kalerkantho


চলো বৃষ্টিতে ভিজব | রুফায়েল মিয়া

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:০৬



চলো বৃষ্টিতে ভিজব | রুফায়েল মিয়া

সেমিস্টারের মাঝামাঝিতে একদিন ক্লাস শেষ করে ফ্রেন্ডদের সাথে বের হলাম। মেইন গেট দিয়ে বাহির হতেই একটা বাঁশির শব্দ কানে আসল, ঘুরে তাকাতেই দেখি অসম্ভব কিউট একটা মেয়ে গলায় ঝুলানো বাঁশিটা পরপর ২ বার বাজাল...। মেয়েটাকে রেখে সামনে চলে যাওয়া ফ্রেন্ডটা তার কাছে ফিরে আসল। আমি খুব অবাক হয়ে যাই! মেয়েটি কথা বলতে পারে না, সে কিভাবে এই ভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েশন করছে? আমি সঙ্গে সঙ্গেই গেইট এর কাছে যাই কিন্তু মেয়েটির দেখা আর মেলেনি। 

আমি বিষয়টি ফ্রেন্ডদের সাথে শেয়ার করলে ওরা আমাকে বলে, 'রুফায়েল, তুই কোথাও ভুল করছিস।'

পরে আমি প্রায় দুই মাস যাবৎ মেয়েটিকে খুঁজতে থাকি। কখনো গেট এর মামাদের জিজ্ঞেস করি, রিসেপশনে যাই, ক্যান্টিনে খুঁজি, লাইব্রেরি মেমদের সাথেও কথা বলি। কেউই মেয়েটির সন্ধান দিতে পারেনি। তারপর হঠাৎ একদিন আমার ফ্রেন্ড পুষ্পর সাথে দিদির ক্যান্টিনে বসে গল্প করছিলাম, ঠিক তখনি বাঁশির শব্দটা আবার শুনতে পাই। আমি কেন জানি খুব অস্থিরতা ফিল করছিলাম। এই অস্থিরতার নাম ই কি ভালবাসা?

'আমি তোমাকে ভালবাসি' এই বাক্যটার মানে কী?- আমি তোমার জন্য অস্থির হয়ে থাকি? কে জানে ভালবাসার মানে কি? তবে মেয়েটির জন্য প্রবল অস্থিরতা ফিল করছি। অস্থিরতা হয়তো মায়া থেকে তৈরি হয়েছে। সে কথা বলতে পারে না বলে হয়তো আমার মধ্যে এক ধরণের মায়া সৃষ্টি হয়েছে। আমার এই অস্থিরতার মধ্যেই দেখতে পেলাম মেয়েটি বাঁশি বাজিয়ে ইশারায় তার ফ্রেন্ডকে কিছু বলতে চাচ্ছে।

আমি তার সাথে কথা বলতে চাইলে সে আগ্রহ বোধ করেনি। পরে তার ফ্রেন্ডের সহযোগিতায় এক পর্যায়ে তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়। আমি তখন খাতা কলমে তার সাথে চ্যাট করি। আমি জানতে পারি তার নাম টিউলিপ। সে তার ৪র্থ সেমিস্টার শেষ করার পর পরই এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কথা বলার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। অবিশ্বাশ্য হলেও সত্যি, গত ৬ মাস ধরে জার্মানির অর্থপেডি হাসপাতালে থেকে সব ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও স্পেশালিষ্ট ডাক্তারগণ টিউলিপের রোগটা সম্পর্কে সঠিক কোনো ধারনাই দিতে পারেন নাই।

তবে ডাক্তাররা এটাও উল্লেখ করেছেন যে, তার আগের অবস্থা ফিরে পাওয়ার সম্ভবনা আছে। সে এখন কলকাতার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তারপর আমি তাকে আবারো এক সপ্তাহের জন্য হারিয়ে ফেলি। পরের দেখায় আমি তার সেল নাম্বার নেই। আমি তার সাথে টেক্সট করে কথা বলতে থাকি। সে কখনো তার কাজ এর জন্য আমাকে ডাকেনি, আমি নিজে থেকেই তার সাথে থাকার চেষ্টা করি। কখনো বাসে বা রিক্সায় উঠিয়ে দেওয়া, তার রিপোর্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, নোট তৈরির কাজে আগ বাড়িয়ে হাজির হতাম। লেকচার শিট বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম।

কিন্তু কাজ হয়নি, সে কোনরকমে একটা সেমিস্টার শেষ করেছিল। পরে আর সম্ভব হয়নি। তাকে ভার্সিটি থেকে চলে যেতে হয়। এমনকি আমার সাথেও যোগাযোগ রাখেনি। টিউলিপ চলে যাওয়ায় ভার্সিটিতে আমি খুব একা হয়ে যাই। প্রায়ই এদিক ওদিক ছুটে যাই, মনে হয় কে যেন আমায় বাঁশি বাজিয়ে ডাকছে। তারপর আবারও দুই মাস। টিউলিপের কোন খোঁজ না পেয়ে আমি নিরাশ হয়ে পড়ি।

প্রায়ই টিউলিপকে মনে করে একটি নিস্তব্ধতা আমাকে নিয়ে যেত আমার সেই চেনা নদীর তীরের কদম গাছের নিচে। একদিন বিকালে কদম গাছটির নিচে বসে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি। আকাশে মেঘ কালো হয়ে আসছে, এখনই বৃষ্টি নামবে। ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। বৃষ্টির প্রতি ভয়টা আমার সেই ছোটবেলা থেকে। 

আমি সম্ভবত ক্লাস ফোর এ পড়ি। তখন কোনো এক সন্ধ্যায় একটা কিছু ঘটেছিল। যা ঘটেছিল তা খুবই ভয়ংকর! তারপর থেকে বৃষ্টি আসলেই খুব ভয় করত। বৃষ্টির সময় কোথাও যেতাম না, ভয় নিয়ে ঘরে বসে থাকতাম। দেখতে দেখতে এক যুগ কেটে গেছে, অথচ বৃষ্টির প্রতি ভয়টা রয়েই গেল। আমার কোনোদিন সেই ছেলেবেলার মত আর বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি।'

ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি ভয় কাটানো জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি। এমন অস্থির সময়ে একটি শান্ত স্থির হাত আমাকে স্পর্শ করে। আমি ধড়ফড় করে ফিরে তাকাতেই টিউলিপ বলল, 'রুফায়েল, তুমি ভালো আছ?'

প্রথমে মনে হয়েছিল আমি স্বপ্ন দেখছি। না এটা স্বপ্ন না। স্বপ্ন এত সুন্দর হয় না। সত্যিই টিউলিপ ফিরে এসেছে। টিউলিপ এখন রোগমুক্ত। ও এখন কথা বলতে পারে। আমার এই ভাবনা মধ্যেই টিউলিপ আমার হাত ধরে বলল, 'চলো, বৃষ্টিতে ভিজব।'

টিউলিপের হাত ধরে বৃষ্টিতে হাঁটছি। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে। হঠাৎ খেয়াল করি বৃষ্টির প্রতি আমার ভয়টা কেটে যাচ্ছে। বৃষ্টির শব্দ শুনতেও ভালো লাগছে।

**শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।


মন্তব্য