kalerkantho


বাসন্তি লটকনটিয়া | মোঃ মোরশেদ

মোঃ মোরশেদ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৯:৫৯



বাসন্তি লটকনটিয়া | মোঃ মোরশেদ

কিচিরমিচির শব্দ কানে বাজছে, পাকপাখালির শব্দ। মনে হচ্ছে আমাজন কিংবা সুন্দরবনের মাঝ বরাবর হেঁটে চলছি। অথচ তা নয়; চট্রগ্রাম শহরে রিয়াজউদ্দিন বাজারের একটা গলি দিয়ে যাচ্ছিলাম। পাশের দোকান থেকেই শব্দটা আসছে, পাখির দোকান। হরেক রকমের পাক-পাখালি পিঞ্জিরা ভর্তি। কী সুন্দর সুন্দর পাখি! কোণার দিকে চোখ পড়ছে, প্যাঁচার মতোই দেখতে পাখি গুলো। প্যাঁচা নাকি? তাহলে কি জীবনানন্দ এই পাখিকেই 'প্রগাঢ় পিতামহী' বলেছেন? এমন সুন্দর নাম দেওয়ার কী আছে কে জানে, প্যাঁচা তো আহামরি কোন পাখি না।

মুখ গোমরা মানুষকে সবাই বলে, 'মুখটা প্যাঁচার মত করে আছিস কেন?' এর অর্থ হলো, প্যাঁচা আর প্যাঁচা মুখো মানুষ অশুভ। দোকানের ভেতরকার চারপাশের পিঞ্জিরা ভর্তি পাখির দিকে বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে বের হয়ে আসতে যাবো ঠিক তখনই আচনক একটা পিঞ্জিরার দিকে চোখ আটকে গেলো। এত্ত সুন্দর! পৃথিবীর সেরা দশটা সৌন্দর্যময় সৃষ্টির মাঝে অবশ্যই এই জোড়া পাখিটা থাকবে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি, হিমির একটা কথা মনে পড়লো।

হিমি একবার বলছে, 'শুনো যে কোন কিছু হঠাৎ পছন্দ হলে, বা প্রথম দৃষ্টিতেই ভালো লেগে গেলে সেই জিনিসটা অবশ্যই ভালো হবে। সাথে সাথে কিনে ফেলবে।'

আমি বললাম, ধরো স্কুল পড়ুয়া একটা মেয়ে চোখে পড়তেই ভালো লেগে গেলো, তখন কি করবো?

হিমি বললো, 'বলবে, আম্মু পড়াশুনা ঠিকটাক হচ্ছে তো? পড়াশুনা মন দিয়ে করবা। এই বয়স হচ্ছে একমাত্র পড়ার বয়স। আর শুনো, রাস্তা বরাবর হাঁটবে। এদিক ওদিক তাকাবে না, কেউ আম্মু ডাকলেও না। তুমি জগতের আম্মু না।'

দোকানদার ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। 'মিয়া ভাই মালের চাহিদা তো বাড়ছে দিনদিন, কথা ছিলো বিক্রির উপর কমিশন বাড়বে। কই ওদিকটার তো কোন গতি দেখছি না। আমরা ও তো বাঁচতে হবে, ঠিক কিনা?'

দোকানদার ফোন রাখার পর আমি বললাম, 'মামা, ওই পাখিটার নাম যেন কি?

- বাসন্তি লটকনটিয়া। পছন্দ হয়ছে?

- জি মামা, দামটা কত চাচ্ছেন?

- এই জিনিস তো বলতে গেলে বাজারে নাই, বনে জঙ্গলে নাই বাজারে থাকবে কোত্থেকে? যা হোক, দুই হাজারের কমে তো বিক্রি করি নাই, তয় আপনার পছন্দ যখন হয়ে গেছে কি আর করা, আঠারোশ দেন। ওই লতি, বাসন্তি জোড়া নামা। দর হয়েছে।

- উনার নাম কি লতি? - পুরা নাম হইলো গিয়ে, লতিফ। কেটে-কুটে ডাকি লতি। সময়ের অভাব ভাই। বড়ই অভাব।

- ও

কিন্তু বাসন্তি জোড়া অত দামে তো নেওয়া সম্ভব না, তেরোশ হলে দিয়ে দিন।

- কি কইলেন ভাই? এই বাজারে এক জোড়া কাক ও তো তেরোশ দিয়া পাইবেন না। আচ্ছা পনেরোশ দেন। লস গেলে ও করার কিছু নাই। আপনে হইলেন ক্রেতা, ক্রেতা মানে হইল অতিথি। অতিথির আতিথেয়তা হচ্ছে আগে, লাভ লোকসান পরে।

- জ্বি, কঠিন সত্য বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে ভাড়া বাদ দিয়ে বাকি আছে সাড়ে তেরোশ।

- আইচ্ছা কি আর করার, লস দিলাম। ব্যাবসাপাতি হইলো গিয়ে লাভ লসের হিসাব।

পিঞ্জিরা ভর্তি বাসন্তি জোড়া নিয়ে হাঁটছি। তরুণ বয়সে আহমদ ছফা নাকি পাখি কাঁধে ঘোরাঘুরি করতেন। সে মত চেষ্টা দেব নাকি? রাস্তার দুই পাশের ছেলেপুলেরা আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, এদের ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে গুণীন বান্দর কাঁধে হাঁটছে। জোরে জোরে পা ফেলে বাসে উঠলাম। বাসে বাচ্চাকাচ্চা আছে কিনা কে জানে!

'পাখি পাখি' করে কাঁদলে তো বুড়াবুড়িরা চারটা কথা শুনিয়ে দেবে, 'আরি ভাই পাখি বেইচা খান ভালো কথা, বাচ্চা কাঁদানোর কোন অর্থ হয়? যান, বাসের ছাদে গিয়া বসেন।' 

ঘরে ফিরেই হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। পিঞ্জিরা রুমের দরজার পাশে লুকিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলাম। হিমি তরকারি না কি যেনো কুটছে। সময় জুৎসই আছে, আমি মোড়া টেনে বসে বললাম।

- এই শোন কী হয়েছে, স্কুলে পড়তাম তখন পড়েছি আমাজন বনে নাকি বাসন্তি লটকনটিয়া নামে এক পাখি আছে। বড়ই সৌন্দর্য! আজ বাজারে সেই আমাজনের এক জোড় বাসন্তি পেয়ে গেলাম। কি অদ্ভুত! না? দাম অবশ্যি বেশি চেয়েছিলো, কিন্তু আমি তো ঠকার মানুষ না। দামাদামি করে মাত্র সাড়ে তেরোশ দিয়ে নিলাম।

- সত্যি? কোথায় কোথায়?

- এই তো দেখ, সুন্দর কিনা?

- অনেক, এই তুমি এতো ভালো কেনো?

- বিয়ের আগে আরো ভালো ছিলাম।

- কি বললা?

ভাবছি ঝগড়া শুরু হবে, কিন্তু না। হিমি খুশি মনেই পিঞ্জিরা নিয়ে ছাদে গেল। আমি উঠলাম পেছনে পেছনে। হিমি ছাদের মাঝ বরাবর দাঁড়াল। পিঞ্জিরার দরজা খুলেই বিড় বিড় করে কি যেন বলছে। এই মেয়ে খুশিতে পাগল হয়ে গেল নাকি?

হিমি বলছিল, 'এই যে বাবুরা, মন খারাপ? কতদিন বন্দি ছিলা? শুনো আজ তোমাদের ছুটি, রবিবাবুর 'ছুটি' না কিন্তু! মুক্ত জীবনের পথে ছুটি, যাও উড়ে....।

 

**শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।

 



মন্তব্য