kalerkantho


বদ নজর | তানজিনা তানিয়া

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২২:৫২



বদ নজর | তানজিনা তানিয়া

নিনিতা সেই দিনটার কথা এখনো ভুলতে পারেনা। নিনিতার বয়স যখন তেরো, একদিন তার চাচাত ভাই সাজু তাকে তাড়াহুরা করে টেনে নিয়ে একটা রুমে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। সাজু সেবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। নিনিতার বয়স তেরো হলেও তার বুঝতে বাকী রইলনা যে তার চাচাত ভাই সাজু তাকে কোন অসৎ উদ্দেশ্যেই রুমে আটকেছে। সে ভয়ে চিৎকার দিতে চেয়েও পারলনা। সাজু তার মুখ চেপে ধরল। 

নিনিতার সেই সময় নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়েছিল। এই ভর দুপুরে এ রুমের আশেপাশেও কারোর আসার কথা নেই। নিনিতার তার সাজু ভাই সম্পর্কে এতদিন মনে মনে যে ধারণা ছিল সেটা বুঝি আজ মিথ্যা প্রমানিত হতে যাচ্ছে। ইশ! পুরো বাড়ির মধ্যে সাজু ভাইকেই সে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত। নিনিতার তিন চাচার মধ্যে নিনিতাই একমাত্র মেয়ে। আর বাকী সবার দুটো করে ছেলে। সাজু তার ছোট চাচার বড় ছেলে। প্রতিদিন স্কুল থেকে নিনিতার জন্য কোন না কোন মজার জিনিস নিয়ে আসবেই সে।

সাজু বিলে গেলে নিনিতাকে নিয়ে যায়। সাজু সাঁতোরে গিয়ে নিনিতার জন্য শাপলা শালুক তুলে আনত মাঝ বিল থেকে। নিনিতাকে খুশি করার জন্য সাজু বিলে নিয়ে যেত বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। সাজু যখন বড়শিতে বড় বড় মাছ উঠাত, নিনিতা তখন অানন্দে ছটফট করত। খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠত অার নিনিতার এই অানন্দমাখা মুখটা দেখে সাজুও অনেক তৃপ্তি পেত। সাজু মাছ ধরে যতটা না খশি হত নিনিতার অানন্দ দেখে তার থেকে বেশি খুশি হত। একমাত্র সাজু ভাইই নিনিতার আবদারগুল রাখে।

প্রজাপতি ফড়িং নিয়ে খেলতে খুব ভালবাসে নিনিতা। কয়দিন আগে সাজু ওকে ফড়িং ধরার একটা নতুন কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে। পাটকাঠির মধ্যে কাঁঠালের কষ লাগিয়ে ফড়িংয়ের গায়ে লাগিয়ে দিলেই ফড়িং পাটকাঠির মধ্যে আটকে যায়। গত বছর একুশে ফেব্রুয়ারির সময় নিনিতার সে কি কান্না! সবারই ফুল আছে কেবল নিনিতারই নেই। সেই কান্না দেখে সাজু কোথা থেকে যেন দুটো তাজা গোলাপ নিয়ে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল- 'এই নে ফুল। লাগলে আরো এনে দিব। তবু কাঁদিস না। তোর কান্না আমি একদম সহ্য করতে পারিনা।'

কথাগুলো বলতে বলতে সাজুর চোখেও পানি চলে এসেছিল। সাজু নিজের হাতে নিনিতার চোখ মুছে দিয়েছিল। আর তখনি নিনিতা দেখতে পেল যে সাজুর হাত দুটো থেকে তোর তোর করে রক্ত পড়ছে। নিনিতা অবাক হয়ে সাজুর হাত দুটো নিজের ছোট হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল- 'সাজু ভাই,তমার হাতে রক্ত কেন?'

-'ও কিছু না। দেয়াল টপকে মুন্সীর বাগান থেকে ফুল চুরি করতে গিয়ে বাউন্ডারির দেয়ালে লাগানো ছোট ছোট কাঁচের টুকরোয় লেগে একটু কেঁটে গেছে।' 

অমনি নিনিতা তার সাজু ভাইয়ের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে পা দুটো থেকেও রক্ত পড়ছে। নিনিতা কি ভেবে যেন তার সাজু ভাইকে সেদিন খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। যে সাজু ভাই নিনিতার সামান্য ক্ষতি হতে দেয়নি কভু আর সেই সাজু ভাইই আজ তার এমন কুৎসিত রুপ দেখাতে যাচ্ছে! নিনিতা রাগে সাজুর দেয়া বকুল ফুলের মালাটা একটানে গলা থেকে ছিঁড়ে ফেলল। ওমনি সাজু রেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিল নিনিতার গালে। নিনিতা এবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল। সাজু ওর হাত ছেড়ে দিল। নিনিতা এই সুযোগে দৌড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল রুমটা থেকে পালাবে বলে। 

সাজু পেছন থেকে ডেকে বলল- 'যাসনা নিনি। পূর্ব পাড়ার তালেব মুন্সি এসেছে বাড়ি। জানিসই তো উনার নজর খুব খারাপ। একবার যদি কোন কিছুকে সুন্দর বলে বা কোন কিছুর উপর নজর দেয়, তাহলে সেই জিনিস আর ঠিক থাকেনা। মনে নেই তোর, ফাহিমের রুচি নিয়ে প্রশংসা করায় তার সেদিনই ডায়রিয়া হয়। নিনি ঐ বদনজরওয়ালা লোকটা তোর ঐ চাঁদমুখখানা দেখে যদি কিছু বলে দেয় তাহলে নির্ঘাত তোর একটা অসুখ বিসুখ বেঁধে যাবে! যাসনে নিনি, তোকে আমার দোহাই লাগে বাহিরে যাসনে এখন!'

সাজুর কথা শুনে মুহুর্তেই নিনিতার ভেতরে যেন কী হয়...। ছিঃ এই মানুষটাকে নিয়ে এতক্ষণ কত বাজে কল্পনাই না করেছে সে! নিনি দৌড়ে এসে সাজুর সামনে দাঁড়ায়। তার চোখে জল। ভ্যান্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে আসা আবছা আলয় নিনিতা লক্ষ করল সাজুর চোখেও জল।

নিনিতা সাজুর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বলল, 'তুমি সারাজীবন এমনি করেই আমার খেয়াল রেখো সাজু ভাই।'

সাজু নিনিতার সেই কথা রাখতে দীর্ঘ আট বছর পর পবিত্রভাবেই নিনিতার হাত ধরার ব্যাবস্থা করেছে। অাজ বাড়িভর্তি মেহমানের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাজু দুষ্টুমি করে নিনিতাকে অাবার হ্যাঁচকা টানে নিজের রুমে ঢুকিয়ে দরজা অাটকে দিল। নিনি সেদিনটার কথা মনে করে লজ্জার হাসি হেসে উঠল।

 

**শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।

 



মন্তব্য