kalerkantho


কাছে আসার গল্প | সোহেল রানা শামী

কাছে আসার গল্প | সোহেল রানা শামী   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:৫৪



কাছে আসার গল্প | সোহেল রানা শামী

বিকেলের সময় পেয়েছিলাম মায়ের চিঠিটা। এখনো খোলা হয়নি। এখন তথ্যপ্রযুক্তির সময়, যুগ কতো পাল্টে গেছে। কিন্তু পাল্টায়নি আমার মা, এখনো সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। কয়েকদিন পরপর চিঠি লিখে আমাকে। উত্তরে আমাকেও লিখতে হয় চিঠি। ফোনেও কথা হয় অবশ্য, তবে চিঠির অক্ষরেই বেশি প্রকাশ পায় আমাদের মা ছেলের ভালবাসা।

রাতে ডিনার সেরে খুললাম মায়ের চিঠিটা। মা আজ চিঠিতে জানতে চেয়েছে তানিশার কথা। তানিশা মেয়েটাকে আমি ভালবাসি। মা তার কথা জানতে চেয়ে বলল, 'হ্যাঁ রে, তানিশার কী খবর, যে তোর চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, মন কেড়ে নিয়েছে? ওকে একদিন নিয়ে আসিস বাসায়। জানিস, ওর জন্য আমি আর তোর বাবা পছন্দ করে একটা নীল শাড়ি কিনেছি। আচ্ছা, ও কি নীলশাড়ি পছন্দ করে? আর কী কী খেতে ভালবাসে? চালের গুঁড়োর পিঠা খায় তো ও? ওর একটা ছবি তুলে দিস না কেন? কতবার বলেছি তোর বাবা ওকে দেখতে চায়। আচ্ছা, ছবি দিতে হবে না। এবার আসলে ওকেও সাথে নিয়ে আসবি, মনে থাকবে তো?'

মায়ের চিঠিটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম আমি। তারপর একটা কাগজে মাকে চিঠি লিখতে শুরু করলাম:
'মা, শুরুতে সালাম নিও। তুমি চিঠিতে জানতে চেয়েছো তানিশা কী কী খেতে ভালবাসে, আর নীল শাড়ি পছন্দ করে কিনা। আমি জানি না মা, আমি এখনো এটাও জানি না ও আমাকে পছন্দ করে কিনা। আমি আজও বলতে পারিনি ওকে মনের কথা। ওর মুখোমুখি হতে পারিনি। যদি ওকে কখনো মনের সব কথা বলতে পারি, ও যদি আমাকে পছন্দ করে, তাহলে ওকে সাথেই নিয়েই একদিন বাসায় ফিরব। বাবাকে বল একটু ধৈর্য ধরতে।'

পরদিন ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে আসলাম। তখন দেখলাম তানিশাও তার বন্ধবীদের সাথে ভার্সিটিতে যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে। একই ভার্সিটিতে পড়ি আমরা, তবে তানিশা আমার এক বছর জুনিয়র। আমি ওদের পিছুপিছু যেতে লাগলাম।  তানিশা তার মুখ মুছে একটা টিস্যু ফেলল মাটিতে। ওরা কিছুটা দূরে চলে যেতেই  ওটা আমি তুলে নিয়ে ঘ্রাণ নিলাম, যেন এতে গন্ধ লেগে আছে ওর। তারপর ভাঁজ করে রেখে দিলাম পকেটে পরম যত্নে।

ভার্সিটি শেষ করে আমি বাসায় যাচ্ছিলাম। তানিশা আমার সামনে সামনে তার দুই বান্ধবীর সাথে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার জুতো ছিড়ে যাওয়ায় লজ্জায় পড়ে যায় সে। চারপাশে একবার তাকিয়ে আমাকে দেখেই মুখ নিচু করে ফেলল। আমি তখন তারপাশে গিয়ে সমবেদনা জানিয়ে বললাম, 'আমার জুতোজোড়া পরে বাসায় চলে যান। আমি ছেলেমানুষ, চলে যেতে পারব জুতো ছাড়া।'

তানিশা মুখ তুলে বলল, 'নো থ্যাংকস। একটা রিকশা ডেকে দিন প্লিজ।'

আমি একটা রিকশা ডেকে দিলাম ওদের। ওরা রিকশায় উঠে চলে গেল। যাওয়ার সময় তানিশা তার ছেড়ে জুতোজোড়া ফেলে যায়। আমি চারপাশে একবার তাকিয়ে সবার অলক্ষ্যে তুলে নিলাম জুতা জোড়া, তারপর চলে এলাম বাসায়।

এরপর থেকে ভার্সিটিতে আমাকে দেখলেই তানিশা মুখটিপে হাসে। আমারো ভাল লাগে তখন। ভাবি, ওর সাথে কথা বলবো, কিন্তু সাহস হয় না। তখন ও হেসেই চলে যায়। একদিন পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, তানিশাদের বাসার গেইটে 'টু-লেট' লেখা। দেখেই আমার ভেতরটা হঠাৎ আনন্দে নেচে উঠল। আমিও একটা নতুন বাসা খুঁজছিলাম থাকার জন্য।  যেভাবে হোক এই বাসাটা আমার চাই।

ভেতরে গিয়ে বাসার ব্যাপারে কথা বললাম তানিশার আব্বুর সাথে।  কিন্তু ব্যাচেলর বলে আমাকে ভাড়া দিতে চাইল না। তখন তানিশা এসে তার বাবাকে বলল, 'বাবা, উনি আমার পরিচিত। আমাদের  ভার্সিটিতে পড়ে। উনাকেই দাও বাসাটা।'

তানিশার কারণেই পেয়ে গেলাম বাসাটা। পরদিনই আমি নতুন বাসায় উঠলাম। আমার জিনিসপত্রগুলো রুমে সাজাচ্ছিলাম, তখন তানিশা এসে বলল, 'এই যে মিস্টার, ধরুন আপনার মানিব্যাগ। নিচে পড়ে গিয়েছিল!'

আমি হাত বাড়ালাম মানিব্যাগটা নেওয়ার জন্য। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হল না আমার। ওর সামনে এলেই আমি যেন সব ভাষা হারিয়ে ফেলি। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে। ও বলল, 'এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? একটা ধন্যবাদ দিন অন্তত।'

নিজেকে সামলিয়ে তখন আমি বললাম, 'ধন্যবাদ।'

ও তখন একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বেরিয়ে গেল। অপূর্ব সেই হাসি। চোখের সামনে অনেক্ষণ ভাসতে লাগল তার হাসিমুখটা।

রাতে মাকে সব কথা জানানোর জন্য চিঠি লিখতে বসলাম।  তখন দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। ভাবলাম তানিশা, তাই আমার  হার্টবিট বেড়ে গেল। চিঠিটা লুকিয়ে আমি দরজা খুলে দিলাম। কিন্তু তানিশার আম্মুকে দেখে আশাহত হলাম। হার্টবিট কমে স্বাভাবিক হয়ে গেল। উনি এসেছেন আমার সাথে পরিচিত হতে।  কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা দেখতে।

আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, 'না আন্টি, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। বসুন না?' একটা চেয়ার এগিয়ে দিলাম উনার দিকে। তখন রুমের ভেতর প্রবেশ করল তানিশা। কমে যাওয়া হার্টবিটটা আবার বাড়তে শুরু করল। চেহারায় অন্যরকম একটা পরিবর্তন হতে শুরু করল আমার।

তানিশা এসেই বসল মায়ের পাশের চেয়ারে। আমি  ওর দিকে তাকাতে পারছিলাম না, কী না কী ভাবে সে এটা ভেবে। তবুও কোণাচোখে দেখতে লাগলাম  ওর মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে। কয়েকবার ধরা খেয়ে গেলাম। তখন অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে ফেলি, আর ও মুখটিপে হাসে শুধু আমার অবস্থা দেখে। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি অর্ধেক লেখা চিঠিটা আবার লিখতে বসলাম। কিন্তু কিছুই লিখতে পারলাম না। চোখের সামনে কেবল তানিশার চেহারাটা ভাসতে লাগল। লেখা হল না আর চিঠি।

পরদিন বিকেলে আমি একটা বই নিয়ে ছাদে উঠলাম। ছাদে বসেই আমি পড়তে লাগলাম বইটা। একটু পর তানিশা তার কয়েকটা বান্ধবী নিয়ে ছাদে এল। আমার হার্টবিট বাড়তে শুরু করল অটোমেটিক। একটু নড়েচড়ে বসলাম আমি। তানিশা তার বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে লাগল হাসতে হাসতে। আমি আঁড়চোখে দেখতে লাগলাম ওর হাসি। সেও মাঝেমাঝে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। তখন আমি মুখ নিচু করে ফেলি।

হঠাৎ তানিশা ওর বান্ধবীদের বলল, 'ভাবছি, এখন থেকে আর মোবাইল ইউজ করবো না। কারো সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে চিঠিতে যোগাযোগ করবো।'

তার কথা শুনে  বান্ধবীরা জোরে হেসে উঠল। তানিশা আবার বলল, 'জানিস, আমার না চালের গুড়োর পিঠা খেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু, আমার মা পিঠা বানাবে না বলছে এখন। ইচ্ছে করতেছে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শাশুড়ির হাতের বানানো পিঠা খাই।'

আবারো হেসে উঠল তার বান্ধবীরা। আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, কথাগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছে না তো? আমি মুখ তুলে তানিশার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। সেও কোণাচোখে দেখছিল আমায়। মুখ নিচু করে ফেললাম আবার।

তখন তার এক বান্ধবী হাসতে হাসতে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তোর আর কী কী ইচ্ছে করে?'

ও বলল, 'আর একটা ইচ্ছে তা হল, আমার যদি একটা শাশুড়ি থাকতো, আর উনি যদি আমাকে নীলশাড়ি গিফট করত একটা...'

এই কথাটি শুনে চমকে তাকালাম আমি তানিশার দিকে। ও এসব জানল কী করে? মানিব্যাগটা বের করে দেখলাম,  মায়ের চিঠিটা গায়েব! তার মানে ওটা কোনো না কোনোভাবে তানিশার হাতে পড়েছে। ইশ! ধরা পড়ে গেলাম! তাড়াতাড়ি বইটা বন্ধ করে ছাদ থেকে চলে যেতে লাগলাম।  তখন তানিশা ডাক দিল পেছন থেকে, 'দাঁড়ান মিস্টার...'

আমি থমকে দাঁড়ালাম। অপরাধীর মতো তাকালাম তার দিকে।  সে তার বান্ধবীদের চলে যেতে বলল। ওরা হাসতে হাসতে চলে গেল। তানিশা আমার শার্টটা মুঠো করে ধরে বলল, 'ভীতু কোথাকার!  ভালবাস অথচ বলতে পারো না?'

-মানে?' আমতা আমতা করে বললাম।

-মানে আমি সব জানি। অপেক্ষা করছিলাম কবে তুমি মনের কথা বলবে। পরে বুঝলাম তোমার দ্বারা এসব হবে না, তাই নিজেই ধরা দিতে এলাম।

-আপনি...আপনি এসব জানলেন কীভাবে?'

-চুপ! প্রেমিকাকে বুঝি কেউ 'আপনি' করে বলে? ঐদিন তোমার মানিব্যাগে চিঠিটা পেয়েছিলাম।

-সব জেনে গেছ তুমি?

-হুমমম, আমার ফেলে দেওয়া টিস্যুটা কী করছো?

-এটাও জানো তুমি?

-কী ভেবেছো? তুমি শুধু একাই নজর রাখ, আমি রাখি না?

-মানে তুমিও আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে?

-হ্যাঁ, আমার ছেড়া জুতোজোড়া কী করছো?'

-শয়তান মেয়ে, সব দেখতে কে বলেছে তোমাকে?'

তানিশা হেসে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তার স্পর্শে সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল আমার।

রাতে তানিশাকে পাশে বসিয়ে মাকে চিঠি লিখলাম। মাকে চিঠিতে বললাম, 'মা, খুব শীঘ্রি আসতেছি তোমার বউমাকে সাথে নিয়ে। নীল শাড়িটা যত্ন করে রাখ। আর চালের গুঁড়োর পিঠা বানাতে প্রস্তুতি নাও...।

 

*শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য