kalerkantho

‘মা’ হাজেরা

যৌনকর্মী থেকে যৌনকর্মীদের শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী হয়েছেন হাজেরা বেগম। তাঁর কাছে থাকে ৩৫টি ছেলে-মেয়ে। তিনি তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার জন্য নিজের সব সম্বল ঢেলে দিচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘মা’ হাজেরা

আদাবরের শনিরবিল মসজিদের পেছনেই তাঁর বাসা। সেখানে থাকে ৩৫টি ছেলে-মেয়ে।

ওদের বয়স তিন থেকে ১৪ বছর। চারটি রুমের একটিতে ছেলেরা থাকে, পাশের রুমে হাজেরা, একজন শিক্ষিকা আর একজন আয়া থাকেন। এই ঘরেই আছে একমাত্র রঙিন টিভিটি। পরের রুমটি মেয়েদের। বাকি রুমটি পড়ার ঘর। রুমের দেয়ালে রঙিন ছবি আঁকা আছে। আর আছে একটি আলমারি। সেখানে শরৎ রচনাবলি, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাহলিল জিবরানের দ্য প্রফেটসহ আরো অনেক বই আছে। এগুলো এবার মেলায় গিয়ে কিনেছিল ওরা। আলমারির পাশে একটি মেন্যুতে কোন বেলায় কী খাবে সেই লিস্ট টাঙানো আছে। এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি থামিয়ে একটি ছেলে এসে হাজেরা বেগমের আঁচল ধরল, ‘মা খিদা লাগছে। ’ মা বললেন, ‘চল তোকে খাবার দিয়ে আসি। ’ একজন প্লেটগুলো নিয়ে এলো, অন্যজন লাইফবয়। একে একে সবাই বেসিনে হাত ধুয়ে এলো। গোল হয়ে বসল। বড় এক পাতিল থেকে ভাত বেড়ে দিতে লাগলেন মা, এরপর তরকারি। সবাই খেতে লাগল।

পাশের রুম থেকে কান্নার শব্দে একটু পরে ছুটে গেলেন হাজেরা বেগম। ফিরে এলেন পাঁচ বছরের সংগ্রামকে নিয়ে। জন্মের ঘণ্টা তিনেক পর থেকে সে এই মায়ের কাছেই আছে। ওর আসল মা ছিলেন ভাসমান যৌনকর্মী। সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই তাকে আর আলোর মুখ দেখাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে হাজেরা তাঁকে বলেছিলেন, ‘ওর জন্মের খরচাপাতি আমি দেব। বড় করব। ’ সেই ভরসায় মিরপুরের মাজারে জন্ম নিল সংগ্রাম। তার মতো চৈতী, তামান্না, রবিন, সায়েম, স্বপন, ফারজানা, শেলীসহ সবাই যৌনকর্মীর সন্তান। এখানে তারা তিন বেলা খায়, অসুখ হলে মা তাদের সেবা করেন, লেখাপড়াও শেখে ওরা। ভাসমান এসব শিশুর জন্য ‘মা’ হাজেরার খুব মায়া। কারণ তাঁরও তো জীবন শুরু হয়েছিল একই গল্পে। জন্মেছিলেন এক জেলের ঘরে। সত্মায়ের অত্যাচারে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন আট বছর বয়সে। গুলিস্তানে সেই যে বাস থেকে নামলেন, সেই থেকে মুক্তাঙ্গনের ভাসমান শিশুরাই তাঁর ভাই-বোন, সেটিই তাঁর ঠিকানা। কাগজ কুড়াতেন ছোটবেলায়। কিছুদিন পর ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তারা নিয়ে গেলেন নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের ফকিরখানায়। কয়েক মাস পর কেন্দ্রের এক কর্মকর্তার বাড়ির কাজের মেয়ে হলেন। বেদম মার সইতে না পেরে একদিন পালিয়ে চলে এলেন জিপিওতে। এভাবে এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি, নানাজনের কাছে থেকে একদিন ঠিকানা হলো কান্দুপট্টির পতিতালয়ে। সেখানে বছর দুয়েক ছিলেন। পরে পালিয়ে চলে এলেন। এরপর ভাসমান যৌনকর্মী, বছর তিনেক টানবাজারেও ছিলেন। তারপর সেই পেশা থেকে মুক্তি ঘটল।

লেখাপড়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীদের মাধ্যমে। তাদের কাছে হাতের কাজও শেখেন। এরপর গার্মেন্টে কাজ নিলেন। বেতন মাসে ৩০০ টাকা। তখন তিনি একটি সরকারি পুনর্বাসনকেন্দ্রে থাকতেন। সেখান থেকে একসময় বের করে দিলেন কর্মকর্তারা। ফের সংসদ ভবন-প্রেস ক্লাব এলাকায় যৌনকর্মীর জীবন শুরু হলো। এরই মধ্যে পাড়ার লোক জোর করে কাবিন ছাড়াই বিয়ে পড়িয়ে দিল। বছর তিনেক সেই স্বামীর সংসার করে আর যখন সইতে পারলেন না, চলে এলেন। বেসরকারি সাহায্য সংস্থা কেয়ারে কাজ নিলেন। সেখানেই ইংরেজি শিখলেন। কয়েকবার এইচআইভি এইডস প্রজেক্টে বিদেশেও গিয়েছেন।

হাজেরা বেগমের জীবনের গল্পটি বদলে গেল দুর্জয়ে এসে। ভাসমান যৌনকর্মীদের এই সংগঠনে তিনি যৌনকর্মীদের সন্তানদের দেখভাল করতেন। তবে সংগঠনের ‘শিশুনিবাস’ কার্যক্রম একসময় নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেল। তবে শিশুদের মায়া ছাড়তে পারলেন না। নিজেই তাঁদের দেখাশোনা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। রাতের আঁধারে পুলিশের অত্যাচার, খদ্দেরের উত্পীড়ন আর সমাজের বীভত্সতা সয়ে যে আট লাখ টাকা জমিয়েছিলেন, সেই সারা জীবনের সঞ্চয় নিয়ে নেমে পড়লেন হাজেরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে সংগঠন গড়লেন ‘শিশুদের জন্য আমরা’। ২০১০ সালের শুরুতে সাভারের উত্তর রাজেশ্বরে একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হলো। সেখানে ২০টি শিশু, দুজন আয়া আর একজন শিক্ষককে নিয়ে হাজেরা বেগম সংসার পাতলেন। মাস ছয়েক থেকে হেমায়েতপুরে বাসা নিলেন। ছয় মাস সেখানে কাটালেন। এর পর থেকে আদাবরের এই বাড়িতেই সন্তানদের নিয়ে আছেন তিনি। বাসাভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, লেখাপড়াসহ মাসে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিভিন্ন মানুষের অনুদানে চলে সেই খরচ। খালেদ মনসুর ট্রাস্ট প্রতি মাসে ২৪ হাজার টাকা দেয়, নাজমা নামের এক ভদ্রমহিলা কোনো মাসে ১০, কোনো মাসে ১৫ হাজার টাকা দেন, আমেনা ফাউন্ডেশন প্রতিদিন চার লিটার দুধ সরবরাহ করে। ফলে খরচ মোটামুটি চলে যায়। আর হাজেরা তো তাঁর সব সম্বল নিয়ে ওদের জন্য আছেনই। এসব ভাসমান শিশুর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেওয়াই হাজেরা বেগমের একমাত্র স্বপ্ন। ওরা এখন স্কুলে যায়। ১৪ জন পড়ে প্রাইমারিতে, ছয়জন হাই স্কুলে। গত বছর চারজন জেএসসি পরীক্ষাও দিয়েছে।

পদে পদে তাদের নিয়ে সমস্যার মোকাবেলা করে চলেছেন হাজেরা বেগম—‘যৌনকর্মীর সন্তানদের কোনো স্কুল ভর্তি করতে চাইত না। কারণ কারো তো বাবা নেই। পরে স্যারদের হাতে-পায়ে ধরে ভর্তি করতে হয়েছে। এখন নাম জানতে চাইলে শিশুদের জন্য আমার সাত সদস্যের কমিটির কারো নাম দিয়ে দিই। ’ হাসিমুখে তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখায় খুব ভালো। ’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী তাদের পড়া দেখিয়ে দেন। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের একটি সংগঠন স্বাস্থ্যসেবা দেয়। নানা প্রয়োজনে আছেন তিনজন আয়া। আর যেকোনো বিপদ-আপদে ‘মা’ হাজেরা তো আছেনই। তবে তাঁর একার পক্ষে কুলানো কঠিন। ‘শিশুদের জন্য আমরা’র ঠিকানা : ৬/২ লুত্ফর রহমান লেন, সুনিবিড়

হাউজিং সোসাইটি, আদাবর-১৬,

ঢাকা-১২০৭।

ওয়েবসাইট : http://www.sja-bd.org


মন্তব্য