kalerkantho


নারীর জন্য একটি পোর্টাল

নারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়েব পোর্টালের স্বপ্ন নিয়ে ২০১৩ সালে ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ সৃষ্টি করেন সুপ্রীতি ধর। নারীদের লেখা ও নারী অধিকার নিয়ে এই পোর্টাল এখন শক্তিশালী একটি মুখপত্র। সময়ের পরিক্রমায় এটি পোর্টাল থেকে হয়ে গেছে নারী আন্দোলনের ভাষা। লিখেছেন মিজানুর রহমান

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নারীর জন্য একটি পোর্টাল

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল তিন বছর। যুদ্ধে বাবাকে হারান। ভাই-বোনদের নিয়ে মায়ের সংগ্রাম দেখে বড় হয়েছেন। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাওয়ার সুবাদে দেখেছেন সেখানকার উত্থান-পতন ও ভাঙন। শৈশব থেকে এত এত সংগ্রাম দেখে একটা সময় নিজের ভেতরেই গড়ে ওঠে ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব। একপর্যায়ে মনে হলো অনলাইনে নারীদের কথাগুলো তুলে ধরার জুতসই জায়গা নেই। এই ভাবনা থেকে ২০১২ সালে মনে করেন নারীদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল গড়ে তোলার।

“এর কিছুদিন পরেই শুরু হয় শাহবাগ আন্দোলন। দেখলাম একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উত্থান। দেখলাম আন্দোলনের বিরোধীরা যতটুকু না শাহবাগের বিরোধিতা করছে, তারচেয়ে বেশি সক্রিয় সেখানকার নারী অংশগ্রহণকারীদের ‘চরিত্র হননে’। এরপর আসতে থাকে বিবৃতির বাণ।

বেশির ভাগই নারী অধিকারবিরোধী। চাউর হয় নারীর সঙ্গে তেঁতুলের তুলনা করে বলা অবমাননাকর কিছু মন্তব্য, যা এখনো ফুঁসিয়ে তোলে আমাকে। ” বললেন সুপ্রীতি।

সমাজের প্রতিটি  ক্ষেত্রে নারীদের আক্রমণের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটেই সৃষ্টি হয় উইম্যানচ্যাপ্টারডটকম। এই ওয়েব সাইটের প্রধান ক্যাটাগরিগুলোর দিকে তাকালেই ওয়েব সাইটটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আন্দোলনে নারী, উন্নয়নে নারী, না-বলা কথা—এসব ক্যাটাগরির অধীনে লেখকরা প্রতিনিয়ত লিখে যাচ্ছেন।

উইম্যান চ্যাপ্টারে শুধুই নারীদের সংগ্রাম নিয়েই কথা বলা হয় না, সাফল্য নিয়েও লেখা হয়। নারী লেখক ও মানবাধিকারকর্মীরা পোর্টালটিকে নিজেদের কথা বলার প্লাটফর্ম হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন এরই মধ্যে। সুপ্রীতি ধর মনে করেন এটাই উইম্যান চ্যাপ্টারের বড় সাফল্য। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন নতুনরা যুক্ত হচ্ছে এই আন্দোলনে। যাত্রা শুরু করার দ্বিতীয় বছরে এসেই ইউম্যান চ্যাপ্টার জিতে যায় ববসের সেরা অনলাইন অ্যাক্টিভিজম পুরস্কার। ’ এরপর সুপ্রীতি ধর নিজেও জেতেন ২০১৫ সালের অনন্যা পুরস্কার।

বাংলাদেশের নারীদের এই সংগ্রাম বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে ২০১৭ সালে উইম্যান চ্যাপ্টারের ইংরেজি ওয়েবসাইটের যাত্রা শুরু হয়। শুচিস্মিতা সীমন্তির সম্পাদনায় চলছে নারী আন্দোলনকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ। ইংরেজি সাইটে লিখছেন বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের লেখকরা।

জীবনের প্রথম আন্দোলন কবে করেন সেটি ঠিক বলতে পারলেন না, তবে সাংবাদিকতা জীবনে যেখানেই অধিকারের সংগ্রাম হয়েছে, সামনের সারিতে থেকেছেন। অনলাইনে শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম যে ফেস্টুনটি নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়, ‘এই রায় দিল কে, কসাইটাকে ঝুলিয়ে দে’ লেখা সেই ফেস্টুনের এক প্রান্ত ছিল সুপ্রীতি ধরের হাতে।

অধিকার আন্দোলন সহজ ছিল না সুপ্রীতির জন্য। অনলাইনে অনেক কাছের মানুষও দূরে চলে গেছে। কয়েকবার পেয়েছেন হত্যার হুমকিও। এই হুমকি-ধমকিতে উইম্যান চ্যাপ্টার থেমে যাবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন অনেকবার। সুপ্রীতি মনে করেন, উইম্যান চ্যাপ্টার শুধু নারী অগ্রগতির দৃশ্যমান অন্তরায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়নি; বরং উন্মোচন করেছে আশপাশের মুখোশধারী মানুষদের মধ্যে বাস করা শোষকদের।

তিনি মনে করেন, নারী অধিকার বিষয়ে কাজ করতে গেলে যদি পরিবার থেকেই প্রথম বাধা আসে, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে তাঁর আশার জায়গা হচ্ছে, এই আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক দূরের মানুষও হয়ে গেছে কাছের।

 

 

মা বলতেন, আমার সারাটা জীবনই একাত্তর

আমার নির্দিষ্ট অনুপ্রেরণা নেই। তবে আজকের আমার মধ্যে আমার মা কমলা ধরের জীবনসংগ্রামের প্রভাব আছে প্রবল। তিনি নিজেও আন্দোলনকারী ছিলেন। সুভাষ বোসের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মা-বাবা একসঙ্গে সংগ্রাম করেন। মা ছিলেন নারী ব্রিগেডের সদস্য। ১৯৭১ সালে বাবা হারানোর পর মা একাধিক চাকরি করে আমাদের চার ভাই-বোনকে বড় করেন। তখন মনে হয় মা মানেই সর্বেসর্বা। আমি যখনই দিশাহারা হয়ে পড়তাম, তিনি বলতেন, যেদিক থেকে ঝড় আসে, সেদিকে ছাতা ধরতে হয়। মা বলতেন, আমার সারাটা জীবনই একাত্তর! আমি পারলে তুইও পারবি। ছেলেবেলায় মায়ের সংগ্রাম আমার মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম পাঠটি দেয়। এরপর রাজনৈতিক সচেতনতার পাঠ আসে সোভিয়েত জীবনে। ইউনিয়ন ভাঙন দেখেছি। আলাদা রাশিয়া দেখেছি। সেই সঙ্গে নারী আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রতিটি কথা আমি অনুভব করি। তসলিমা নাসরিন দ্বারাও অনুপ্রাণিত। তাঁর লেখার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা আছে। তবে অনেক লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি তো আমার কথাই বলছেন। আমার দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলনও আজকের আমাকে গড়তে সহায়তা করেছে।


মন্তব্য