kalerkantho

ফুটবলের রাজকন্যা

অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক কৃষ্ণা রানী সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রমীলা ফুটবল দলের এগিয়ে চলার গল্পটা দারুণ। শোনা যাক শাহজাহান কবিরের কাছ থেকে

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ফুটবলের রাজকন্যা

মেয়েটি ফুটবল খেলে—পাড়া-প্রতিবেশী, এলাকার লোকজন ভালো চোখে দেখেনি বিষয়টি। এটা-ওটা বলে মন বিষিয়ে তুলত মায়ের। নমিতা রানী একবার রাগে-দুঃখে বঁটি দিয়ে কুচি কুচি করে কাটলেন মেয়ের বল। সেদিন অনেক কেঁদেছিল মেয়েটি। সান্ত্বনা হয়েছিলেন কাকারা। তার তিন কাকা গৌরব চন্দ্র, নিতাই চন্দ্র ও রঞ্জিত চন্দ্র। সেদিনই একটা নতুন বল কিনে দেন গৌরব চন্দ্র। অনুশীলন করতে যেতে হতো বাড়ি থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে। হাতখরচ পাবে কোথায়? মায়ের কাছে চাওয়ার উপায় নেই। কাকারাই ভরসা। টাঙ্গাইলের ৩৬ নম্বর উত্তর পাথালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে কৃষ্ণা রানী সরকার খেলতে যায় বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

তখনই নজর কাড়ে সুতি ভিএম উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রায়হানের। তাঁর আগ্রহেই কৃষ্ণা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সুতি ভিএম স্কুলে। সেই স্কুল পরপর তিনবার আন্তস্কুল ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় কৃষ্ণা-ঝলকেই। এখন দেশের ফুটবল অঙ্গন মাতাচ্ছে শ্যামল বরণ মেয়েটি। তার অধিনায়কত্বে এশিয়ার সেরা আটে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছরই উত্তর কোরিয়া, জাপান, চীন, থাইল্যান্ড, লাউস, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তির বিপক্ষে এশিয়ার সেরা হওয়ার লড়াইয়ে খেলবে বাংলাদেশ। কৃষ্ণার সামনে তাই নতুন চ্যালেঞ্জ। স্বপ্ন দেখে বিশ্বকাপ খেলার। সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ডে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ওই আসর থেকেই সেরা তিন দলের সরাসরি সুযোগ হয়ে যেতে পারে বিশ্বকাপে।

 

দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী : একচালা টিনের ঘর, চাল শতছিদ্র। ঘরের এক কোণে ভাই-বোন, অন্য পাশে মা-বাবার শোয়ার জায়গা। দেশের ফুটবল মাতাচ্ছে যে কিশোরী, তাকে এমন জীর্ণ কুটিরে হয়তো মানায় না, তবে এটাই বাস্তবতা। এখন অবশ্য কিছুটা সচ্ছল কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব। মেয়ে ফুটবল ফেডারেশন থেকে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাচ্ছে, অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তো সংবর্ধনা লেগেই ছিল। তাতেও অর্থ সমাগম হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রথম সংবর্ধনায় পাওয়া এক লাখ ২৫ হাজার টাকার পুরোটা বাবার হাতেই তুলে দিয়েছে কৃষ্ণা। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামের বাসুদেব একসময় দর্জির কাজ করতেন। সে পেশা ছেড়ে এখন সামান্য চাষাবাদ করেন। মেয়ে একসময় নামি ফুটবলার হবে, দেশ মাতাবে—তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।

 

ফুটবলে হাতেখড়ি : বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরুর পর উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফুটবলে হাতেখড়ি কৃষ্ণার। পেয়ে যায় ফুটবলের নেশা। কে জানত তার পায়ে অমন জাদু দেখা যাবে। পরবর্তী সময়ে তাকে কোচিং করান মেয়েদের ফুটবলের সাফল্যের কারিগর গোলাম রব্বানী। তাঁর মুখে শোনা গেছে, ‘ওর দক্ষতাটা মনে হয় একদম প্রকৃতিদত্ত। মাঠে চোখের পলকে সে একটা কিছু করে ফেলতে পারে। তার ড্রিবল, দুই পায়ের শট, রানিং—সব কিছু মিলিয়ে সে দারুণ প্রতিভাধর এক খেলোয়াড়। ’

২০১৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় কৃষ্ণা, শ্রীলঙ্কায় অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে। পরের বছর অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। ঢাকায় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের সে আসরে বাংলাদেশ তৃতীয় হয়েছিল। সেবার মেয়েদের ফুটবল দারুণভাবে দর্শকনন্দিত হয়। একসময় এই খেলায় মেয়েদের আনতে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। নারী ফুটবল বন্ধে স্টেডিয়ামের বাইরে মিছিল হয়েছে। ২০১৪ সালে সেই মেয়েরাই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তুমুল হাততালি পেয়েছে সুন্দর ফুটবলের ছবি এঁকে। লিপি, সানজিদাদের সঙ্গে ওই আসরে নিজেকে জানান দিয়েছে কৃষ্ণাও। তাঁর সামনে খুলে গেছে জাতীয় দলের দরজা। অথচ তখনো ১৪ ছোঁয়নি তাঁর বয়স।

 

কৃষ্ণা-ঝলক : পাকিস্তানে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দলের সঙ্গী হয়ে থাকা শুধু নয়, মাঠে কৃষ্ণার প্রতিভার ঝলক দেখা গেছে প্রতিটি ম্যাচে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে আসরে দেশের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিকও করে সে। নেপালে অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক করা হয় কৃষ্ণাকে। সেই আসরেই এসেছে বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলের যেকোনো পর্যায়ের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। নেপালের ওই আসরটা কৃষ্ণাদের মনে গেঁথে আছে অন্য কারণেও। ২৫ এপ্রিল দশরথ স্টেডিয়ামে ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার কথা স্বাগতিক নেপাল ও বাংলাদেশের। সেদিন দুপুরেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে কাঠমাণ্ডু। বিধ্বস্ত হয় দশরথ স্টেডিয়াম। কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিল কৃষ্ণারা।

একই বছর ডিসেম্বরে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা ভুলে সেই ফাইনাল খেলতে যায় বাংলাদেশ। দেশে ফেরে ট্রফি নিয়েই। ওই আসরেই মেয়েদের ফুটবলের যেকোনো পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ভারতের সঙ্গে ড্র করে বাংলাদেশ, হারায় ইরানকে। ইরানের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে প্রথম গোলটিই কৃষ্ণার। বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলের জয়যাত্রা সেখান থেকেই। এরপর কিরগিজস্তানে গিয়ে অনূর্ধ্ব-১৪-এর শিরোপা ধরে রেখেছে লাল-সবুজ। বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় কৃষ্ণা অবশ্য সেই আসরে খেলতে পারেনি।

 

বর্ষসেরা নারী ক্রীড়াবিদ : এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইয়ের আসরে ইরান, চায়নিজ তাইপে, সিঙ্গাপুরের মতো দলগুলোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলেই মিলবে মূল আসরের টিকিট—গত বছর বাংলাদেশের সামনে ছিল এমন কঠিন পরীক্ষা। কৃষ্ণার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগোল ধাপে ধাপে। ইরানকে ৩-০ গোলে হারিয়েই আত্মবিশ্বাসের জ্বালানিটা পেয়ে যান তাঁরা। পরের ম্যাচে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে জয় ৫-০ গোল, তাতে কৃষ্ণার জোড়া গোল। তৃতীয় ম্যাচে কিরগিজস্তানকে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত করা, তাতে হ্যাটট্রিকও পূরণ হয় বাংলাদেশ অধিনায়কের। গ্রুপে বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ ধরা হয়েছিল চায়নিজ তাইপেকে, তাদের বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়েও কৃষ্ণার ১ গোল। আরব আমিরাতের বিপক্ষে আনুষ্ঠানিকতা সারার শেষ ম্যাচে আবার জোড়া গোল তাঁর। বলতে গেলে কৃষ্ণাকে থামানোই যায়নি সে আসরে। পুরো এশিয়ায় চারটি গ্রুপের বাছাই পর্বে ৮ গোল নিয়ে টাঙ্গাইলের এই কিশোরী চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১৬ সালের রূপচাঁদা-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারে বর্ষসেরা নারী ক্রীড়াবিদ হয়েছে কৃষ্ণা। ছেলেদের ফুটবলে এখনো যা আকাশকুসুম কল্পনা, অনূর্ধ্ব-১৭ পর্যায়ে হলেও মেয়েদের ফুটবলে কৃষ্ণারা দৃপ্ত পায়ে এগোচ্ছে সেই পথে। এখন ছেলেদেরও যে অনুপ্রেরণা কৃষ্ণার মতো সাফল্যের গল্প লেখা মেয়েরা।

 

 

সাবিনা-মার্তা-মেসি

দেশে মেয়েদের ফুটবলে এত দিন একটাই নাম—সাবিনা। যে পর্যায়ের খেলাই হোক সাবিনার তাতে গোলের ফুলঝুড়ি। কৃষ্ণা ফুটবল খেলা শুরু করেই শুনেছে সাবিনার নাম। জাতীয় দলে এসে দেখেছে কাছ থেকে। একটাই স্বপ্ন—সাবিনার মতো হতে হবে। ‘সাবিনা আপুর খেলা সব সময় ফলো করেছি। চাইতাম তাঁর মতো যেন হালি হালি গোল করতে পারি। ’ সেই সাবিনা এখন কৃষ্ণাকে জাতীয় দলে পেয়ে দারুণ খুশি। গত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো ফাইনালে সাবিনা-কৃষ্ণা লড়েছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ফুটবলের নতুন পাঠে কৃষ্ণা এখন অন্তর্জালেও চোখ রাখে। ইউটিউবে অনুসরণ করে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি মার্তার খেলা। লিওনেল মেসিকেও তার সমান পছন্দ। ‘সত্যি বলতে মেসির খেলাই বেশি দেখি। ওর মতো গোল করতে, করাতে খুব ইচ্ছা হয়। ’


মন্তব্য