kalerkantho


পারফিউম | রিফাত রহমান পাপড়ি

রিফাত রহমান পাপড়ি   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:০২



পারফিউম | রিফাত রহমান পাপড়ি

তাড়াহুড়ায় হাতড়ে নিশি ড্রেসিং টেবিলের তিন নম্বর তাকের এক কোণায় ধুলিধূসরিত একটা পারফিউমের বোতল পেল। গাঢ় নীল রঙের ৭৫০ এমএল এর বোতল, নাম 'ব্লুবেরি চার্ম'। ফুঁ দিয়ে ধুলা ঝেড়ে নিশি বোতলটা টিউবলাইট বরাবর ধরল। সরু চোখে দেখে মনে হল একটু অবশিষ্ট আছে। সে বোতলটা পাইপের দিকে কাত করে বাম হাতের কবজির কাছে কয়েকবার স্প্রে করল। প্রথম দুইবার কিছু হল না, তৃতীয়বারে অনেকখানি পারফিউম ছিটে এসে পড়ল।

সাথে সাথে অদ্ভুত সুন্দর এক গন্ধে রুমটা ভরে গেল। যতটুকু পারফিউম বাকি, নানান কসরৎ করে নিশি গায়ে স্প্রে করল। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাগ আর ছাতা নিয়ে সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তার ইউনিভার্সিটি বাসার অনেক কাছে। হেঁটে যেতে ১০ মিনিট লাগে। অথচ প্রতি ক্লাসে আধাঘণ্টা দেরি না করে নিশি ঢুকতেই পারে না। আজকে প্রথম ক্লাসটা ফিলসফির।

আসাদ স্যার তাকে দেরি করতে দেখলেই বলেন,  'মক্কার লোক যে হজ্জ পায় না, এটা তোমাকে দেখলেই বুঝি।'

সকাল ১১ টা বাজে, অথচ বাহিরে আকাশ শেষ বিকালের মত। রাস্তায় নামতেই দমকা বাতাস এসে গায়ে লাগল। বৃষ্টি শুরুর পূর্ব লক্ষণ। নিশি লক্ষ্য করল, তার চোখ বারবার মাহিনদের পুরানো বাসার ছাদের দিকে চলে যাচ্ছে। রাস্তার শেষ মাথায় বাসাটা। তিন বছর আগে এই ছাদে এমনি এক বৃষ্টিস্নাত দিনে মাহিন ফুল আর চিঠি দিয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করেছিল। অনেকদিন নিশি সব ভুলে ছিল। আজকে পুরানো পারফিউমের গন্ধে কেন জানি তার মাহিনের কথা মনে পড়ছে। তিন বছর আগে সে নিয়মিত এই পারফিউমটা দিত। গন্ধের সাথে পুরানো সব সুখস্মৃতি বোতলবন্দি হয়ে ছিল।

নিশি দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করছিল, কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসে বারবার দাঁড়িয়ে যেতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে সে মেইন রোডে চলে এল। আশেপাশের দোকানগুলো দেখে আবার মাহিনের চিন্তা ফিরে এল। মোড়ে প্রথম দোকানটা 'মা কনফেকশনারি'। এখানে প্রতিদিন রাতে একবার দেখা করা দুই বছরের ফরজ কাজ ছিল। সারাদিন কোনো কারণে দেখা না হলেও রাতে টিস্যু পেপার অথবা শ্যাম্পু কেনার ছলে নিশি একবার অবশ্যই বের হত। মাত্র ১০ মিনিটের জন্য কারও পাশে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য এতো ব্যকুলতা ছিল কে জানত!

ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে তবু কি মনে করে নিশি 'মা কনফেকশনারি'র সামনে দাঁড়াল, 'একটা জুসপ্যাক দিন তো।'

- 'প্রাণ না সিজান দিব?'

- 'যা ইচ্ছা দিন। অসুবিধা নেই।'

মাহিনের প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন দোকান থেকে নিশিকে জুস খাওয়ানো। জুসপ্যাক ছাড়া দেখা করতে এসেছে এই ঘটনা বিরল। একদিন দুপুরে প্রচণ্ড রোদে সে জুসপ্যাক ছাড়া দেখা করতে এল। রিকশায় করে যাওয়ার সময় একটা স্কুলের সামনে হঠাৎ রিকশা থামিয়ে নেমে গেল। রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়িতে আম বিক্রি করছিল। বড়সড় হলুদ রঙের একটা আম কিনে এনে সে নিশিকে বলল,

- 'এখন এটা ফুটা করে তুমি খাবে, ন্যাচারাল ম্যাংগো জুস!'

কী অদ্ভুত একটা ছেলেই না সে ছিল। অজান্তেই নিশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ক্লাসে ঢুকতেই স্যার চশমার ফাঁক দিয়ে নিশিকে একনজর দেখলেন, 'এই যে এসেছেন ম্যাডাম! যান বসুন, আমরা এতক্ষণ আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।'

- 'সরি স্যার, রাস্তায় একটু জ্যাম ছিল।'

- 'তোমার বাসা থেকে না হেঁটে আসা যায়?' স্যার বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল।

- 'জী স্যার, কিন্তু আমি মাঝে মাঝে রিকশায় আসি তো। পা ব্যথা করে হাঁটতে।'

ক্লাসের অর্ধেক ছেলেমেয়ে জোরে হেসে উঠল। নিশি খুবই বিরক্ত হল। হাসির কোনো ঘটনা তো ঘটেনি।স্যার ক্লাসে মানুষের সোসাইটি গঠনের 'ফিলসফিক্যাল ভিউ' পড়ালেন। কেন, কী স্বার্থে মানুষ একসাথে থাকে; পরিবার গঠন করে ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনতে শুনতে একসময় নিশির চোখে পানি এসে গেল। কত ক্ষুদ্র জীবন নিয়েই না আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি। শুধু প্রিয় মানুষের পাশে থেকে কাটিয়ে দেবার জন্যও তো এই জীবন যথেষ্ট নয়। অথচ কত তুচ্ছ কারণেই না আমরা দূরে সরে যাই, ইগো নিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থেকে কষ্ট পাই।

সে চোখ নামিয়ে গোপনে চোখের পানি মুছে নিল। এসি রুমে পারফিউমের গন্ধ আরও তীব্র হয়েছে, এক মুহূর্তের জন্যও মাহিনকে ভুলে থাকতে দিচ্ছেনা। পাশে বসা ফারিয়া তার দিকে তাকিয়ে কনুই দিয়ে গুতা দিল। ফিসফিস করে বলল, 'কিরে অসহায় কাঙালির মত চেহারা করে রাখছিস কেন?'

নিশি দুর্বলভাবে একটু হাসল। ক্লাস শেষ হবার পর ফারিয়া আবারও বলল, 'তোকে মহিলা দেবদাসের মত লাগছে।মেয়ে দেখে দেবদাসের মত দাড়ি নাই।'

- 'যা, কী বলিস! আমার মাথাব্যথা করছিল।'

- 'ঢং করিস না, প্রেমে যে হাবুডুবু খাচ্ছিস চোখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।'

- 'উফফ না রে বাবা। ছয়মাস হয়ে গেছে আমি এখন ভ্যাটকাবো নাকি? খেয়েদেয়ে কাজ নেই।'
- ক্ষুধা লাগছে। চল ক্যান্টিনে যাই। এতই যখন দুঃখ ঢং করে ব্রেকআপ করার দরকার কি বুঝলাম না।'
- 'চুপ থাক, কথা বললে থাপ্পড় খাবি।'

নিশি প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল। ক্যান্টিনে যাবার পথে ঝুম বৃষ্টি শুরু হল। নিশি ফারিয়াকে নিচে নামতে বলে করিডোরে দাঁড়িয়ে গেল। বৃষ্টি দেখতে তার এতো ভালো লাগছে। যতবার দমকা বাতাস হয়, সে নিজের পারফিউমের তীব্র গন্ধে আচ্ছন্ন হয়। বৃষ্টির শব্দ, পারফিউমের নেশা ধরানো গন্ধ। দমকা বাতাস কিছুক্ষণের জন্য হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করল। নিশির মনে হল, তিনবছর আগের সেই বৃষ্টিস্নাত দিন জীবনে ফিরে এসেছে। হাত বাড়ালেই পাশে মাহিনকে স্পর্শ করা যাবে। দুই পা সামনে এগুলেই হাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজা যাবে। কান পাতলেই চিরচেনা চিরপ্রিয় কণ্ঠের সেই চিৎকার শোনা যাবে, 'আসো হা করে বৃষ্টি খাই।'

বজ্রপাতের কানে তালা লাগানো প্রচণ্ড শব্দে নিশির ঘোর কেটে গেল। চোখে অতলান্তের শূন্যতা নিয়ে সে পাশে তাকাল। কেও নেই, চারপাশে শুধু পারফিউমের নেশাধরানো অসহ্য গন্ধ...।

সন্ধ্যায় ক্লাস শেষ হল। ফারিয়াকে বিদায় দিয়ে বের হতে হতে নিশি দেখল বাহিরে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। তখনও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সে ছাতা খুলে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। সন্ধ্যায় চায়ের দোকানগুলোতে ভিড়, ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে। কোনো কারণে ল্যাম্পপোস্টগুলোতে এখনও আলো জ্বলেনি। নিশি অন্যমনস্ক হয়ে হাতটা কাছে নিয়ে কবজির কাছে গন্ধ শুকল। পারফিউমের গন্ধ অনেক হাল্কা হয়ে এসেছে।

সে আবার টেনে বুক ভরে লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিল। গন্ধটা এত কম কেন? নিশির অস্থির লাগছে। সে ওড়নায় মুখ গুজে আবার গন্ধ নিল। ওড়নায় গন্ধ নেই বললেই চলে। নিশি রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাতে ওড়নায় বারবার গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করল।

বাসার রাস্তা বাম দিকে। নিশি যাচ্ছে উল্টা রাস্তায়। সে আচ্ছন্নর মত হাঁটছে। যেভাবেই হোক তাকে এই পারফিউম যোগাড় করতে হবে। আজকে অনেকদিন পর এই গন্ধ তাকে পুরানো সেই ঘোরলাগা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়েছে। নিশির মনে হল, আরেকবার মন ভরে এই গন্ধ না নিলে তার জীবন বৃথা।

এই রোডের দ্বিতীয় গলিতে কয়েকপা হাঁটলেই 'সুগন্ধি বিতান' নামের একটা দোকান। এখন থেকেই কয়েক বছর আগে পারফিউমটা কিনেছিল সে। অনেকদিন পর সবুজ থাই গ্লাসের দরজা টেনে ভিতরে ঢুকল। সেলসম্যান এককোণায় মাগরিবের নামায পড়ছিল। কাউন্টারে একটা বারো তেরো বছরের ছেলে বসে আছে। নিশি অস্থিরভাবে অপেক্ষা করতে লাগল। পিছনের র‍্যাকে সে 'ব্লুবেরি চার্ম' এর গাঢ় নীল রঙের কোন বোতল দেখছে না।

পাঁচ মিনিট পর দোকানদারের নামাজ শেষ হল। নিশি বলল, 'শুনুন, তিনবছর আগে আমি এখান থেকে একটা পারফিউম কিনেছিলাম, নীল রঙের বোতল।'

- 'আপা, পুরানো সাপ্লাই তো নাই।'

- 'একটু খুঁজে দেখুন প্লিজ, নাম 'ব্লুবেরি চার্ম', গাঢ় নীল বোতল। এইযে এতটুকু...।

- নিশি হাত নেড়ে বুঝানোর চেষ্টা করল। দোকানদারকে একটু অবাক মনে হল।

- 'আপা, এই সেন্টটা আছে।'

- 'নেই বললেন কেন?'

- 'ছিলনা, গতমাসে এক কাস্টমার অনেক রিকোয়েস্ট করে আনাইছে। গতকালকেই নিতে আসার কথা ছিল। বৃষ্টির জন্য আটকা পরে গেছে মনে হয়।'

লোকটা বড় একটা বক্স থেকে একটা 'ব্লুবেরি চার্ম' এর বোতল বের করে  কাউন্টারে  রাখল। নিশির বাচ্চাদের মত আনন্দ হল।বোতলটা হাতে নিয়ে খুশি হয়ে সে কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখনি পিছনে দরজা সরিয়ে কেউ ঢুকল। দোকানদার হাসিমুখে পিছনে ইশারা করল, 'ঐ যে, সেন্টের আরেক কাস্টমার আইছে।'

পিছনে ঘুরে নিশি দেখল গা থেকে বৃষ্টির পানি ঝাড়তে ঝাড়তে মাহিন এসে ঢুকেছে। একমুহূর্তের জন্য নিশির মনে হল সময় থেমে গিয়েছে। তার হাতের পারফিউমের বোতলটার দিয়ে তাকিয়ে মাহিন বলল, 'তুমি আর আমি দেখি একই জিনিস খুজে বেড়াচ্ছি...।'

 

*শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।


মন্তব্য