kalerkantho

দ্বিধা

রিফাত রহমান পাপড়ি

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দ্বিধা

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্তী

‘ম্যাম, মেন্যুটা কি নিয়ে যাব?’ এশা চোখ গরম করে ওয়েটারের দিকে তাকাল।

‘নিয়ে যান। ’ এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ওয়েটার মেন্যু ফেরত চাইতে এসেছে। ছুটির দিনের মধ্যদুপুর। রেস্টুরেন্ট খাঁ খাঁ করছে। ইউনিভার্সিটি এলাকার রেস্টুরেন্টগুলো ছুটির দিন খালি থাকে। এশা আজকে এসেছে অয়নের সঙ্গে দেখা করতে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে, ইউনিভার্সিটি খোলা থাকুক আর বন্ধ থাকুক, এই চায়নিজ রেস্টুরেন্টেই সে আসবে। ওয়েটারগুলো সব পরিচিত। অথচ তাদের আচরণ অদ্ভুত। কখনো বিনয়ে থুঁতনি বুকের সঙ্গে লাগিয়ে রাখে, কখনো বারবার টেবিলের চারপাশে ঘুরে বিরক্ত করে।

এখন বিরক্ত করছে ভেবেই এশার মন খারাপ হলো। আজকে তার প্রাইভেসি দরকার। এশা অস্থির হয়ে হাতঘড়ি দেখল। ২৫ মিনিট লেট। দেরি করার ছেলে অয়ন না। আজকেই কেন সে দেরি করবে? আজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন যে সাময়িকভাবে এশার ক্ষুধা-তৃষ্ণা চলে গেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অয়নের সঙ্গে তার ভয়াবহ ঝগড়া চলছে। আজকে শেষ দিন। এশা ঠিক করেছে, আজকের পর থেকে এটা নিয়ে কোনো কথা বাড়াবে না। হয় অয়ন তার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে, না হলে আলাদা হয়ে যাবে। কোনো মধ্যম পন্থা নেই। অন্যমনস্ক হয়ে এশা টিভির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করছিল। টিভি সাইলেন্ট করে রাখা। শব্দহীন অ্যাডে মানুষের হাত-পা ছুড়ে নাচানাচি হাস্যকর লাগে। দরজা খোলার শব্দে সে ঘুরে তাকাল। অয়ন বিরক্ত মুখে ঢুকছে। কড়া রোদে মুখ লাল হয়ে আছে। টকটকে লাল একটা টি-শার্ট পরে আছে। তাকে দেখাচ্ছে পাকা টমেটোর মতো। এশা হাত নেড়ে ডাকল। সে গম্ভীর মুখ করে আসছে। এশার কেন জানি খুব অদ্ভুত লাগছে। গত তিন বছরে সে অনেকবার অয়নকে এভাবে আসতে দেখেছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, এই শেষ দেখা। অজান্তেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অয়নের সঙ্গে এশার পরিচয় চার বছর আগে। নভেম্বরের মাঝামাঝি যমুনা ফিউচার পার্কে একটা Comicon হয়েছিল। এশা সেখানে ‘Game of Thrones’-এর নায়িকা ডিনারিস টারগেরিয়ান সেজে কসপ্লে করেছে। প্রগ্রামের দিন সে যখন হেঁটে যমুনা ফিউচার পার্কে ঢুকছে তখন হঠাৎ কথাবার্তা ছাড়া ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। ফিউচার পার্কের এক নম্বর গেটে ঢোকার রাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটতে হয়। কোনো ছাউনিও নেই, যেখানে অপেক্ষা করা যায়। ডিনারিসের লম্বা ব্লন্ড চুলের কোনো উইগ না পেয়ে এশা একটা কালো উইগ পুরোটা সাদা রং করে পরেছিল। নরমাল water colour, বৃষ্টির পানিতে পুরো ধুয়ে যাবে। এশা বুঝতে পারছিল, ফিউচার পার্কের গেটে যাওয়ার পর তাকে দেখাবে কালো চুলের বাঙালি খালিসি, সারা গায়ে ভূতের মতো সাদা রং। সবাই হা হা করে হাসবে। এমন অসহায় মুহূর্তে হঠাৎ পেছন থেকে ছাতা ধরে অয়ন হাজির হলো। ‘আপু, ছাতা নিয়ে ঠিকভাবে দাঁড়ান, আপনার চুলের ওপরের অংশ অলরেডি অ্যাশ হয়ে গেছে। ’ সে এশাকে গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে উধাও হয়ে গেল, ঠিক করে থ্যাংকসও দেওয়া হলো না। এর এক মাস পর এশা তাকে একটা রেস্টুরেন্টে দেখল। ফ্রেন্ডদের সঙ্গে বসে ছবি তুলছে। এশাকে প্রথমে সে চিনতে পারেনি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘ওহ্, খালিসি। আরে, তোমাকে তো কালো চুলে আরো pretty লাগে!’ অয়ন কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে আছে। ওয়েটারের খোঁজে একটু পর পর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। এশার মনে হলো, সে তৃষ্ণার্ত। সে ব্যাগ খুলে পানির বোতল এগিয়ে দিল।

তিন বছর দীর্ঘ সময়। সপ্তাহে চার দিন করে হিসাব করলে ৫৭৬ বার অয়ন এভাবে তার সামনে এসে বসেছে। অথচ আজকে এশার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে; যদিও অয়ন কিছু বলেনি। কিন্তু সে জানে, এ বসাই শেষ বসা। আর কোনো দিন রাজপুত্রের মতো রূপবান এ তরুণের সামনে সে সেজেগুজে বসে থাকবে না। আহ্লাদ করে বলবে না, ‘অ্যাই, আমার দিকে তাকাও না কেন?’ চুলে হাত বুলিয়ে না দিলে আর অভিমান করবে না। অনেক ভালোবাসার কথা, যা এখনো জমা আছে, আর বলা হবে না।

অয়ন বলল, ‘শুরু করব?’ এশা সোজাসুজি তার চোখের দিকে তাকাল, ‘তুমি জানো, আজকে তোমার শেষ সুযোগ। বারবার ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করবে না, বলো, and make it short and exactly to the point.’ ‘ঠিক আছে, আমার main problem হলো career. যদি এখনই বিয়ে করে ফেলি, তাহলে পড়ালেখায় অনেক ক্ষতি হবে। ’ এশা জানত, সে এভাবেই শুরু করবে। সে অয়নকে মাঝপথে থামিয়ে দিল।

‘অয়ন, আমি জানতাম তুমি আবার একই প্যাঁচাল পাড়বে। আমি ত্বধফু হয়ে এসেছি। I have a letter for you, চুপচাপ এটা পড়ো, story খতম। ’ অয়ন বিরক্ত মুখে চিঠিটা নিল। পড়ার কোনো ইচ্ছা আছে বলে মনে হচ্ছে না। “অয়ন, গত তিন বছরে অনেকবার আমি এই চিঠিটা লিখতে চেয়েছি; কিন্তু পারিনি। তিন বছর দীর্ঘ সময়। তবে কাউকে পুরোপুরি জানার জন্য সময়টা খুব বেশি না কিন্তু। অনেকেই বলে, মানুষ চিনতে সময় লাগে না। আমার কিন্তু এটা মনে হয় না। আমার ধারণা, কিছু মানুষকে চেনার জন্য সারা জীবনও যথেষ্ট নয়। তুমি যে সেই দলের, এটা বুঝতে আমার তিন বছর লেগে গেল। আচ্ছা, চিঠিটা আমি গুছিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। একটা একটা করে বলি। প্রথমে বলি আমাদের সমস্যা নিয়ে। আমাদের ঝামেলা শুরু হয়েছে দুই মাস আগে, যখন প্রথমবার আমার বাসা থেকে বিয়ের জন্য প্রেসার দেওয়া শুরু করল। তোমার সঙ্গে গত তিন বছর আমি অ-নে-ক সুখী ছিলাম না এটা সত্যি; কিন্তু তোমাকে বিয়ে করা নিয়ে কোনো দ্বিধা আমার ছিল না। তোমার কোনো সমস্যা থাকবে, এটা কোনো দিন আমি ভাবিনি। কারণ আমার ধারণা ছিল, আমাদের মধ্যে তুমিই বেশি সংসারপাগল। যখন তোমাকে বিয়ের কথা বললাম, অদ্ভুত শ্যেনদৃষ্টিতে তুমি আমাকে দেখলে, সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝে গেলাম, এই ছেলে আমাকে চায় না। বিয়ে নিয়ে কত কোটি অজুহাত তুমি দিয়েছ, তা লিখতে গেলে চিঠি শেষ হবে না। আমি ধৈর্য ধরে তোমার প্রতিটি অজুহাত মেনে নেওয়ার পর তুমি যখন আর কিছুই না পেয়ে সত্যি কথা বলে দিলে, আমি কিন্তু অবাক হইনি। আমি জানতাম, আমার জীবনে তুমি রোবট বয়ফ্রেন্ড, মানবিক আবেগের ঊর্ধ্বে। আমাদের অনেক বড় সমস্যার অতি ক্ষুদ্র অংশ বিয়েসংক্রান্ত ঝামেলা। প্রথম থেকেই তোমার মনে কোনো প্রেম নেই। এটা আমি কখনোই ঠিক করে বুঝতে পারিনি। কারণ যখনই তুমি আমাকে প্রচণ্ড কষ্ট দিয়ে কিছু করেছ, তার পরপরই এমন অদ্ভুত কিছু করতে যে আমি ভুলেই যেতাম একটু আগে আমার সঙ্গে ভয়াবহ অন্যায় হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। একবার তুমি আমাকে বললে, তোমার বন্ধুর ভাইয়ের বিয়ের দাওয়াতে আমাকে নিয়ে যাবে। এর আগে আমরা কখনো একসঙ্গে এমন formal দাওয়াতে যাইনি। আমি excited হয়ে দুই দিন আগে থেকে শাড়ি গুছিয়ে রাখলাম, এক দিনের মধ্যে নতুন ব্লাউজ বানালাম, অনেক ঝামেলা করে বাসার পারমিশন জোগাড় করলাম। বিয়ের দিন বিকেল থেকে সেজেগুজে বসে আছি। সন্ধ্যা ৬টায় তোমার আমাকে নিতে আসার কথা। রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ক্লান্ত হয়ে আমি শাড়ি খুলে মুখ ধুয়ে ফেললাম। সারা দিন কল দিয়ে তোমার ফোন বন্ধ পেয়েছি। ১০টায় facebook-এ ঢুকে দেখি, বিয়েবাড়িতে বন্ধুদের সঙ্গে তোমার হাস্যোজ্জ্বল ছবি। এই ভয়ংকর অন্যায়ের পর তোমার সঙ্গে আমি যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলাম। এক সপ্তাহ পর একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল, মনে আছে? আমি মন খারাপ করে বারান্দায় ভিজছিলাম। হঠাৎ সাইকেলে তোমাকে একগাদা ফুল নিয়ে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার সব রাগ-অভিমান ধুয়ে গেল। সেটা একটা বেশি সুন্দর দিন ছিল, সারা দিন তোমার সাইকেলের পেছনে বসে ঘুরেছি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে টং দোকানে চা খেয়েছি, রমনা পার্কের বেঞ্চে বসে দীর্ঘ সময় ছোট বাচ্চাদের বৃষ্টিতে ভিজতে দেখেছি। একবারও আমার মনে পড়ল না, ঠিক এক সপ্তাহ আগে এমনই একটা বিকেল কী অনিশ্চয়তায় আমি পার করেছি। তোমার ফোন বন্ধ, বাসার সবাই একটু পর পর এসে জিজ্ঞেস করছে দাওয়াতে যাচ্ছি না কেন। চোখের পানিতে লেপ্টে যাওয়া কাজলের ওপর সাবধানে face powder ঘষেছি। ভালোবাসার বৃষ্টিস্নানে তোমার প্রতি সব দ্বিধা বারবার ধুয়ে-মুছে গেছে। তুমি আমাকে কখনোই ভালোবাসোনি, অয়ন। সত্যি কথা বলতে কি, আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা আর একটা সিগারেটের জন্য তোমার ভালোবাসা একই জিনিস। কাউকে ভালোবাসার জন্য যে হৃদয় প্রয়োজন তা তোমার নেই। আমি মোহাচ্ছন্নের মতো তোমার মায়ায় বাঁধা পড়েছিলাম। নানাভাবে তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। যখন আমার বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু করল, তোমার কোনো ধারণাই নেই আমার কতটা অসহায় লেগেছে। কারণ দুই মাস আগেই আমি আজকের এই দিন কল্পনা করেছি। আমি ভালো করেই জানতাম, আমাদের প্রেমের প্রথম চ্যালেঞ্জেই তুমি পেছনের দরজা দিয়ে পালাবে। এ জন্য আমি এখন বিস্মিতও নই যে কোনো solution ছাড়াই তুমি শেষবারের মতো আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ।

আজকে বাসায় গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটে স্বাভাবিকভাবে লিখবে, ‘দোস্ত, পুরা ব্র্রেক আপ। প্যারা বন্ধ। ’ একদমই যে আমাকে মিস করবে না, তা না। তোমার নতুন প্রেমিকা যখন বারবিকিউ চিকেন বানাতে পারবে না তখন মনে মনে ভাববে, ‘ইস, আগেরটা পারত। ’ কিংবা বন্ধুরা গ্রুপ চ্যাটে আমার চেয়ে কম সুন্দর কোনো মেয়েকে নিয়ে মাতামাতি করলে ভাববে, ‘উফ্, এর চেয়ে সুন্দর মেয়ে আমি ডেট করেছি। ’ তোমার সব অনুভূতি আমার চেহারা আর রান্নার skill-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাসায় যাওয়ার সময় রিকশায় পেছন ফিরে তোমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকার মর্ম তুমি বুঝবে না। গত তিন বছরে গভীর রাতে পাঠানো অদ্ভুত texts তোমার কাছে ছেলেমানুষিই মনে হবে। তিন বছরের প্রেমিকার সঙ্গে ব্রেক আপ আর তিন মাসের প্রেমিকার সঙ্গে ব্রেক আপ তোমার কাছে একই বস্তু। যন্ত্রের জন্য সবই সমান।

চিঠি শেষ করে আমার দিকে তাকালে তুমি দেখতে পাবে, আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছি। বিদায়বেলায় আমার কান্নাভেজা চোখ দেখার যোগ্যতাও তোমার নেই। দয়া করে শেষবার আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বিদায় হয়ে যাও। দোয়া করি, অনেক ভালো রেজাল্ট করো সারা জীবন। যে দোহাই দিয়ে আমাকে হাসিমুখে sacrifice করলে, অন্তত সেটা যেন বৃথা না যায়। রোবটমানব, good bye.” এশা কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুলে হাতের স্পর্শ পেল। তারপর পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল।

অয়ন Floor-6-এ ঢুকে একটু চমকে গেল। এরা decoration বদলে ফেলেছে। আগের চেয়ে অনেক সুন্দর লাগছে এখন। সে ফোনে সময় দেখল। ৪টা বাজে, রুবাবার আসার কথা সাড়ে ৪টায়। টাইমলি কাজ করা অয়নের অভ্যাস। আজকে রুবাবার সঙ্গে দ্বিতীয় দিন দেখা করতে এসেছে। লেট করতে চায় না। কোনার দিকে একটা সোফায় রুবাবাকে বসে থাকতে দেখে অয়ন বিস্মিত হলো। ‘আরে, কখন এসেছ?’ ‘sorry, আগে এসে তোমাকে ভড়কে দিলাম। ’ ‘আরে নাহ্। খুশি হয়েছি। কতক্ষণ বসে আছ?’ ‘10 minutes.’ ‘Did you get bored?’ ‘না না, সধমধুরহব পড়েছি এতক্ষণ। ’ খুশিতে রুবাবা ঝলমল করছে। নীল জামায় মেয়েটাকে পরির মতো লাগছে। কিন্তু এশার কাছে এই মেয়ে কিছুই না। এশা পরির চেয়েও সুন্দর। এশার চিন্তা মাথায় আসায় অয়ন একটু অস্বস্তিতে পড়ল। রুবাবার দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘You look very pretty by the way.’ ‘Thank you, বসো। দাঁড়িয়ে আছ কেন?’ বসতে বসতে অয়ন লক্ষ করল, মেয়েটা পা নাচাচ্ছে। এশা পা নাচানো খুবই অপছন্দ করত। এখন বোঝা যাচ্ছে কেন। দৃশ্যটার মধ্যে অসুন্দর একটা ব্যাপার আছে। অয়নের দিকে তাকিয়ে রুবাবা বলল, ‘মেন্যু দিতে বলেছি। এখানে তোমার প্রিয় খাবার কী?’ মেয়েটার চোখ বড় বড়। এশার চোখ এর চেয়ে ছোট, কিন্তু অনেক বেশি সুন্দর। এশা যা-ই করে, তার চোখে ছায়া পড়ে। কথাটা কোনো দিন বলা হয়নি। আর কোনো দিন মনে হয় বলাও হবে না। এশাকে সে শেষবার দেখেছে সাত মাস আগে সেই রেস্টুরেন্টে। চিঠিটা এখনো পকেটে নিয়ে ঘুরছে। কেন জানি ফেলতে পারে না। মানিব্যাগে রয়ে গেছে। এশা এখন কেমন আছে? এখন কি রাতে একা ঘুমাতে ভয় পায়? ভয় কাটাতে কাকে ফোন করে? কতক্ষণ এসব ভাবছিল মনে নেই, কাঁধে মৃদু ঝাঁকুনিতে সে সংবিৎ ফিরে পেল। রুবাবা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, ‘কী ভাবছিলে তুমি? কতক্ষণ ধরে কথা বলছি। ’ ‘ওহ্,sorry, কী বলছিলে?’ ‘সেটাও শুনতে পাওনি? বলছিলাম prawn curry এত ঝাল, আমার সর্দি লেগে যায়। ’ ‘ও আচ্ছা। ’ আরো দুই ঘণ্টা কিভাবে কাটল অয়নের মনে নেই। একটু পর পর চিন্তায় এশা চলে এলো। গল্পের মাঝখানে একটু পর পর অবিশ্বাসের স্বরে ‘সত্যি!’ বলে ওঠা এশার অভ্যাস ছিল। আরেকবার এই উৎসাহী বিড়ালছানাকে গল্প শোনানোর জন্য তার অস্থির লাগতে লাগল। রুবাবাকে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আসতে আসতে সে একটা সিগারেট ধরাল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এত খালি খালি লাগে কেন? গত সাত মাসে সে এই অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগছে। এত দিন মেয়েটার প্রবল ভালোবাসা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। হঠাৎ সেটা উধাও হয়ে যাওয়ায় তার জীবনে ছন্দঃপতন হয়েছে। রাত ১০টায় এশার বাসার সামনে দাঁড়াল অয়ন। গত তিন ঘণ্টা সে অন্ধকার রাস্তায় ইতস্তত হেঁটেছে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ান কিছু বলল না। অনেক মানুষ যাওয়া-আসা করছে। কয়েকটা মেয়ে সেজেগুজে গ্যারাজের এক কোনায় খুব হাসাহাসি করছে। আলপনা আঁকা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল। এশাদের বাসায় দরজা হাট করে খোলা। সিঁড়ি থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত অসংখ্য জুতা ছড়ানো। অনেক মানুষ ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে, এর মাঝখানে এক কোনায় সোফায় টুপি পরা বাঁধানো খাতা কোলে বসে থাকা কাজিকে দেখে অয়নের বুক ধক করে উঠল। সে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আজকে কি এশার বিয়ে? অয়নকে প্রথম লক্ষ করলেন এশার মা। সিঁড়িতে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলেন। ‘তুমি অয়ন না?’ অয়ন সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। ‘কী করছ এখানে তুমি আজকে? প্লিজ, চলে যাও। ’ অয়ন কোনো কথা বলল না। এশার মা গলা নামিয়ে অনেকটা মিনতির সুরে বললেন, ‘তোমার জন্য আমার মেয়েটা গত কয়েক মাসে অনেক কষ্ট পেয়েছে। প্লিজ, ওকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও। তুমি চলে যাও, বাবা। ’ তাঁর পেছনে আরো অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। এর মধ্যে অয়ন হঠাৎ এশাকে আসতে দেখল। টকটকে লাল শাড়ি পরে গা ভর্তি গয়না পরা এশাকে সে কোনো দিন কল্পনা করেনি আগে। মনে হলো রূপকথার দৈত্যের কাছে বন্দিনী কোনো রাজকন্যা এইমাত্র মুক্তি পেয়ে ছুটে এসেছে। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এই মেয়ের কৌতূহলী চোখে বাঁধা পড়ে গেছে। আশপাশে আরো অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। তারা বিরক্ত হয়ে কানাকানি করছে। এশার বড় ভাই সৌরভ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত এই অস্থিরতার মধ্যে এশার শান্ত চেহারাটা দেখল অয়ন। এই মেয়েকে সে তিন বছর কিভাবে অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছিল। ‘এশা, আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, কোনো দিন তোমাকে প্রাপ্য সম্মান দিইনি। ’ এশা কিছু বলল না। অয়ন ব্যাকুল গলায় বলল, ‘আমি মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা মানুষ, যে তোমাকে পেয়েও হারিয়েছি। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। প্লিজ, তুমি ফিরে এসো। এই বিয়েটা কোরো না। ’ অয়ন আর কিছু বলার আগেই সৌরভ এসে প্রচণ্ড জোরে ওর পেটে একটা ঘুষি মেরে বসল। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই চুপ হয়ে গেছে। এর মধ্যেই অয়নকে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে লাগল সৌরভ। এশার মা কোনোভাবেই ছেলেকে থামাতে পারছেন না। সৌরভ নিচে নিয়ে যেতে শুরু করল অয়নকে। ‘তোকে যদি আর এই এলাকায় দেখি, খুন করে ফেলব হারামজাদা। ’ অয়ন দেখল, এশা ভেতরে চলে যাচ্ছে। সে চিত্কার করে বলল, ‘আমি তোমাকে এই বিয়ে করতে দেব না, এশা। তোমাকে নিয়ে যাব আমি। ওই ছেলেকে মেরে ফেলব। ’ সৌরভ রেগে প্রচণ্ড জোরে অয়নের মুখে একটা ঘুষি মারল। রক্তে অয়নের শার্ট ভিজে গেল।

রাতে কিভাবে বাসায় এসেছে অয়ন জানে না। মা-বাবা তাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। সারা রাত জ্বরের ঘোরে অয়ন শুধু এশাকে দেখল। তার বিয়ে হয়ে গেছে। অয়নের মনে হলো, মানসিক কষ্টের কাছে শারীরিক কষ্ট কিছুই না।

সকালে ঘুম ভাঙল অনেক দেরি করে। আয়নায় নিজের ব্যান্ডেজবাঁধা বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, এশা এখন অন্য কারো স্ত্রী। তাকে কি...? মেয়েটাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। যেভাবেই হোক এশাকে সে ফিরিয়ে আনবেই। ও কোথায় আছে, সব ভালোভাবে জানতে হবে।

জামা পাল্টে ড্রয়িংরুমে আসতেই সে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যের একটা দেখতে পেল। গোলাপি শাড়ি পরে গম্ভীর মুখে এশা সোফায় বসে চা খাচ্ছে। অয়ন কাঁপা গলায় বলল, ‘তু...তুমি এসেছ? সত্যি এসেছ! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ’

‘যে মারপিট করেছ, দেখতে এলাম হাড়গোড় অক্ষত আছে কি না। ’

‘তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে, এশা?’ সে করুণ গলায় জিজ্ঞেস করল।

‘তোমার গুণ্ডামি দেখে আমার হবু শ্বশুর ভয়ে বিদায় হয়েছে। বিয়ে আর কী হবে। ’

অয়ন আনন্দে প্রায় চিত্কার করে উঠল, ‘আমি তোমাকে আর কোনো দিন যেতে দেব না। কোনো দিন না, তুমি আমার। ’

তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে এশা হেসে ফেলল, ‘গুণ্ডা ছেলের কাছে আমাকে কে বিয়ে দেবে?’

অয়ন ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল এশাকে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, বিবিএ ফাইনাল সেমিস্টার

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটি


মন্তব্য