‘কে হতে চায় সালমা?’-333306 | নারী দিবস বিশেষ সংখ্যা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭

‘কে হতে চায় সালমা?’

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের তরুণ কোনো সদস্য কিংবা বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়দের কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রিয় খেলোয়াড় কে? সে ক্ষেত্রে বেশির ভাগের উত্তর হবে একটাই—মাশরাফি বিন মর্তুজা। একই প্রশ্ন যখন বাংলাদেশের মহিলা দলের নবীন সদস্যদের করা হয়, উত্তর আসে—সালমা খাতুন। সালমার এই সাফল্যের গল্প শুনলেন সামীউর রহমান

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘কে হতে চায় সালমা?’

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মেয়েদের ঘরের বাইরে পুরুষ সঙ্গী ছাড়া যাওয়াটাই যেখানে গুরুতর অবাধ্যতার শামিল, সেখানে একটি মেয়ে দিব্যি খেলে বেড়াচ্ছে এবং সেটা অন্য অনেক ছেলের সঙ্গে—এই দৃশ্য মানতে রাজি হবেন না কোনো সমাজপতিই। আমাকেও ক্রিকেটার হয়ে উঠতে তাই বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক। টিপ্পনী, কটুবাক্য কম শুনিনি। গুরিন্দর চাড্ডা নামে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক পরিচালক তাঁর ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’ ছবিতে দেখিয়েছিলেন এক ব্রিটিশ ভারতীয় তরুণীর পারিবারিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প। আমার জীবনকথা শুনলে নিঃসন্দেহে আরো একটি সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি হয়ে যাবে তাঁর মাথায়ও।

১৯৯০ সালের ১ অক্টোবর খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়ন পরিষদের মিলকী দেয়াড়া গ্রামে জন্ম আমার। বাবা জয়নাল সরদার, মা ফরিদা খান। দুই ভাই ও দুই বোন আমরা। সবার ছোট আমি। আমার বাবা  দিনমজুর ছিলেন। আট বছর বয়সেই তাঁকে হারাই। ভিটাবাড়ি ছাড়া আবাদি কোনো জমিজমা ছিল না। আর্থিক অনটনের কারণে ভাইবোন কেউ বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি। আমিও ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে আর এগোতে পারিনি। বাবার মৃত্যুর পর মা ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণের জন্য মাছ কম্পানিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে টাকা দিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া শুরু করি একসময়। খেলাধুলায় প্রবল আগ্রহের কারণে আমিসহ আমার পরিবার নানা দিক দিয়ে লাঞ্ছিত ও মানসিকভাবে নিযার্তিত হয়েছি। তবুও সব বাধাবিপত্তি পাশ কাটিয়ে খেলাধুলা চালিয়ে গিয়েছি। কখনো মনোবল হারাইনি।

ক্রিকেট খেলতাম; কিন্তু কখনো ভাবিনি যে বাংলাদেশে মহিলা ক্রিকেট দল হবে। বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল হওয়ার খবরটা প্রথমে আমি দেখলাম একটা পত্রিকায়। তখন আমার মামাতো ভাই তার এক বন্ধুকে বলে আমাকে ট্রায়ালে নিয়ে যায়। সেখানে আরো অনেক মেয়ে ছিল। কিন্তু প্র্যাকটিসে প্রথমেই আমি কোচের চোখে পড়ে যাই। তাঁরা বলেন, একটা মেয়ে ছেলেদের মতো এত ভালো খেলতে পারে কিভাবে? সেখান থেকেই আমার ক্রিকেট খেলা শুরু।

তখনো কি জানতাম যে নতুন মহিলা ক্রিকেটার খোঁজ করার সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিজ্ঞাপনের ভাষা হবে ‘কে সালমা হতে চাও’।

২০০৭ সালে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয়। ডানহাতি ব্যাটসম্যান ছিলাম। সঙ্গে অফব্রেক বলও করতাম। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হই। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জন্য আমিই ছিলাম প্রথম নারী ক্রিকেটার। সেটা ছিল জীবনের অন্যতম সেরা দিন। এর সবই সম্ভব হয়েছে আমার কোচ এহসান স্যারের জন্য। আজকে এত দূর পর্যন্ত এসেছি তাঁর সাহায্য পেয়ে পেয়ে। তিনি সব সময় বলতেন, অনেক কথা বলা যায়; কিন্তু মাঠে কাজ করাটাই আসল। ঠাণ্ডা মাথায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে অধিনায়ককে।

২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর আয়ারল্যান্ড মহিলা ক্রিকেট দলের বিপক্ষে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। অভিষেক ম্যাচে দারুণ খেলেছিলাম। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ মহিলা দল ৮২ রানে জয়লাভ করে। অভিষেকেই ১০ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে ৩ উইকেট পাই। ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট ডাবলিনে আয়ারল্যান্ড দলের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেক। টি-টোয়েন্টি অভিষেকেও পারফরম্যান্স ভালো ছিল, ৫৩ বলে ৪১ রান। এ ছাড়া ৪ ওভারে ১১ রান দিয়ে ১ উইকেট পেয়েছিলাম। আমার খেলার স্বীকৃতিও মিলেছে। আইসিসির র্যাংকিং অনুযায়ী মহিলা ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টির সেরা অলরাউন্ডার হয়েছিলাম। সেই সঙ্গে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেরা বোলারের খেতাবটিও আমার দখলে ছিল। টানা সাত বছর দেশের অধিনায়ক ছিলাম। খেলার সূত্রে দেখা হয়েছে ইংল্যান্ড, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তানসহ অনেক দেশ।

আমি এভাবেই আরো অনেক দিন খেলে যেতে চাই। দেশের মানুষের ভালোবাসা পেতে চাই। এক নামে সবাই আমাকে চেনে—এটা খুব ভালো লাগে। খুলনায় গিয়ে যেকোনো অটোরিকশাচালককে ‘সালমাদের বাড়ি যেতে চাই’ বললে নিয়ে আসে আমাদের বাড়ি। এটা সম্ভব হয়েছ আমার ক্রিকেট সাফল্যের কারণেই। আমার নামে ফেসবুকে অনেক পেজ ও অ্যাকাউন্ট আছে। এর কোনোটিই আমি ব্যবহার করি না। ফেসবুকে অহেতুক সময় নষ্ট হয়, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। অবসর মিললে টিভিতে খেলা দেখি। অন্যের খেলা দেখেও শেখা যায় অনেক।

মন্তব্য