kalerkantho


চন্দ্রশৈলী | রওনক ইসলাম

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:০৮



চন্দ্রশৈলী | রওনক ইসলাম

'শৈলী, এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছবে, তখন হয়তো আমি আর জীবিত থাকব না। মানুষের জীবন খুবই বৈচিত্রময়। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। অনেকটা আকাশের মতো। দুদিন আগেও খুশিমনে বান্দরবানের বাস ধরেছিলাম। ঘুরতে ফিরতে কত যে আনন্দ করেছি! হঠাৎ একরাতে আকাশ ভরে চাঁদ উঠল। আমার খুব শখ হলো পাহাড়ে উঠে সেই জোছনা দেখার। কেউ যেতে রাজি হলো না, তাই একাই রওনা দিলাম। রাতের আঁধারে পাহাড়ে ওঠা খুব ঝুঁকির কাজ। তবু কেন জানি পিছিয়ে আসতে পারছিলাম না। রাতের জোছনা আমাকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলো।

পড়ে গিয়ে মাথায় অনেক জোরে আঘাত পেয়েছি। কতক্ষণ বাঁচব কে জানে। মারা যাবার আগে তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। সেটা তো আর সম্ভব না। তাই চিঠিটা লিখলাম। তুমি কিছু মনে কোরো না কিন্তু। কথা রাখতে না পারার জন্য আবারো ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই আফসোস রইল- পাহাড়ে দাড়িয়ে জোছনা আর দেখা হলো না। -রায়হান।'

আমার মনে পড়ল রায়হানের কথা। পাতলা-ছিপছিপে শরীরের ছেলেটা। কবিতা লেখত বোধহয়। খুব বেশি পরিচিত মুখ ছিলো না। পাহাড় থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। শৈলীর গালদুটো লবণ-পানিতে ভিজে চুপসে গেছে। আমি হাত দিয়ে তার গাল থেকে অশ্রু মুছে দেই। তারপর তার মাথাটা আমার বুকে চেপে ধরে রাখি। সে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। 'আমি খুব খারাপ মানুষ, তাই না রে ভাইয়া? কি দোষ করেছিলো ছেলেটা। হয়তো…হয়তো, মনে দু:খ না থাকলে রাতের বেলা পাহাড়ে ওঠার…পাগলামিটা করতো না…'  
'এভাবে বলে না।'
 ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম আমি।
'জন্ম-মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে। তোর কি দোষ?'
শৈলী উঠে বসে হাত দিয়ে চোখ-মুখ মুছল। অশ্রু-সিক্ত তার সুন্দর চোখদুটো তখন জ্বল-জ্বল করছে।
'খুব ইচ্ছে হয় জানিস, খুব ইচ্ছে হয়…জোছনার রাতে ওই পাহাড়ে উঠে দাঁড়াতে। তাই বারবার ছবিটা আঁকি। আঁকার সময় মনে হয় যেন সত্যিই পাহাড়চূড়ায় দাড়িয়ে আছি।'
ওর এই কথায় অদ্ভত এক চিন্তা মাথায় খেলে যায় আমার। শৈলী আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন আমি চয়নের সাথে দেখা করি। আমার কথা-বার্তা সোজাসাপ্টা, কোনও ভনিতা করি না।
'শৈলীকে কতটুকু ভালোবাসিস তুই?'
হঠাৎ এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় চয়ন। কিছুটা সময় নিয়ে সামলে উঠে বলে,
'অনেক।'
'প্রমাণ দিতে পারবি?'  
'বল্, কি প্রমাণ চাস।'
আমি শুনে হাসলাম। একটাই তো পথ আছে, তাই না? রায়হানের বন্ধুদের কাছ থেকে ওই পাহাড়ের অবস্থান জানা খুব বেশি কঠিন কোনও কাজ ছিল না। চয়ন যখন শৈলীকে ব্যাপারটা জানাল, আমি তখন সামনে ছিলাম। শৈলী অবাক হয়ে চয়নের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে বিস্ময় নিয়ে! পাহাড়ের নিচ থেকে আমি আমার শক্তিশালী বাইনোকিউলার দিয়ে চূড়াটা দেখতে চেষ্টা করি। ভরা পূর্ণিমার রাতে মায়বতী চাঁদ তার ঝলমলে রূপ ঢেলে দিচ্ছিল পুরো বসুন্ধরায়। সাময়িকীর ধরায় মানুষ আসে-যায়, কিন্তু যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী এমনই সৌন্দর্য্য নিয়ে বেঁচে থাকে চন্দ্রশৈলী। আমি নিচে দাড়িয়ে কল্পনা করি, চয়ন হাঁফাতে হাঁফাতে, অব্যক্ত ভালোবাসা বুকে নিয়ে শৈলীর দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্যামল-মায়ার প্রকৃতিতে ভালোবাসার মানুষটিকে পাশে পাওয়ার অনুভূতি নিশ্চয়ই অন্যরকম!
বাইনোকিউলারে চোখ লাগিয়ে আমি দেখতে পাই, জোছনা ভরা আকাশের পটভূমিতে কালো পাহাড়ের চূড়ায় হাতে হাত ধরে দুজন তরুণ-তরুণী তাদের স্বপ্ন বুনে চলে। গোধূলী রেখায় রক্তিম সূর্যের আভা দেখা দিলেও তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না। চয়ন হয়তো শৈলীকে তুলোদের মতো মেঘেদের দেশে নিয়ে যেতে চায়। হয়তো তাকে সাদা মেঘেদের ডানায় ভর করে উড়িয়ে নিয়ে চলে, হয়তো ভোরের মেঘেরা তাকে ছুঁয়ে দিয়ে যায়, ঠিক যেমন বৃষ্টি গাছের পাতাকে ছুঁয়ে দিয়ে যায়। ইমাকে আমি যতবার এই ঘটনা বলি, ততবারই সে মুখ টিপে হাসি দেয়। বলে,
'চয়ন তার ভালোবাসার জন্য কত ঝুঁকি নিল, আর তুমি কি করলে আমার জন্য শুনি?'  
সুন্দর দাঁতগুলো বের করে ইমা মায়াময় হাসি দেয়। সে হাসি দেখে বুকের মধ্যে কেমন জানি একটা ব্যাথা করে।
সে ব্যাথা কেন হয়-
আমি ইমাকে জিজ্ঞাসা করি। সে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। আজ জোছনা রাত। ইমাকে সাথে নিয়ে আমি চলেছি সেই পাহাড়চূড়ায়। রুপালি চাদরে আচ্ছাদিত পৃথিবীকে অবাক সৌন্দর্য্যে ভাসাচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদ। ইমার হাত ধরে আমি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে থাকি। যে পাহাড় রচনা করে গেছে একের পর এক ভালোবাসার ইতিহাস।

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য