kalerkantho


তোমাকে ভুলিনি মেয়ে | রোমেনা লাইস

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২০:২৯



তোমাকে ভুলিনি মেয়ে | রোমেনা লাইস

নীলফামারী সরকারি বয়েজ স্কুলে আজ অডিটোরিয়াম উদ্বোধন হচ্ছে। এমপি ও মন্ত্রী হিসেবে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন আমীরুজ্জামান বাবু। সকালের ফ্লাইটে সৈয়দপুর এয়ারপোর্টে নামতেই জেলা  প্রশাসনের প্রটোকল। আবার পার্টির লোকজনের ফুলেল শুভেচ্ছা। গাড়ির বহর স্কুলের গেটে পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছেন আমীরুজ্জামান বাবু। নীল ফিতা কাঁচি দিয়ে কেটে উন্মোচন করলেন প্রবেশ দ্বার। উদ্বোধনী ভাষণ দিতে হবে। কিন্তু তিনি কোথায় ছুটে চলেছেন?

ফ্লাশব্যাক .... পূর্ব পাকিস্তানের ছোট এক মহকুমা শহর। নীলফামারী। নীলকররা নীলচাষে বাধ্য করেছিল এখানকার চাষীদের। সেই থেকে শহরের নাম নীলফামারী। এই শহরে একজন এমপি ও মন্ত্রী আছেন। জনাব কায়কোবাদ হোসেন। তার দুই মেয়ে দুই ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে চাবাগানের ম্যানেজারের সাথে। ছোট মেয়ে সুলতানা হোসেন রুবি বালিকা নিকেতনে নবম শ্রেণিতে পড়ে। অসম্ভব রূপসী মায়াবতী এক মেয়ে। গান শিখেছে। খুব মিষ্টি তার গানের গলা।

দুই ছেলে আজাদ আর রাসেল স্কুলে পড়ে সিক্স আর সেভেনে। বালিকা নিকেতনের প্রধান শিক্ষিকা হলেন রাশেদা বানু। আর তার স্বামী আসিরুদ্দীন তালুকদার হলেন সহকারী প্রধানশিক্ষক। উনাদের দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে আমীরুজ্জামান বাবু। ছোট ছেলে মনিরুজ্জামান বাচ্চু। একমাত্র মেয়ে মনিরা পারভীন ঝরনা। সেই মহকুমা শহরে সকল অনুষ্ঠানে গান গায় সুলতানা হোসেন রুবি কায়কোবাদ সাহেবের মেয়ে। আর অনুষ্ঠানে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা আবৃত্তি করে জামান বাবু।

অপূর্ব সুন্দরী চটপটে মিশুক সেই মেয়েটির সাথে জামান বাবুর প্রেমে জড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। ছোট শহর, কথা কানে পৌঁছে যায় মন্ত্রী মহোদয়ের।

আমার মেয়ে করবে মাস্টারের ছেলের সাথে প্রেম? মেয়ে পড়ে নাইনে ছেলেটি কলেজে যায়। খুব বেশি চিন্তা করতে হলো না মেয়ের নিবন্ধনের আগে আগে সুলতানা রুবিকে চুনারুঘাটের চা বাগানে বড় মেয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সন্ধ্যার দিকে মা'কে বলে একঘণ্টার জন্য রুবি তার বান্ধবীদের কাছে বিদায় নিতে গেল। সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিলো নাসরিন আর জান্নাতুল। নাসরিনের বাসা বালিকা নিকেতনের পাশেই। নাসরিনের ছোটভাই ডেকে আনলো জামান মানে বাবুকে। রুবি বললো
-আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে কাল। আমাদের যাতে কোন যোগাযোগ না থাকে তাই।
 -আমরা ঠিক থাকলে কে কোথায় পাঠাচ্ছে পাঠাক।
-ভীষণ মন খারাপ লাগছে।
-যতদূরেই যাও মনে রেখো আমি তোমারই।
-আমি যেতে চাই না দূরে কোথাও। তোমাকে না দেখে থাকতেও পারবো না।

সেই সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরলো বালিকা। বাসায় ফিরে দেখে বাবা বারান্দায় সোফায় বসে সিগারেট টানছেন।
-কই গিয়েছিলে মা?
-আব্বা জান্নাতুল দের বাড়িতে।
-কেন?

-কাল ঢাকা যাব ত তাই দেখা করতে।
-ঠিক আছে ভেতরে যাও।
পরদিন সকালে মন্ত্রীর পিএ গিয়ে সুলতানার টিসি মানে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আসলো। সুলতানা তখনো জানে না সে কোথায় যাচ্ছে । তারপর সুলতানা হারিয়ে গেলো এই মহকুমা শহর থেকে। সুলতানা রুবি নামের ঝলমলে কিশোরী কোথায় গেল কেউ জানতে পারলো না। চাপা পড়ে গেল প্রতিভা। গান কবিতা আবৃত্তি।

জামান বাবু ঢাকায় মন্ত্রী পাড়ায় কায়কোবাদ সাহেবের বাসার সামনে সারাদিন থেকেও কোন খোঁজ পেলো না। তারপর এক নীরব বিকেলবেলা জান্নাতুল নামের মেয়েটি একটা হলুদখাম এনে দিলো বাবুর হাতে। বাবু জানতে পারলো চুনারুঘাটের এক চা বাগানে বড়বোনের বাসায় রুবিকে পাঠানো হয়েছে নির্বাসনে। ওখান থেকেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে হবে। দুই বছরে বহু কষ্ট করে জান্নাতুল এর খামে বাবুকে চিঠি পাঠিয়েছে রুবি। জান্নাতুলও কষ্ট করে পৌঁছে দিয়েছে বাবুকে। জান্নাতুল এর চিঠির ভেতর রুবি পেয়েছে বাবুর চিঠি।

ভাগ্যিস রুবির বড়বোন রুবির মায়ের মতোই সাদামাটা। দেড়বছরে পনেরো টা চিঠি। ম্যট্রিক দিয়ে বাড়ি আসলো

রুবি। কায়কোবাদ সাহেব খবর নিয়ে জেনেছেন মাস্টারসাহেবের ছেলেটি ইতিমধ্যে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে গেছে। ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসলো। বান্ধবী শিক্ষক সবাই খুশি। সংস্কৃতি অঙ্গনেও যেন

প্রাণ ফিরে এলো। চঞ্চল প্রজাপতি মেয়ে এখন একটু ধীরস্থির হয়েছে।

হরিণ চোখ কিছুটা আনমনে খুঁজে ফিরে কাউকে। নীলফামারী শহরে বাবুর বন্ধু আরো দুই বাবু। তিনজনই ঢাকায় পড়ে। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে,আর একজন মেডিকেলে। একজন বুয়েটে। বুয়েটের বাবু বাড়ি গিয়েছিল। ফিরে এসে জানালো
-বন্ধু তোমার পাখিতো বাড়ি ফিরেছে।

রাতের ট্রেনেই বাড়ি রওয়ানা হলো বাবু। বাবা মা অবাক। সেদিনই শেষবিকেলের আলোয় কলেজ স্টেশনের পাশে এক বাসায় দেথা হলো দুজনের। বাবু তো মুগ্ধ। মুখে কোনও কথাই আসে না। দীর্ঘক্ষণ হাতে হাত রেখে বসে থাকে।
-আব্বা আমাকে বড়পার চাবাগানের বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। চুনারুঘাট গার্লস স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়েছি। আব্বা বলেছেন -মাস্টারের বেটা ঢাকায় পড়তে চলে গেছে আমার মেয়েকে এখানকার কলেজেই পড়াবো। মেয়েটা আমার বাড়িতে থেকে পড়ুক।
-আমার কষ্ট হয়। খুব কষ্ট। বলে মৃদু হেসে বিদায় নিল বাবু। একটা ঠিকানা দিল কাগজে লিখে। চিঠি দিও এই ঠিকানায়। চলে গেল ঢাকা। ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বের হলে প্রথম বিভাগ পেল রুবি। কলেজে ভর্তি করে দিলেন রুবিকে। ক্লাস শুরু হলো। এদিকে বাবু ও নীলফামারী কলেজে এসে ভর্তি হয়েছে ডিগ্রি ক্লাসে। ক্লাস পালিয়ে মাঝে মাঝে এখানে ওখানে যায়। রিহার্সাল করে। মঞ্চে অনুষ্ঠান করে। রিহার্সেল রুম থেকে গান ভেসে আসে 'হয়তো তোমার জন্য হয়েছি প্রেমে যে বন্য, জানি তুমি অনন্য আশায় হাত বাড়াই।

কায়কোবাদ সাহেবের বন্ধু এক ডাকসাইটে ব্যবসায়ী খবিরউদদিন সরকার বলেন
-তুমি কী জান মাস্টারের ছেলে বাবু ঢাকায় অনার্স পড়া বাদ দিয়ে নীলফামারী কলেজে ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হয়েছে? -বলো কী? আমিতো খবরই জানি না। আমিত এসেম্বলিতে করাচি আর ঢাকায় ছিলাম। আমার গিন্নি তো এসবের কোনও খবরই জানে না। পরদিন কলেজে ফোন করে খবর নিয়ে দেখলেন খবর সত্য। মেয়েকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।

সেই রাতে জান্নাতুল এর বাসার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে বাবুর সাথে দেখা করল রুবি। সেই ষোড়শীর সেই মুখ সেই কাজল কালো চোখ তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে
-আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না এখনো কানে বাজে। আজও চোখে ভাসে। বুকের পশমে এখনো লেগে আছে

কোমল কিশোরী স্পর্শ। ঠোঁটে এখনো লেগে আছে চোখ বেয়ে নামা নোনা জলের স্বাদ। কত দিন কতো বছর?

কতো যুগ? মনে নেই। চারপাশে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।

রুবিকে ঢাকায় নিয়ে আর কোন রিস্ক নিলেন না কায়কোবাদ সাহেব। সাতদিনের মধ্যে ব্যবসায়ী পাত্রের সাথে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। কঠিন নজরদারিতে রাখা হলো রুবিকে। বাড়ির গেটের কাছে বাবুকে দেখে গেটম্যান তাকে জানাতেই ট্রাংকল করলেন
-হ্যালো মাস্টার। তোমার ছেলে আমার মেয়ের বিয়েতে কোনও ঝামেলা করলে আমি কিন্তু গুলি করে উড়িয়ে দেব বলে দিলাম।
-আমি বেঁচে থাকতে আপনার মেয়ের বিয়েতে ঝামেলা করবে আমার ছেলে? প্রশ্নই আসে না।
উত্তর দিলেন আসিরউদদিন সাহেব।

'মাদার সিরিয়াস কাম শার্প।' টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ি গেল বাবু। এদিকে মহা ধুমধামে রুবি গুলশানে এক আলিশান বাড়িতে বউ হয়ে গেল। সব প্রেম বুকে নিয়ে একদম চুপচাপ একাকী হয়ে গেল বাবু। উসকো খুসকো চুল দাঁড়ি কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। সংসারী হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। বাবা মা অনেক বলে কয়েও রাজী করাতে পারলেন না। তেত্রিশ বছর কেটে গেল।

বরুণারা কথা রাখে না। বরুণারা ভালোবাসা বুকে নিয়ে অন্য ঘর আলোকিত করে। নির্মম নিয়তি। আজ

আমিরুজ্জামান বাবু ,মন্ত্রী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকারের ।
-দেখুন জনাব কায়কোবাদ সাহেব একজন মাস্টারের ছেলেও এমপি মন্ত্রী হয়।আপনি আপন অহমিকায় শুধু আপনার কন্যার হৃদয় পোড়াননি ।এক যুবকের প্রোথিত ভালোবাসাকে রক্তাক্ত করে হত্যা করেছেন। তাদের যৌথ সম্ভাবনাময় অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করেছেন। বুক পকেটে রাখা রুমাল দিয়ে চোখের কোণ মুছে অডিটোরিয়াম এর শুভ উদ্বোধনী ঘোষণা করলেন।

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিতগল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য