‘পাকিস্তানের অধীনে কাজ করব না’-333308 | নারী দিবস বিশেষ সংখ্যা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


‘পাকিস্তানের অধীনে কাজ করব না’

আগে ডেলসহ বিভিন্ন কম্পানিতে নানা পদে কাজ করেছেন। এখন শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে নিজের বর্ণিল জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সোনিয়া বশির কবির

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘পাকিস্তানের অধীনে কাজ করব না’

এককথায় দুর্দান্ত এক শৈশব কাটিয়েছি। শৈশবের বড় একটা অংশ কেটেছে দেশের বাইরে, লন্ডনে। মা-বাবা কখনো বুঝতে দেননি—আমি ‘মেয়ে’। দেশে এসে বান্ধবীদের মুখে শুনেছি, এখানে ছেলেমেয়ের নানা তফাত! আব্বা সব সময় শিখিয়েছেন চ্যালেঞ্জ নিতে, ভয়কে জয় করতে। সেই শিক্ষাটা আজও কাজে লাগে। যে কারণে ছেলেদের জগতেও খুবই কমফোর্টেবল আমি।

প্রাইমারির পাঠ নিয়েছি লন্ডন থেকে। দেশে ফিরে গ্রিন হেরাল্ড স্কুলে ভর্তি হই, ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এরপর ভিকারুননিসা নূন অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক  করি। খেলার সময় খেলা, পড়ার সময় পড়া—এটাই ছিল আমাদের নিয়ম। উচ্চ মাধ্যমিকে ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করি। সম্মিলিত মেধাতালিকায় ষষ্ঠ হয়েছিলাম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু বিয়ের কারণে সেখানে বছরখানেকের বেশি পড়া হয়নি। বর ইহতেশাম কবীর ছিলেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে আমার ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া। ভিকারুননিসায় আমি মানবিক বিভাগের ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্যাচেলর অব সায়েন্সে পড়তে শুরু করলাম। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞানে না পড়লে কেউ বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেসবের বালাই নেই। থাকতাম তথ্যপ্রযুক্তির নগর সিলিকন ভ্যালিতে।

আমি যে আজ এত দূর এসেছি, এটা কেবলই সম্ভব হয়েছে আমার পরিবারের জন্য। দারুণ সাপোর্টিভ ছিল তারা, বিশেষ করে বিয়ের আগে আব্বা আর বিয়ের পর স্বামী। একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, ব্যাচেলর পড়ার সময় আমার ছেলে হয় আর এমবিএর সময় মেয়ে। তারা পাশে ছিল বলেই পড়াশোনা, চাকরি, সংসার—সব সামলানো গেছে।

ব্যাচেলর পড়ার সময় মাথায় চাকরির পোকা ঢোকে। চাকরি করলে পড়াশোনা লাটে উঠবে—এই ভয়ে পরিবার চাইছিল যেন আগে পড়াশোনাটা শেষ করি। তারপর চাকরিবাকরি। তাদের সঙ্গে ডিল করি—আপাতত জয়েন করি। পড়াশোনার ক্ষতি হলে ছেড়ে দেব।

সিলিকন ভ্যালিতেই একটি কম্পানিতে ফিন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করি। কিছুদিন পর সান মাইক্রোসিস্টেমে যোগদান করি ফিন্যান্স কন্ট্রোলার হিসেবে। প্রায় আট বছর সেখানে কাজ করি। এরপর গন্তব্য মাতৃভূমি—বাংলাদেশ।

দেশে এসে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে আমরা টেকনোলজিতে যোগ দিই। সেখানে বছর তিনেক কাটানোর পর মাইক্রোসফটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘নিউ মার্কেট’-এর ডিরেক্টর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করি। সেখান থেকে কিছুদিন পর কম্পিউটার নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান ডেল-এ যোগ দিই। ডেল অবশ্য অনেক আগ থেকে আমাকে অফার দিচ্ছিল। কিন্তু তখন বাংলাদেশে ডেলের কার্যক্রম দেখভাল করা হতো পাকিস্তান থেকে। আমি বলেছিলাম, ‘পাকিস্তানের অধীনে কাজ করব না। বাংলাদেশে অফিস খোলো, যোগ দেব।’ বাংলাদেশে অফিস চালু হলে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডেলে যোগদান করি। এখন কাজ করছি বাংলাদেশে মাইক্রোসফটের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে।

কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ভয় পাই না। একটা ঘটনা বলি। যুক্তরাষ্ট্রে অন ক্যাম্পাস নিয়োগ হয়। এমবিএ শেষ করার পর আইবিএম কম্পানি আমাকে নির্বাচিত করে। ওদের হেডকোয়ার্টার্সে গেলাম ইন্টারভিউ দিতে। ভাইভা বোর্ডে চার-পাঁচজন কালো স্যুট পরা পুরুষ। আমাকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করল। জবাব দিলাম। একপর্যায়ে সেলারির অফার দিয়ে বলল, ‘উই আর ডান।’ আমাকে কিন্তু কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। মেজাজ বিগড়ে গেল। বললাম, ‘তোমাদের জানার ইচ্ছা ছিল, জিজ্ঞেস করেছ, জেনেছ। কিন্তু তোমাদের সম্পর্কে আমারও তো কিছু জানার থাকতে পারে। আই এম নট ডান।’ তারা আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে দিল না। অগত্যা বললাম, সেলারি আরো ২০ পার্সেন্ট না বাড়ালে তোমাদের অফার একসেপ্ট করব না। তারা ‘না’ সূচক জবাব দিল। হ্যান্ডশেক করতে করতে বললাম, ‘আই এম নট হিয়ার টু নেগোশিয়েট।’

কাজের ব্যাপারে আমি খুবই আন্তরিক। নারী না পুরুষ কার অধীনে কাজ করছি বা কারা আমার অধীনে কাজ করছে, এটি কখনো ভাবিনি। আর আমার মনে হয়েছে, এ দেশের পুরুষরা নারীদের ব্যাপারে অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল। কাজের ক্ষেত্রে যেকোনো ঝুঁকি নিতে রাজি। বাবার কাছ থেকে শিখেছি—কোনো কিছুকেই পরোয়া করতে নেই। মাই কারেজ ইজ মাই স্ট্রেন্থ অ্যান্ড অলসো মাই উইকনেস। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে...।’ রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানই আমাকে প্রেরণা জোগায়। আমার কাছে সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। আমি মনে করি, আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মানই নারীদের এগিয়ে নিতে পারে।

সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প ঘোষণা করেছে। গ্রামাঞ্চলেও মানুষ এখন কম্পিউটার-ল্যাপটপ ব্যবহার করছে। কিন্তু মুশকিল হলো, এখন সেখানে কোনো কিছু নষ্ট হলে ঢাকায় ছুটতে হয়। ভবিষ্যতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। আমার টার্গেট কয়েক হাজার সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার বানানো। যেন তারা গ্রামে বসেই মানুষকে সেবা দিতে পারে।

মন্তব্য