kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শুধু স্বপ্ন থাকলে হবে না

জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে প্যারেড কমান্ডার ছিলেন এসপি শামছুন্নাহার। পুলিশ বাহিনীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানান তিনি। তাঁর সাফল্যের পেছনের গল্প শুনিয়েছেন ফারুক আহম্মদ

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শুধু স্বপ্ন থাকলে হবে না

আমি ফরিদপুর জেলার সদরপুরের চরমাধবদিয়া গ্রামের মেয়ে। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়।

গ্রামের সরকারি ময়েজউদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ভর্তি হই ফরিদপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৮৯ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই সারদা সুন্দরী সরকারি মহিলা কলেজে।

আইনজীবী বাবার সন্তান হিসেবে স্বপ্ন দেখতাম জজ কিংবা ব্যারিস্টার হব। উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। কিন্তু আইন বিভাগে সুযোগ মিলল না, মিলল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। ভাবলাম, এ বিষয়েই ভালো করব। ভর্তি হয়ে গেলাম। থাকার ব্যবস্থা হলো রোকেয়া হলে। শৃঙ্খলা ভালো লাগত। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি বিএনসিসিতে নাম লেখালাম।

দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর বিমান শাখার সদস্য হয়ে শুরু হলো সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের নতুন অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় আর বিএনসিসির বিভিন্ন প্যারেড ও কুচকাওয়াজে যোগ দিয়ে অন্যদের চেয়ে দক্ষতার পরিচয় দিতে শুরু করলাম। পুরস্কার হিসেবে বিমানবাহিনী থেকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব এলো। যশোরে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটিতে অন্যদের সঙ্গে প্রশিক্ষণের জন্য গেলাম। নানা ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের প্রশিক্ষণও নিতে হলো। মনে মনে বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। তবে নিয়মিত ক্যাডেট না হওয়ায় আমাকে আবার ফিরে আসতে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন যখন বাস্তব হবে না,  তখন সিদ্ধান্ত নিলাম কোনো বাহিনীতে যোগদান করব। কয়েক বছরের মাথায় সত্যি হলো সেই স্বপ্ন।

২০০১ সালে সহকারী পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ লাভ করলাম। সারদায় ট্রেনিংয়ের পর মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে শিক্ষানবিশকাল শুরু হলো। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সুপারের স্টাফ অফিসার পদে চলে আসি। ২০০৬ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করতে ইংল্যান্ডে চলে যাই। ফিরে এসে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হই। যোগ দিই পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে। ২০০৯ সালে জাতিসংঘের শান্তিমিশনে যোগ দিতে পূর্ব তিমুরে যেতে হয়। সেখানে দেড় বছর থাকার পর ফিরে এসে আবারও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে যোগ দিই। ২০১১ সালে চলে যাই ইতালিতে। সেখানে জাতিসংঘের মানব সম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে তিন বছর কাজ করি। ২০১৪ সালে দেশে ফিরে পুলিশ বাহিনীর নতুন ইউনিট ট্যুরিস্ট পুলিশের হেডকোয়ার্টারর্সে যোগ দিই। পরের বছরের জুন মাসে পদোন্নতি নিয়ে চাঁদপুরে পুলিশ সুপার পদে কাজ শুরু করি।

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী হয়ে প্যারেড কমান্ডার হয়েছি। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশলাইনসে প্যারেডে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আসে। আমার অধীনে ১৩টি কনটিনজেন্টের সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য তাতে অংশগ্রহণ করেন। এখানে সালাম গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মজার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী যে খোলা জিপে চড়ে প্যারেড পরিদর্শন করেন তার চালকও ছিলেন একজন নারী।

পুলিশ সপ্তাহে একজন নারীকে কেন এমন দায়িত্ব দেওয়া হলো—এ সম্পর্কে ওই সময় পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান বলেছিলেন, নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং লৈঙ্গিক সমতা আনাই এর লক্ষ্য। তাঁর সেই কথার প্রমাণ রেখেছিলাম আমি। রাজশাহীর সারদা একাডেমিতে সেই ২০০১ সালে সর্বশেষবারের মতো প্যারেডে অংশ নিয়েছি। এর ১৫ বছর পর সরাসরি এত বড় পরিসরে নেতৃত্ব প্রদান খুব একটা সহজ ছিল না। কঠোর পরিশ্রম আর দৃঢ় মনোবলের কারণে সেটি করতে পেরেছি। তবে মনে ভয়ও ছিল। কারণ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এখানে আসতে হয়। সেই প্রতিযোগিতায় আমি সফল হয়েছি। এটা মহান আল্লাহর রহমত। তা না হলে অনেকের মধ্য থেকে আমার এমন সুযোগ হতো না।

পুলিশে কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত। পুলিশে চাকরি হওয়ার পর বাবার কাছে অনাপত্তিপত্র পাঠানো হয়। আমার বেলায়ও তা হয়েছিল। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই আর দুর্বল হয়ে পড়ি। কারণ মনে ভয়, বাবা যদি তাতে সম্মতি না দেন। কিন্তু না, বাবা হাসিমুখে জানালেন, দেশের জন্য কিছু করতে চাইলে আমার কোনো বাধা নেই।

শুধু স্বপ্ন থাকলে হবে না, তা জয় করার একটা অদম্য ইচ্ছা বা শক্তি থাকতে হবে। তবেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

 


মন্তব্য