দিতে পারে৷ তবে এখনও সে 'রকম কিছু হয়নি৷ ভবিষ্যতে যতদিন সম্ভব ক্যান্সারকে হারাতে চাই৷ তা না-পারলেও ক্ষতি নেই৷ আমি এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছি৷ অন্যান্য ক্যান্সার রোগিদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার কাজ ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু করে দিয়েছি৷ নিজের অভিজ্ঞতা সেখানে ভাগ করে নিই৷ জানাই, কী-কী হতে পারে৷ ক্যান্সার সংক্রান্ত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করাটা আমার স্বপ্ন৷ 'আপাতত ভেপারের পরীক্ষা চলছে লন্ডনের গাই'স অ্যান্ড সেন্ট টমাস ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফেসিলিটির 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ রিসার্চে (এনআইএইচআর), ওই হাসপাতালেরঅ এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের এনআইএইচআর বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, এবং কিংস কলেজে (বিআরসি)৷

এ বছরের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসসিআরআই গবেষণা কেন্দ্র এবং রয়াল সারে কাউন্টি হাসপাতালেও এই টিকার পরীক্ষা শুরু হবে বলে জানা গিয়েছে৷ ইংল্যান্ডের জীববিজ্ঞান মন্ত্রী জর্জ ফ্রিম্যান বলেন, 'ক্যান্সারের চিকিত্সায় নতুন সম্ভাবনার সীমানাকে আরও অনেকখানি খুলে দেবে বর্তমান গবেষণা৷ এই মারণরোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসংখ্য মানুষকে আশা জোগাবে।

'

সূত্র: এই সময়


মন্তব্য