kalerkantho


ভালোবাসার ইরেজার

জাকির হোসেন

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভালোবাসার ইরেজার

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

ছবিতে চায়ের কাপের সামনে বসে আছে রুপা। ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক।

চায়ের মধ্যে দুটি পিঁপড়া।

এই প্রথম রুপা ফেসবুকে ছবি পোস্ট করল। রুপা ফেসবুক ইউজ করছে বহু দিন। কখনো ফেসবুকে ছবি পোস্টও করেনি। বলা যেতে পারে, পঞ্চাশোর্ধ্ব ফ্রেন্ড নিয়ে রুপার নাম মাত্র ফেসবুক জগত। একসময় স্বামী ফেসবুক ইউজ করা পছন্দ করত না। এ নিয়ে কখনোই রুপার কোনো অভিযোগ ছিল না। আর এখন যেহেতু কারো নিষেধ শুনতে হয় না। তাই কোন বাধাও নেই।

  ‘নীল পদ্ম’ নামের রুপার আইডিতে পোস্ট হওয়া ছবিটিতে কয়েকটি কমেন্টস এসেছে। তার মধ্যে ‘ভালোবাসার ইরেজার’ নামের একটি আইডি কমেন্ট করেছে—পিঁপড়া ফেলে চা খান, নইলে আপনার ঠোঁটে কুটুস করে কামড় দেবে।

রুপা একটি অ্যাংরি স্টিকার দিয়ে রিপ্লাই করল।

পরের দিন রাতে ভালোবাসার ইরেজার থেকে ইনবক্সে টেকস্ট এলো ‘হ্যালো’। আরও চারবার হাই-হ্যালো লিখে ইরেজার রুপাকে টেক্সট করল। রুপা নিশ্চুপ।

দিন দুয়েক পর হঠাৎ রুপা ভালোবাসার ইরেজারকে টেক্সট করল। একটি গুড নিউজ শুনবেন?

ইরেজার অনলাইনেই ছিল। রিপ্লাই এলো—বলুন।

—আজ স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিসট্রেসে নিয়োগ পেয়েছি।

—অভিনন্দন, আপনি স্কুলে জব করেন?

রুপা বলল, হুম। আপনাকে এই গুড নিউজটা সবার আগে শেয়ার করলাম এবং কেন করলাম জানেন?

—আমি ভাগ্যবান বলে...!

রুপা বলল, আপনি ভাগ্যবান বলা যেতে পারে, বাট আমি শেয়ার করলাম এই জন্য যে আমি চাচ্ছিলাম, এই গুড নিউজ সবার আগে এমন একজনকে শেয়ার করব। যাকে আমি রিসেন্টলি অ্যাবয়েড করছিলাম।

—আর সেই তালিকায় আমি পড়ে গেলাম। সত্যি আমার পাঁচ আঙুলের কপাল!

—আপনার প্রোফাইল পিক কই? দেখি আপনার পাঁচ আঙুল সমান কপালের মুখখানা। কাল পিক দেবেন কিন্তু, আজ গেলাম।

একাকী জীবন রুপার মন্দ যায় না। বড় বোনের বাসায় থাকে। বোনের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে দুষ্টুমি-খুনসুটি করে বেশ ভালো লাগে। দিনের বিশাল একটা অংশ কেটে যায় স্কুলে। ক্লাসে বাচ্চাদের সঙ্গে সময়টা দারুণ উপভোগ্য। ক্লাসে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেখে রুপার হঠাৎ মা না হতে পারার কষ্টটা তাকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

ভালোবাসার ইরেজার ও নীল পদ্ম এই দুই আইডির চ্যাটিং এখন তুঙ্গে। সখ্য হয়ে গেছে দুজনারই। প্রতি রাতে চ্যাটিংয়ের জন্য তারা অপেক্ষা করে।

—কোনো দিন মা হতে পারবেন না জেনে পাঁচ বছরের বিবাহিত সম্পর্ক ছেদ করে আপনার স্বামী ডিভোর্স দিল?

—হুম, ওরও খুব ইচ্ছা বাবা হওয়ার।

—আপনারও তো ইচ্ছা মা হওয়ার?

—হুম, প্রত্যেক নারীই সন্তানের মুখে মা ডাক শুনে শুনে তার মাতৃত্বকে ধন্য করতে চায়।

ইরেজারের জবাব এলো ‘ভালোবাসা হচ্ছে একটা গিফট বক্স। যেখানে স্বপ্ন-আশা, কামনা-বাসনা, হাসি-কান্না, সুখ-অসুখ গচ্ছিত থাকে। আমৃত্যু স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সেই বক্স থেকে উপাদানগুলো বের করে উপহার দেয়।

—বাহ, আপনার দেখছি ডিপ এক্সপেরিয়েন্স! আর ইউ ম্যারিড?

—নো।

—বাট আমি কম ট্রাই করিনি। বেবি দিতে পারিনি বলে ইচ্ছা হচ্ছিল ওর সংসারেই মরে যাই। কবরে অন্তত স্বামীর হাতের মাটি পাব। ও আমাকে বড্ড ভালবাসতো।

ভালোবাসার ইরেজার একটি স্যাড স্টিকার সেন্ট করল।

—যাকগে, আপনার কথা বলুন?

—আমার কথা আর কী বলব? একটা প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরি করি। মাস শেষে কিছু টাকা পাই। এতেই চলে যায়।

—এইটুকু? আচ্ছা, আপনিও তো কোন প্রোফাইল পিক দেন নি ফেসবুকে? এখনই একটা সেলফি তুলে দিন।

সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসার ইরেজার তার একটি ছবি সেন্ট করল। ছবিটির পুরো মুখে শেভিং ক্রিম মাখানো।

—এটি আবার কেমন ছবি! কার ছবি?

—আপনিই বললেন, এখনই ছবি তুলে দিতে। আমি এখন শেভ করছিলাম। তাই এমন ছবিই দিতে হলো।

—আপনার বদনখানি দেখতে আমার বয়ে গেল!

—কাল বিকেল ৪টায় হতিরঝিলে অপেক্ষায় থাকব। প্লিজ...

আচ্ছা বাবা। দেখা হবে কাল, হল এবার।

হাতির ঝিলে হাটতে হাটতে থমকে দাঁড়াল রুপা।

ইশতিয়াক, তুমি!!!

—ভালোবাসার ইরেজার আমার আইডি। ডিভোর্স পেপার এখনো জমা দিইনি। কথাটি বলে হাতে থাকা পেপারটি ছিঁড়ে ফেলল ইশতিয়াক।

—আমি কিছইু বুঝতে পারছি না।

—দ্যাখো রুপা, তুমি মা হতে পারবে না এটি তোমার অপরাধ নয়। আমি ভুল করেছি অনেক তোমাকে অপমান করে। আমি তোমার ভালোবাসা হারাতে চাই না আর আমাকে ক্ষমা করো।

রুপার দুই চোখ তখন জলে ঝাপসা। ভেতর দেখে ঢেউ উঠছে অভিমান আর ক্ষোভে মেশানো কান্নার দলা। প্রাণপনে চেষ্টা করছে সামলাতে।

ইশতিয়াক বলল বাড়ি চলো রুপা। আমরা না হয় সন্তান দত্তক নেবো।

আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না রুপা। ইশতিয়াককে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। তবে এটা দুঃখের নয়; আনন্দের কান্না।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, বিবিএ তৃতীয় বর্ষ

বিজয় সরণী কলেজ, চট্টগ্রাম


মন্তব্য