kalerkantho


হার-না-মানা হারমোনিকা

আশপাশে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা প্রবল শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেও অজুহাত বানাননি। তরতরিয়ে উঠে গেছেন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে। মাঈশা মরিয়ম সৈয়দ শুধু একজন হারমোনিকাবাদকই নন, বলা যায় হারমোনিকার অ্যাম্বাসাডর! তাঁর গল্পটা শোনাচ্ছেন মিজানুর রহমান

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হার-না-মানা হারমোনিকা

বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় প্রসাধনী আর গয়নার দোকানে। বাদ্যযন্ত্র শোনার সময় কই! লাইব্রেরিগুলোও যেন মরূদ্যান।

নারীর সৌন্দর্যের বিচার আটকে আছে গায়ের রং, তথাকথিত জিরো ফিগার আর পোশাক-আশাকে। বুদ্ধিমত্তার সৌন্দর্য যে একেবারেই প্রাধান্য পায় না তা নয়, তবে সেটি এখনো চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিতে হয়। মাঈশা আমাদের ভুল প্রমাণ করেন, মনে আশার সঞ্চার করেন। আর ১০ জনের মতো নন তিনি। তবে তাঁর সৌন্দর্যে বিমোহিত হতে হলে তাঁর কাজে, তাঁর সৃষ্টিতে ডুব দিতে হবে। গীতিকার, সুরকার, হারমোনিকা শিল্পী ও লেখক—মাঈশার পরিচয় অনেক।

জন্মগতভাবেই শারীরিক অসংগতি, সঙ্গে ডায়াবেটিস—অসুস্থতা তাঁর পিছু ছাড়ে না। সামাজিক বৈরিতার ভাইরাস তো আছেই; তবে কিছুই মাঈশাকে কাবু করতে পারেনি। নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন একাগ্রতার সঙ্গে।

এখন পড়ছেন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। চলছে সংগীত সাধনা, বাদবাকি সব। মাঈশা শুধু হারমোনিকা বাদকই নন, হারমোনিকার একজন অ্যাম্বাসাডর বলা যায় তাঁকে। তাঁর সঙ্গে হারমোনিকা নিয়ে কথায় কথায় জানা গেল, সুরেলা এই বাদ্যযন্ত্রের এক ঝুলি না-জানা তথ্য।

পাঁচ বছর বয়সে বাবা যখন হারমোনিকা কিনে দেন, তখন থেকেই এর সঙ্গে বন্ধুত্ব। হারমোনিকা হাতে পেয়ে মাঈশা ধীরে ধীরে গান তুলতে শুরু করেন এক এক করে। তাঁর আগ্রহ দেখে বাড়িতে সংগীতশিক্ষক নিয়োগ দেন বাবা। এরপর শুরু হয় মাঈশার নতুন জীবন। গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে চলে হারমোনিকার চর্চা। টুকটাক পারফর্ম করতেও শুরু করলেন স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। প্রাণভরে উত্সাহ জোগাল বন্ধুরা। আর এতেই এগিয়ে যেতে থাকেন মাঈশা। চলতে চলতে স্বরব্যাঞ্জো ব্যান্ডের সঙ্গেও পথচলা শুরু।

মাঈশা মনে করেন, নারী হিসেবে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য প্রথম কাজ আত্মনির্ভরশীল হতে চাওয়া। এই চাওয়াটাই মানসিকতা গঠনে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। এগিয়ে যাওয়ার পূর্বশর্ত—লেখাপড়া থামানো যাবে না। বলার মতো একটা ঝাঁ চকচকে ডিগ্রি থাকলে মন্দ কী!

জানালেন, স্নাতক পড়ার সময়টিই আসলে নিজের ভেতরকার সত্তাকে আবিষ্কার করার সময়। কেবল মেয়েদের নয়, বরং সবারই উচিত এই সময়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছু একটা শিখে রাখা, যেমন গ্রাফিকস ডিজাইন, ছবি তোলা, ছবি আঁকা বা কর্মমুখী যেকোনো কিছু। তবে এও বললেন, যে নারীরা সমাজ, পরিবার বা অন্য যেকোনো কারণে ঘন ঘন আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভোগেন, তাঁদের উচিত নিজের আগ্রহের জায়গাটি খুঁজে বের করে কিছুটা জেদ চাপিয়ে হলেও তাতে দক্ষ হয়ে ওঠা। এটাই একটা সময় তাঁর ভেতর বড় শক্তি জোগাবে।

অসুস্থতা প্রায়ই দুর্বল করে মাঈশাকে। তবে ঘায়েল করতে পারে না। তিনি নিজেই যে আরো অনেকের অনুপ্রেরণা! রীতিমতো সাহস জোগান অন্যদের।

শুরুতে প্রতিবন্ধকতা ছিল বটে। তবে সেটা কাজের ক্ষেত্রে। নিজের শারীরিক অসংগতি বা নারী হওয়ার কারণে নয়। এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করেন মাঈশা। অনেকেই বলেছিল, হারমোনিকা দিয়ে বিভিন্ন রাগ-রাগিণী তোলার চেষ্টা করাটা নাকি ধৃষ্টতা! মাঈশা এসব পরোয়া করেন না। মাথার ওপর ছায়া হিসেবে পেয়েছেন সংগীতগুরু পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরীকে। তো আর কী চাই? নিজেকে বাজিয়ে দেখেছেন এখানেও। কুড়িয়েছেন অঢেল হাততালি।

আমার অনুপ্রেরণা—যাঁকে আমি দেখে দেখে বড় হয়েছি, তিনি আমার মা। একটি কলেজের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম, কাজের ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের সব প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। ঘুরতে যাওয়ার আবদার মিটিয়েছেন। রান্না করছেন। একজন মানুষ এত কিছু কিভাবে করতেন এটি এক রহস্য।

সংগীতজীবনের বড় অনুপ্রেরণা সংগীতগুরু পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী। আমার গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের বিষয়টিকে তিনি সমর্থন দিয়েছেন। জীবনের অনুপ্রেরণা পাই প্রকৃতি থেকে। যত যা কিছুই হোক না কেন, সময়টা ঠিক চলে যাচ্ছে। তাই আমাকেও সীমাবদ্ধতা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে। মাঈশা চান, তাঁর মতো অন্যরাও যেন হারমোনিকা বোঝে ও শোনে।


মন্তব্য