kalerkantho


মিছে আশা | নিবেদিতা রায়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০৯:৪০



মিছে আশা | নিবেদিতা রায়

একদিনের জন্যে আয়োজন করে ভালোবাসা অথবা 'ভালোবাসা মানে তুমি আর আমি বাকি সব তামাশা'-  এই কেজো কথা দুটো বড্ড অকেজো। মা-বাবা- সন্তান, সুহৃদ, স্বজন, বন্ধুদের প্রতি অনুভবের অনুভূতিই বলে দেয় কার সাথে আবেগ কতটা জড়ানো। 

মানুষ প্রকৃত অর্থে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তাই সে আশ্রয় খোঁজে, সুন্দরের মাঝে বাঁচতে চায়, সাজতে চায় ভালোলাগার সবকিছু নিয়ে। একজন সন্তানকে মা-বাবা সবচেয়ে বেশি স্বার্থবিহীন ভালোবাসা দেয়। কারণ সেই সন্তান শুধুই তাদের। 'আমি তোমাকে ভালোবাসি' বলে আবেগের ডানা ঝাপটানোর অর্থ হলো তোমার কথা ভেবে আমার নিজের মনকে সব চাইতে বেশি ভালো রাখা। 

অনেকেই বলবেন তবে কি 'ভালোবাসা' মিথ্যা! অন্যের প্রতি যে টান টান উত্তেজনা, হাত ধরে এক ছাদের নীচে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার ব্যাকুলতায় সব প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙানো অথবা ভ্যালেন্টাইনের সকালে দু'টাকার গোলাপ ৫০ টাকায় কেনার অবাধ্য প্রতিযোগিতা সে সবই কি মিছে! মিথ্যা নয় তবে, সত্যটি এই জায়গায় যে, নিজের ভালোলাগা, মনতৃপ্তির জন্য আমরা মনের মানুষের কাছে ছুটে যাই। ধরুন কেউ আপনার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আপনি তার জন্য কোনো টান অনুভব করেন না। 

আপনার মনের কোনে তার জন্য পাগলামি তো দূরের কথা, ভালোলাগার বাড়াবাড়িতে বিরক্তি আসে। তখন কি আপনি সেই পাগল হতে যাওয়া মানুষটিকে মূল্য দেন? এক পর্যায়ে বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে আপনি হয় বিরক্ত হবেন অথবা করুণা করবেন, কিন্তু ভালোবাসা নয়। কারণ আপনার মন সেই টানে কোনো সুখ অনুভব করে না। টিভি নাটকের সেই সংলাপের মতো 'একা একা লাগে' মনে হয় না। একা একা ফাঁকা লাগার শূন্য ঘরে আমরা এমন কাউকে চাই যার সাথে দোকা হলে মন ভালোলাগায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই বরং বলা উচিত 'আমি আমাকে ভালোবাসি বলেই তোমাকে খুঁজি'। অনেকটা পিকে মুভির সেই সংলাপটির মতো, 'আই লাভ কাক্কু'। মানে, আমি মুরগিকে ভালোবাসি না বরং আমি মুরগি খেতে ভালোবাসি।

এতো গেলো বিয়ের আগের ব্যাকুল হওয়া প্রেম প্রলাপ। বিয়ের পরেই ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ মেলে। বিবাহিত জীবনে বলা হয়, যে যত ছাড় দিতে পারে সে তত সুখি। দেখা গেলো যেকোনো একজন ছাড় দিতে দিতে নিজের সত্ত্বা বলতে বাকী কিছুই অবশিষ্ট রাখলো না। এ যেন, চৈত্র সেল, উৎসব সেল, বৈশাখি সেল, শীতকালীন ছাড় দিতে দিতে নিজেকে বাতিলের দোকান খুলে বসা সস্তার আউটলেট। এরকম অবস্থায় মনে পড়ে সেই অনু কাব্যটি- 

‘তোমার ভালোবাসায় আমি
হয়ে গেছি ঘাস,
খেয়ে গেছে গরু
দিয়ে গেছে বাঁশ।।’

তখন মন বলে, কী আশায় না ধরেছিলেম হাত বেঁধেছিলেম ঘর। সেই ঘর মানে ‘বাসা’। যেটা বিয়ের পরে ‘ভালোবাসা’র মানে খোঁজে ‘ভালো বাসায়’। ধরা যাক, ভালো বাসা পাওয়া গেলো। অর্থ্যাৎ টাকা-পয়সার অভাব প্রকট নয়, যৌথ পরিবারের স্টার জলসা, জি বাংলা প্যাঁচালিও নেই। পরমাণু পরিবারের আমি-তুমি। তারা দুইজনে মিলে খায়-দায় ঘুরে বেড়ায়। কুলফি মুখে সেলফি তুলে ফেসবুকে ফটো পোস্ট করে। তাদের ভাব-ভালোবাসা দেখে ফটোর ওপরে লাইক বাটন ক্লিক করতে করতে অনেকেই ভাবেন, আহা! আমার জীবনটা বুঝি ত্যানা ত্যানা হয়ে গেলো। এই সুখী দম্পতির আনন্দের টোনাটুনির সংসারে দুই বছর বাদে ছানা ফুটলো। স্বামী-স্ত্রীর ক্যারিয়ার, বাচ্চার জন্য গুণগত ও পরিমাণগত সময় প্রদান, সংসারের কত্তো বায়ানা। বাপের বাড়ি-শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনের দায়িত্ব এ ধরনের বহু প্রকার তাল বেতালের দোলাচালে কপোত কপোতি দোদুল্যমান। 

ভালোবাসার ঘর দুজনের অভিযোগে মুখরিত হয়। সেই মুখরতায় আগের মতো ভালোবাসার ছন্দ নেই, কেমন জানি বেসুরো তালের একে অন্যর দোষ ভুল বিচারের ব্যস্ততা। মাঝে মাঝে মনে হয় ‘ভুল সবই ভুল, এ জীবনের পাতায় পাতায় ভুল সবই ভুল’। আহা প্রেম কাননে বসন্ত আসে না। যার কণ্ঠ একদিন না শুনলে বুকটা হাহাকারে ভরে উঠত, আজকাল সেই সুমিষ্ট কণ্ঠে কে যেন চিরতার তিতা ঢেলে দিয়েছে। 

দুজনে পাশাপাশি গভীর দুখে দুখি হয়ে ভাবতে থাকে পুরাতন ভালোবাসা দিন দিন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। একসাথে না থাকলে হয়তো আগের আবেগ, অনুভূতি আর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকতো। ইতিহাসের বিখ্যাত প্রেমিক জুটির বেশিরভাগের একসাথে ঘর বাঁধা হয় নাই। সম্ভবত এ কারণেই লাইলি-মজনু, দেবদাস-পার্বতী বিচ্ছেদের কারণেই ভালোবাসাকে অক্ষত রাখতে পেরেছিল। অমর প্রেমের গল্পগুলো বড্ড বিরহকাতর। বিচ্ছেদের কারণে অমর হয়েছে অথবা সুখের ঘরে আগুন লাগার পরে আত্মাহুতির মধ্যে দিয়ে করুন রসে সিক্ত হয়েছে। 

ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র উৎসব নিয়ে যেসব ইতিহাস ও গল্প আমরা পেয়েছি, তার সবই প্রায় ভালোবাসার নিষ্ঠুর পরিণতি। একদিনের আয়োজনে ভালোবাসার শ্বাশত রূপের পরিবর্তন হয় না। তবে, হয়তো একটু বাড়তি মনোযোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই হিসাবে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ পালন নেতিবাচক মনে হয় না আমার কাছে। কিন্তু সেটা যদি একদিনের সৌখিনতা আর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে তবে, বাকি ৩৬৫ দিন সেই বিশেষ মানুষটিকে শ্রদ্ধা করা, বোঝা এবং সম্মানের সাথে অনুভব করার চেষ্টা করা উচিত। কারণ, এক সময়ের অবাধ্য মনের আকুলতা শেষ পর্যন্ত অনুভবের জন্য (যেটাকে আমরা ফিল করা বলি) ব্যাকুলতায় অপেক্ষা করে। 

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।


মন্তব্য