kalerkantho


সেলাই দিদিমণির বন্ধু

ভালো সাবজেক্টে সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও বেছে নিয়েছেন আলোকচিত্রীর জীবন। তুলে আনছেন গার্মেন্ট শ্রমিকদের দুঃখগাথা। পাশাপাশি রাজনীতি করছেন, যে পথে তাঁর মতো কেউ হাঁটে না! আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতারের গল্প শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল-মামদূহ

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সেলাই দিদিমণির বন্ধু

১৯৯৪ সালে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে। তখন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়েছেন।

ফলে নতুন করে পড়েছেন বেগম রোকেয়া, সিমন দ্য ব্যুভেয়ার, গোর্কির ‘মা’। এসব পড়ালেখাই তাঁর ভাবনার জগেক পাল্টে দিল। নারীর জীবনের পরিবার ও সামাজিক বঞ্চনাগুলো তাঁকে জীবন ও সমাজ বদলের সৈনিক করে তুলল, রাজনীতির পথে ঠেলে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পুরোটা সময় আন্দোলন-সংগ্রামে কেটেছে। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, ২০০২ সালের ২৩ জুলাই শামসুন্নাহার হল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে মৌলবাদী হামলার বিপক্ষে সংগ্রাম করেছেন, নেমেছেন বেতন ও ফি বৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলনেও। ছাত্রজীবন শেষেও রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা কমেনি, বরং বেড়েছে। তিনি নারী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হয়েছেন। ফলে আর সব পরিচয়ের মধ্যে রাজনৈতিককর্মীর পরিচয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তাসলিমা আক্তার।

তাঁর আরো একটি বড় পরিচয়—তিনি আলোকচিত্রী। ছবির প্রতি এই ভালোবাসারও শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর। বাবা তাঁকে একটি কম্প্যাক্ট ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। সেটি দিয়ে আপন খেয়ালে ছবি তুলতেন। পরে ছাত্র আন্দোলনের ছবিও তুলেছেন। ২০০৭ সালে এমফিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকালেন। তখন দেশে জরুরি অবস্থা চলছিল। ফলে সর্বক্ষণের রাজনৈতিককর্মী তাসলিমার হাতে অখণ্ড অবসর। কী ভেবে যেন পাঠশালায় এক মাসের বেসিক কোর্সে ভর্তি হলেন। আস্তে আস্তে আলোকচিত্রকে ভালোবেসে ফেললেন। তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্সও হলো। এভাবেই যিনি রাজনীতি ছাড়া আর কিছু করতে চাননি জীবনে, তিনি ছবি তোলার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে গার্মেন্টের মেয়েদের বেছে নিলেন তিনি। আলোকচিত্রে তুলে ধরবেন তাঁদের জীবন ও সংগ্রাম। সাভারসহ বিভিন্ন গার্মেন্ট এলাকায় গিয়ে সেসব নারী শ্রমিকের জীবন দেখতে লাগলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল। দিনের পর দিন তাঁদের সঙ্গে একই বাড়িতে, একই ঘরে থেকেছেন তাসলিমা। আর ফাঁকে ফাঁকে ছবি তুলেছেন। এভাবেই গার্মেন্টের নারীদের সংগ্রাম, তাঁদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা তাসলিমার ক্যামেরায় বন্দি হলো। সেখানে যেমন টানাটানির সংসারের গল্প আছে, তেমনি ক্ষণিকের অবসরে তাঁদের বিনোদনের গল্পও আছে।

 

২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সাভারের তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগার পর আর সব মানুষের মতো চমকে উঠলেন তাসলিমাও। তবে গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করার সূত্রে তাঁর ক্ষতটি ছিল আরো বড়। শ্রমিকদের নিরাপত্তার অভাব কতটা প্রকট, সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন গার্মেন্টে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে লাগলেন তিনি। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সেখানে হাজির হয়েছেন তিনি। তাঁর তোলা ছবি একজন নারী ও পুরুষের বাঁচার শেষ চেষ্টা, প্রাণপণ আকুতি—এই দুর্ঘটনার আইকন ছবি হয়ে গেছে। এটি তৃতীয় সেরা ছবি হিসেবে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তবে এ দুর্ঘটনাই আবার তাঁর চোখ খুলে দিল। আবার গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের মজুরিবৈষম্য ও প্রতিদিনের সংগ্রামের ছবি তুলছেন তিনি। আর গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি হিসেবে গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি তাঁদের ন্যায্য পাওনা ও দাবি-দাওয়ার লড়াইয়ে তো আছেনই।

নারী হিসেবে আলোকচিত্রীর মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় এলেন কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তাসলিমা খানিকক্ষণ চুপ থাকলেন। এরপর বললেন, ‘ক্যাম্পাস লাইফ থেকেই পেশা নিয়ে অন্যদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি দেখছিলাম। সবাই যেন ভাবছিলেন—এ তো নারী, তাঁকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ করতে হবে। পরিবার তো তাঁকেই সামলাতে হবে। এ ধারণাটিই ভাঙতে চেয়েছিলাম। সে জন্যই রাজনীতির মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় এসেছি। ফটোগ্রাফিকে করেছি আমার রাজনীতিরই আরেকটি হাতিয়ার। এ ছাড়া খেয়াল করে দেখেছি, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের নিয়ে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত কোনো শ্রেণিই কাজ করতে চায় না। এই প্রচলিত প্রথাও ভেঙে ফেলতে চেয়েছি। সে জন্যই তাদের নিয়ে কাজ করছি। ’ অনেক দিন আগে সব বাধা ডিঙিয়ে যে পেশায় এসেছিলেন, সেই ফটোগ্রাফিতে তাঁর অনেক অর্জন। ২০১১ সালে ম্যাগনাম ফাউন্ডেশন ও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে যে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ফটোগ্রাফি কোর্সের আয়োজন করেছিল, সেখানে এশিয়া থেকে তিনি বৃত্তি পেয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কে গিয়ে তিনি ‘সিঙ্গেল মাদার’ নিয়ে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ভারতের নন্দীগ্রামে ভূমিরক্ষা আন্দোলনের পর সেখানকার মানুষের জীবন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। সেখানকার পেশাজীবী নারীদের নিয়েও তাঁর কাজ আছে। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়ার লালন সাধুদের নিয়েও কাজ করেছেন। নানা সময়ে তাঁর তোলা ছবি পুরস্কার পেয়েছে। ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ছবি হয়েছে। চীনের ডালি ইন্টারন্যাশনাল ফটো কনটেস্টে সেরা ছবি হয়েছে।

অনুপ্রেরণা : আমাদের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাঈদা খানম ছাড়াও এই প্রজন্মের তরুণ নারী আলোকচিত্রীদের সাহস-উদ্যম ও কাজ তাসলিমা আখতারকে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ ছাড়া পোশাক শ্রমিক নারীদের কাছ থেকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দীপ্ত হন তিনি। কারণ এঁরাই তো শত দুর্ভোগের মধ্যে দিন-রাত কাজ করে মেইড ইন বাংলাদেশকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আমাদের অর্থনীতির প্রধান সহায় হিসেবে আছেন।


মন্তব্য