kalerkantho


কাঠগোলাপ কন্যা | নাঈম উল ইসলাম চৌধুরী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:২৭



কাঠগোলাপ কন্যা | নাঈম উল ইসলাম চৌধুরী

বসন্ত। চারুকলার বকুলতলায় ছায়া বিছানো। প্রায়ই কোকিল ডাকছে। এসব সজলকে টানছে না। আজকাল তাকে টানছে কাঠগোলাপ। এতদিন কতখানে ছিল কাঠগোলাপ। তখন এই ফুল এত ভাল লাগেনি! আজ অর্ণবের 'তোমার জন্য' গানটাও তার হঠাৎ প্রিয় হয়ে ওঠে। সে সাবধানে এগিয়ে আসে জয়নুল গ্যালারির পাশে কাঠগোলাপ গাছটার তলায়। সাদা বুকে হলুদ ছোঁয়া নিয়ে বিকেলের আলো ছড়ানো অজস্র কাঠগোলাপ। এগুলো সে মাড়াতে চায় না।
কারণ একদিন এমন বিকেলে এখানে দেখা সেই মেয়েটি হয়তো আবার আসবে, কাঠগোলাপ কুড়োতে। তারপর আলতো করে গুছিয়ে নেবে কানের কাছে লুটোপুটি খাওয়া চুলগুলো। তার বাধ্য চুলে কাঠগোলাপ ফুল ফুটে থাকবে। কালো সাদার চিরন্তন কন্ট্রাস্ট। তাকে কি সুন্দরই না লাগবে! সজল ভেবে আচ্ছন্ন হয়। বাইরে বেরিয়ে আসে সে। চারুকলার গেটে পেটিসবাক্স নিয়ে বসেন এক লোক। সে একটা দিতে বলে। ঢাকনা সরিয়ে তিনি খবরের টুকরো কাগজে পেটিস মুড়ে দেন। সজল হাতে নিয়ে দেখে, বেশ গরম। সে বলে,
'বাহ, আপনার পেটিস দেখি আসলেই হট। রহস্য কী?
 'হাহা, মামা আমার এই বাক্স হইল ওভেন'
সজল বলে,
'তাই তো দেখছি। পেটিসের ভেতরে পুরটা জোস। কীভাবে বানান?'
 'মশলাপাতি দেয়া লাগে। আর রান্ধনের হাত লাগে। আমার বউ করে। পুরটা বেকারিতে দিয়া আসি। তারাই বানায়। কম দামে করা যায়'
'মামির রান্নার হাত আসলেই ভাল'
'হ। একলাই সব করে। পোলাপান বিয়া দিয়া দিছি। দুইজন মানুষ'
'কী বলেন, তাহলে তো আপনার সংসার চালাতে কষ্ট'
'তা কিছুটা। আমি তো আছি! তিরিশ বছর হইয়া গেছে। সংসার তো থাইমা নাই'
সহসা একটা প্রশ্ন উঁকি দেয় সজলের মনে। এতবছরের সংসারের পেছনে আছে শুধুই ভালোবাসা নাকি দায়িত্বপালনও?


অক্টোবর মাস। থার্ড ইয়ার ফাইনাল আর কিছুদিন পরেই। সম্প্রতি প্রফেসর নাজিব স্যার সজলের এক্সপেরিমেন্টাল কাজগুলো বিশেষ পছন্দ করেছেন। তাই সে এবার ভাবছে, ট্যাপেস্ট্রি মাধ্যমে একটা চমৎকার বুনন করবে। মাথায় নিত্যনতুন ভাবনার সমাহার। তবে একটা ভাবনা পুরনোই থেকে যায়। সেই মেয়ে আর কাঠগোলাপ। এর মাঝে অবশ্য সেই মেয়েটি এসেছিল।

পহেলা বৈশাখের আগের দিন। তখন সজল আর তার মত সবাই প্রচণ্ড ব্যস্ত মঙ্গল শোভাযাত্রার অনুষঙ্গ তৈরি নিয়ে। একটা বিরাট হাতির কাঠের ফ্রেমে কালো রঙের কাগজে আঠা লাগাচ্ছিল আর জোড়া দিচ্ছিল সে। হাতির পায়ের অংশটুকুর কাঠ ঢেকে যখন কালো পায়ের রূপ নিচ্ছিল, তখনই সে দেখে সেই মেয়েটিকে। মানুষের ভিড়ে তারপর সে হারিয়ে গেল। দ্বিতীয়বার দেখার পর মেয়েটির স্কেচ হুবুহু এঁকেছে সজল। কেউ জানে না, সেই স্কেচ সবসময় সে বুকপকেটে রাখে। তবু বন্ধুবান্ধব তার এই আচমকা পরিবর্তন টের পেল।
কিরে সজল, তোর সব আর্টে খালি একটা মেয়ে আর কাঠগোলাপ। কাহিনি কি। সজল হাসে।


ফেব্রুয়ারি মাস। ফাইনাল শেষ। কারুশিল্প বিভাগের বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনী শুরু। চেয়ারম্যান স্যার প্রদর্শনীর জন্য বাছাই করেছেন সজলের ট্যাপেস্ট্রি ফর্মের শিল্পকর্মটি। শুধু তাই নয়, তার কাজ সম্মানসূচক পুরস্কারও পেয়েছে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আবদুশ শাকুর নিজ হাতে তাকে পুরস্কার দিয়েছেন। কাজটা করতে প্রথমে পাটের আঁশ থেকে সুতা সংগ্রহ করেছে সে। তারপর নানা রঙে সুতা রাঙিয়েছে। বুনেছে আলোছায়ার নকশা।

যদিও মূল থিম অতি সাধারণ, একটি রূপবতী মেয়ের প্রতিকৃতি। আর তার কাজের সীলমোহরের মতন আছে কাঠগোলাপ। কালো চুলে সাদা কাঠগোলাপের কন্ট্রাস্ট। সজল হয়তো জানেও না, সাদা ছাড়া লালচে রঙের কাঠগোলাপও আছে এই পৃথিবীতে!


 সজল ও ইরিন বসে আছে চারুকলার নিচতলার বারান্দায়। সাথে তার বান্ধবী রুমাও আছে। সজলের পুরস্কারের ছবি পত্রিকায় দেখার পর রুমা সহজেই চিনতে পারে ইরিনের প্রতিকৃতি। তারপর সে-ই ইরিনকে নিয়ে আসে সজলের কাছে। ইরিন হাত দিয়ে ধরে ধরে দেখে পুরস্কার পাওয়া কাজটি। কাঠগোলাপ আর তার মুখের আদল কি সে অনুভব করছে? এ মুহূর্তে ইরিনের সবকিছু রূপকথার মত মনে হচ্ছে।

সজল আর সে হলো রূপকথার নায়ক নায়িকা। ইরিনের শূন্য দৃষ্টিতে চোখাচোখি হয় সজলের। তারপরও তার চোখদুটো গভীর এবং মায়াময়। সজলের বুক কাঁপে। তার সেই পেটিস বিক্রেতা মামার কথা মনে হয়। গভীর ভালোবাসার টানে তিনি ত্রিশ বছর ধরে আছেন তার বউয়ের সাথে। সেরকমভাবে অন্তহীন ভালোবাসার শিল্পকর্মগুলো আজ ইরিনকেও তার খুব কাছে নিয়ে এসেছে। ভাঁজপড়া স্কেচটি বুকপকেট থেকে বের করে ইরিনের হাতে দেয় সজল। আজ থেকে ছবি নয়, স্বয়ং কাঠগোলাপকন্যা থাকবে তার হৃদমাঝারে।

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য