kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


‘গল্পে ভরপুর জীবন আমার’

এসএ গেমসে দুটি সোনা জয়ের দৌলতে এখন সবার কাছে পরিচিত মুখ মাহফুজা খাতুন শিলা। শিলার শিকড় থেকে শিখরে ওঠার সেই গল্পই শুনলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘গল্পে ভরপুর জীবন আমার’

 

নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। বাবা কিছুই করতেন না।

সংসারের যাবতীয় বোঝা পড়েছিল মায়ের ঘাড়ে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, সংসার তো বটেই, হাঁস-মুরগি, গরু—সব একাই সামলাতো মা।

আমার প্রথম স্কুল নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমরা দুই বোন স্কুলে যেতাম। আপু আমার চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড়। তিনি সব বুঝতেন। আমাদের পড়াশোনার পেছনে খুব একটা খরচ ছিল না। পরীক্ষার ফির মতো যেসব খরচ একেবারে না দিলেই নয়, সেগুলো দিলেই চলত। কারণ স্কুলটা বাবার দেওয়া জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

স্কুলে প্রায়ই খেলাধুলা হতো। পুরস্কার হিসেবে কাচের কিংবা মেলামাইনের প্লেট, জগ, গ্লাস ইত্যাদি দেওয়া হতো। সঙ্গে ৫০ থেকে ২০০ টাকা। মূলত প্লেট, গ্লাস—এগুলোর পাশাপাশি টাকার জন্য খেলতাম! অনেকগুলো ইভেন্ট হতো। সবগুলোতে অংশ নিতে চাইতাম। ‘তুই একাই সব খেললে বাকিরা কী খেলবে’—বলে বাদ সাধতেন স্যাররা। মনে পড়ে, আমি তখন ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ি। আমার কারণেই সেবার স্যাররা নিয়ম করে দিলেন, একেকজন তিনটির বেশি ইভেন্টে অংশ নিতে পারবে না। সেবার ১০০ ও ২০০ মিটার লংজাম্প ও দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলাম। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছি ৩০০ টাকা।

এর মধ্যে খবর এলো, উপজেলায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে। উচ্চতা ৪ ফুট ৮ ইঞ্চির কম হলে অংশ নেওয়া যাবে। মাপে টিকে গেলাম। এক দিন পরেই প্রতিযোগিতা। কিন্তু ৩০০ টাকা পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা আমি সব ভুলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। প্রতিযোগিতার দিন হেড স্যার (আবদুল কাদের) বাড়িতে এলেন আমাকে খুঁজতে! মনে পড়ে, স্যারের সাইকেলে চড়েই অভয়নগর এলাম। দেখি, সাঁতার ছাড়া বাকি সব ইভেন্ট শেষ হয়ে গেছে!

স্যার বললেন, ‘এত কষ্ট করে এলাম। চল গোসলটা করেই যাই। ’ সাঁতার যে একটা খেলা, তখন সেটা জানতামই না। স্যার অভয় দিলেন। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘যা হওয়ার হবে, পুকুরে যেতাবে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাস, এখানেও সেভাবেই যাবি। তবে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। ’ এরপর কিছু কৌশল শিখিয়ে দিলেন। সেবার ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে প্রথম হলাম। উপজেলায় প্রথম হওয়ার সুবাদে জেলায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করি। কিন্তু যাওয়া-আসার খরচ তো নেই! স্কুল কমিটি টাকা দিল। যশোর জেলার পর খুলনা বিভাগেও প্রথম হয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করি। সেবারও গ্রামের (পাঁচ কবর) লোকজন যে যার মতো করে চাঁদা দিল। স্যারের সঙ্গে ঢাকায় এলাম। চূড়ান্ত পর্বে দ্বিতীয় হলাম। এরই মধ্যে কোচ আবদুল মান্নান (বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন, যশোর জেলার সভাপতি) স্যারের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি সাঁতারের অ আ ক খ শিখিয়ে দিলেন।

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার আগে সপ্তাহখানেকের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চলত। তখন থাকতাম যশোরের সরকারি শিশু সদনে। এ রকম প্রশিক্ষণের সময় একবার বাবা গ্রামের বাড়ি থেকে দেখতে এসেছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমার শখের মুরগিটাই বাবা বেচে দিয়ে এসেছেন পথের খরচ জোগাতে। শুনে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলাম। কোচ সান্ত্বনা দিলেন। আরেকবার তো স্রেফ অর্থকষ্টে শিশু একাডেমি থেকে পাওয়া দুটি সোনার পদক বেচে দিয়েছিলেন মা।

এরপর ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বে প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল পেলাম। এরই মধ্যে সাঁতারের নেশা পেয়ে বসে আমাকে। পাশের বাড়ির পুকুরে নিয়মিত সাঁতার কাটতাম। জলে নামলে উঠতে মন চাইত না। এসবের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। যে প্রাইজমানি পেতাম সেটাই ছিল সংসারের একমাত্র সহায়।

২০০২ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিলাম। সেবার ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে তৃতীয় হই। বাংলাদেশ গেমসেই আমার খেলা মনে ধরে বিকেএসপির কোচ সোলায়মান হোসেনের। ওই বছরই বিকেএসপিতে এলাম। তিন মাসের ট্রেনিং শেষে ভর্তির জন্য নির্বাচিতও হলাম। কিন্তু ভর্তির জন্য এত টাকা পাব কই? এগিয়ে এলেন এলাকার ব্যবসায়ী রেজাউল বিশ্বাস ভাই। ভর্তির টাকা দিলেন। ভর্তির পরও পাশে ছিলেন। এমনকি প্যারেন্টস ডেতে মা-বাবাকে এলাকা থেকে আসার ভাড়াটা পর্যন্ত তিনি দিয়ে দিতেন। বিকেএসপিতে দারুণ কিছু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। আর পেয়েছি লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিশ্রমের শিক্ষা। ২০০৮ সালে বিকেএসপি থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। এর মধ্যে আনসার-ভিডিপিতে চাকরি হয়। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করলে কর্তৃপক্ষ জানাল, এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় টিমে খেলতে হবে। কিন্তু বেঁকে বসল আনসার-ভিডিপি। পরে বিশ্ববিদ্যালয় দলকেই বেছে নিলাম। কিছুদিন আগে মাস্টার্স শেষ হয়েছে। ২০১৩ সালে চুক্তিভিত্তিক চাকরি নেই নৌবাহিনীতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা—আমার ক্যাম্পাস জীবনটা ছিল এমনই।

২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো সাউথ এশিয়ান গেমসে অংশ নিই। সেবার ৫০ ও ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে দুটি ব্রোঞ্জ পাই। একই প্রতিযোগিতায় ২০১০ সালে সিলভার আর এবার তো স্বর্ণপদক পেলাম।

আগেরবার সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছিল। তাই নার্ভাসনেস কাটছিল না। তবে পুল দেখেই আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো। কোচ পার্ক তেগুনকে বললাম, ‘হয় সোনা জিতব, নয় মরে যাব। ’ ‘তুমি পারবে’ বলে অভয় দিলেন কোচ। পুলে নেমে মনে হলো, ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছি।

এবার কোচ পার্ক তেগুন, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সাইয়েদ রেজা, ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সভাপতি মিকু স্যারসহ (আশিকুর রহমান) অন্য কর্মকর্তারা বেশ আন্তরিকতার সঙ্গেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন।

আমার এখন একটাই লক্ষ্য, সামনে ব্রাজিলে অলিম্পিক গেমস। সেখানে ওড়াতে চাই লাল-সবুজের পতাকা।


মন্তব্য