সরকারি চাকরির আর দরকার নেই-333309 | নারী দিবস বিশেষ সংখ্যা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


সরকারি চাকরির আর দরকার নেই

বান্দরবানের এক অজপাড়াগাঁর কন্যা তিনি। নিজের শ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে ২০১৩ সালে অর্জন করেন জাতীয় যুব পুরস্কার এবং পরের বছর বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার। মা সিং নু মারমার সাফল্যের গল্প শুনলেন মনু ইসলাম

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি চাকরির আর দরকার নেই

১৯৮৯ সালের ১২ জানুয়ারি বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের চেমি ডলুপাড়ায় আমার জন্ম। কিছুটা পড়াশোনা করলেও চাকরিতে না গিয়ে বাবা মং শৈ চিং গ্রামেই থাকতেন। মা সাথুই হ্লা অক্ষরজ্ঞানহীন নিছক গৃহিণী। কিন্তু কষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে এই মা-বাবা আমাকে পাঠান গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে ভর্তি হই বান্দরবান শহরের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সাফল্যের সঙ্গে শেষ করি সেই লেখাপড়াও। মা কিছুটা নারাজ থাকলেও কৃষির প্রতি ঝোঁক থাকায় বাবা আমাকে রাঙামাটি কৃষি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটে ভর্তি করিয়ে দেন। ২০১১ সালে কৃষি ডিপ্লোমা পাস করি।

পড়াশোনা শেষ করার আগেই ২০১০ সালে রাঙামাটির কাপ্তাই এলাকার আদিবাসী যুবক এ নু মংকে বিয়ে করি। শিক্ষাজীবন শেষে স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসি নিজ গ্রামে। দুই বছর আগে বাবা মারা যান। বাড়িতে থাকেন শুধু মা।

এ সময় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কোর্সের কথা জানতে পেরে আমি এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। বান্দরবান যুব প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আড়াই মাসের একটি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিই।

পড়াশোনা শেষ। এবার জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার পালা। ২০১২ সালে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বাড়ির পাশের ৫ শতক জমিতে উন্নত পদ্ধতির কৃষি আবাদের প্রস্তুতি নিই। স্ট্রবেরি চাষ সম্পর্কে দারুণ আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু চারা পাব কোথায়? তা ছাড়া চারার জন্য টাকাও দরকার, অথচ হাত একেবারে খালি। এ রকম পরিস্থিতিতে স্বামীর হাতে গলার হার খুলে দিয়ে বলি, বিক্রি করে টাকা এনে দিতে। একসময় টাকাও আসে। এবার দরকার চারা। ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের প্রিয় শিক্ষক তপন স্যারের শরণাপন্ন হই। অনেক চেষ্টা করে তিনি রাজশাহী থেকে ৩৬টি স্ট্রবেরি চারা সংগ্রহ করে দেন।

সেই চারা থেকে আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে উত্পন্ন করি আরো ৪০ হাজার চারা। সে বছরই ৫০ হাজার টাকার চারা বিক্রি করে হাতে একটা জুতসই পুঁজি জুগিয়ে ফেলি। নিজেদের পাঁচ শতকের পাশের আরো ২০ শতক জমি ভাড়ায় নিয়ে স্ট্রবেরির অবশিষ্ট চারাগুলো লাগিয়ে দিই। কয়েক মাসের মধ্যেই ওই জমিতে ফলে অসংখ্য স্ট্রবেরি।

ফলটি এই এলাকায় নতুন। তাই সবুজ পাতার বুকে লাল রঙের স্ট্রবেরি দেখতে এসে সবাই হতবাক হয়ে যায়। অনেকে ভাবে, লিকলিকে ছোট্ট এই মেয়েটি কী কাণ্ডই না ঘটিয়ে ফেলেছে! যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর হয়ে এ খবর পৌঁছে সরকারের কাছে। ২০১৩ সালের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার যুব পুরস্কারটি ওঠে আমার হাতে। দেওয়া হয় একটি ক্রেস্ট এবং নগদ ৪৫ হাজার টাকা।

পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ার প্রচারে সারা দেশে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর ২০১৪ সালে আমি জাতীয় কৃষি পুরস্কারের জন্য জেলাপর্যায়ে মনোনীত হই। অনেক যাচাই-বাছাই শেষে আসে সেই সৌভাগ্যের দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার হাতে তুলে দেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার। পাই আড়াই ভরি স্বর্ণের মেডেল এবং নগদ ২২ হাজার টাকা।

পুরস্কার পেয়ে আমার উদ্যম আরো বেড়ে যায়। গত বছর সেই ২৫ শতক জমিতে স্বল্পমেয়াদি স্ট্রবেরির পাশাপাশি লাগিয়েছি দীর্ঘমেয়াদি ড্রাগন ফল। তাতেও ফুল ফুটেছে।  ড্রাগন ফলের লালাভ ও গোলাপি রং ছড়িয়ে পড়েছে বাগানজুড়ে।

এ বছর আরো একটি কাজ করেছি। ডলুপাড়া গ্রামের অদূরে কেয়ামলং এলাকায় ৩০ শতক জমি নিয়ে গড়ে তুলেছি বহুমুখী সবজি বাগান। এখন একই মাটির ওপর চার স্তরে ফলছে চার ধরনের সবজি। মাটিতে ১২ মাসি শসা ও টমেটো। এর ওপরের স্তরে পুঁইশাক। তৃতীয় স্তরে তারের মাচায় ঝিঙে এবং সবার ওপরে বাঁশের মাচায় করলা।

সরকারি চাকরির আর দরকার নেই। এখন কৃষিই আমাদের জীবন। কৃষিই আমাদের জীবিকা। আমার স্বামী অন্য বিষয়ে পড়াশোনা করা সত্ত্বেও শুধু আমার কারণে সেও কৃষিকে ভালোবেসে ফেলেছে। এখন দুজনে মিলেই চলছে স্বপ্ন সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা। বেগম রোকেয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেন। আমার আজকের জীবনের আলোকবর্তিকা আমার স্বামী এ নু মং।

নিজেদের জমিতে চাষবাসের পাশাপাশি স্থানীয় একটি এনজিওর হয়ে থানচি এলাকার আদিবাসীদের কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কার পেয়েছি। আমার এবারের লক্ষ্য স্বাধীনতা পুরস্কার। তবে ভাববেন না, নিছক পুরস্কারের লোভেই আমার এই প্রচেষ্টা। সবুজময় স্বদেশ গড়ার প্রত্যয় আমার মধ্যে অটুট, আর সে কারণেই আমি ছুটে চলেছি মাঠের পর মাঠ।

মন্তব্য