kalerkantho


মোহসেনা হোসেন ইলোরা'র গল্প

মোহসেনা হোসেন ইলোরা'র গল্প 'প্রাপ্তি'

মোহসেনা হোসেন ইলোরা   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৬:৪৪



মোহসেনা হোসেন ইলোরা'র গল্প 'প্রাপ্তি'

কনকনে শীতের রাত। ঘন কুয়াশার চাদর জরানো অন্ধকার মাঠ ঘাট চিড়ে ছুটে চলেছে ট্রেন।

প্রচন্ড শীতের প্রকোপে কাতর বৃদ্ধার মতো ঝিমিয়ে পড়া বাইরের নিশ্চুপ প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে কামরার ভেতরটাও ঝিমুচ্ছে। পুরো কামরা ঘুমে কাতর। শুধু ঘুম নেই একজনের চোখে। মনি, বড় আদরের নাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে সকলের কাছেই বড় অনাদরের, বড় অবহেলার। রাতের অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলা আকাশের তারাগুলোর সাথে নীরবে আলাপচারিতায় ব্যস্ত।

মনি ট্রেন বা বাস কোন জার্নিতে ঘুমাতে পারেনা। অন্য রকম একটা অনুভুতি হয়। ঘুম আসে না।

চারপাশের যতই কোলাহল যতই জনসমুদ্র থাকুক না কেন মনি বরাবরই একা, নি:সঙ্গ। তার এই নি:সঙ্গ, একাকী সময়গুলো সে নিজের মনে নিজের জগতে বিচরন করে। যে জগত একান্তই তার জগত। যেখানে থাকে না কোন নি:সঙ্গতা, একাকীত্ব। ইচ্ছে মতো মনি বিচরন করে তার জগতে। বাস্তব জীবনের টানা পোড়ন, ঘাত প্রতিঘাত, অবহেলা আর বিস্বাসভঙ্গের যন্ত্রনা গুলো যেখানে শুধুই অনাবিল সুখ হয়ে ধরা দেয়। হাজারো না পাওয়ার মাঝে কিছু কিছু প্রাপ্তি তার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। সেই সময়ের স্মৃতিগুলোই তার অবসরের একমাত্র সঙ্গী।

মঞ্জুর সাথে পরিচয়, খুব অল্প সময়ের জন্য তাদের কাছে আসা, একান্তে কাটানো সেই সময়টা ই ছিল যেন মনির কাছে স্বপ্নের মতো। খুব অল্প সময়ের জন্য কাছাকাছি এসেছিল দুজন দুজনার। অনাবিল সুখ, আনন্দ আর তৃপ্তির সমন্বয় জীবনে ওই কয়টা দিনই মনির কাছে পরম সৌভাগ্যের, চির স্মরণীয় হয়ে আছে। শুধু তাই না যখনই মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা - এখনও যেন সেই অনুভূতি, সেই সুখ, সেই আনন্দে অনুরনিত হয়। নিজের মনেই খুশি হয়ে ওঠে, আর অজান্তেই ভীজে ওঠে চোখ। ভীজে ওঠা চোখের অশ্রু যেন শুধু বিরহ বা বিচ্ছেদেরই না, কেমন যেন একটা আশার আলোর আভাস ছড়িয়ে যায় মনে। কষ্ট হয় খুব, বুকটা ব্যথায় চিন চিন করে ওঠে। মাথার শিরায় দপদপিয়ে তীব্র একটা ব্যাথা ছড়িয়ে যায়। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুটুকু যেন ভেতরের বাষ্পটাকে বের করে দিয়ে আরও এক অন্যরকম অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় শরীরময়। কেমন যেন এক কষ্টকর সুখানুভূতি ছড়িয়ে দেয়। ভালো লাগে, অসম্ভব ভালোলাগে। এমনি এক অনুভূতি নিয়ে ছুটে চলা ট্রেনটার সাথে ছুটে ছলছে মনি। নিঝুম রাত, কামরার ভেতরটা যেন একটা হিম হিম আবরণে ঢাকা। যে যার মতো গুটি শুটি হয়ে সিটের ওপর জড়ো হয়ে আছে। প্রয়োজন ছাড়া যেন নড়াচড়া করাটাও রাজ্যেও আলস্যি। শীতের প্রকোপে অসহ্য আলসেমিতে সিটিয়ে আছে সবাই। কামরার বাইরের প্রকৃতি টা তো আরও কয়েকগুণ বেশি। ঘন কুয়াশায় ঢাকা ঘোলা প্রকৃতির মাঝে ঝাপসা দাড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন এক একটি ভৌতিক স্তম্ভ। মনির ইচ্ছে করছে জানালাটা খুলে বুক ভরে স্বাস নেয়। হিমেল ঠান্ডা প্রকৃতির একটা অংশ হয়ে যায়।   সাথে মগ ভর্তি গরম চা। ইচ্ছে করছে কুয়াশার চাদরে নিজেকে আস্টেপিষ্ঠে জড়ায় এই কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার। ট্রেনের জানালা খোলার প্রশ্নই আসেনা। তাইতো গুটিশুটি হয়ে তাকিয়ে থাকে জানালা ভেদ করে ঘোলা আকাশের দিকে আর আপনমনে হেডফোনে শুনতে থাকে তার প্রিয় সেই গান-    
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে
হৃদয় তোমরে পায়না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে......
কত আগে কবিগুরু লিখে গেছেন, অথচ মনে হয় যেন তার এই মুহুর্তের অনুভূতি। যে কথাটি বলতে চেয়েছিল অথচ বলা হয়নি।

শীত পড়েছে জাকিয়ে। মঞ্জুর কথা আজ আরও বেশি মনে হবার কারণ এরকম এক শীতের রাতেই তাদের প্রথম কথা। ফোনেই তাদের প্রথম আলাপ হয়েছিল। শীতও পড়েছিল সেবার। ভয়াবহ। মাত্র একসপ্তাহের শৈত্য প্রবাহ জানান দিয়ে গিয়েছিল শীত কাকে বলে। তখন বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিল মনি। চাকরী তো ছিলই, পাশাপাশি অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ততার শেষ ছিল না। আর ফোনের উপর ফোন তো ছিলই। আসলে নিজের নি:সঙ্গতা কে ঢেকে রাখতেই আর বেশী ব্যস্ত থাকতে চাইতো মনি। এরকম সময়েই একটা কল ছিল মঞ্জুর। আর দশটা ফোনের মতোই মনি রিসিভ করে। ভরাট কন্ঠে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে থাকে মঞ্জু। মনি কথা বলার ব্যপারে যথেষ্ট খুতখুতে হলেও মঞ্জুর কণ্ঠ তার কথা বলার স্টাইল- ব্যক্তিত্ব, মনি এটুকু বুঝতে পারে যে তিনি ফালতু টাইপ কেউ হবেন না। তার উপর ভদ্রতাজ্ঞান টা মনিকে আকৃষ্ঠ করে। বাচাল মনির কথা বলাতেই যত আনন্দ। যদি কথা বলে ভালো লাগে তবে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে পার করে দিতে পারে সে। তার স্বভাব সুলভ চঞ্চলতায় ঢেকে রাখতে পারে না। হরবর করে কথা বলতে থাকে। প্রথম ফোনালাপেই মনির জড়তাবিহীন প্রাঞ্জল কথা মঞ্জুর মনেও দাগ কেটে যায়। এরপর থেকে মাঝে মধ্যে হঠাৎ কথা হতো। এই কেমন আছেন? কেমন চলছে? এইসব। মনে মনে দুজনই দুজনার ফোনের অপেক্ষা করতো ঠিকই নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করেনি বা কখনো একে অন্যের বিরক্তির উদ্রেক করেনি। শেই শুরু। তবে শুরু হলেও দুজনেই যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন তাই মার্জিত ভাবেই চলে কথপোকথন।  
মাঝবয়সী মঞ্জু দেশ বিদেশ ঘুরে অবশেষে তার নিজের শহরেই স্থায়ী হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জীবনের ভুল বোঝাবুঝির স্বীকার হলেও পারিবারের দিকে তাকিয়ে সব কিছুই মেনে নিয়েছিল । দায়িত্বের দায়বদ্ধতা বলে একটা কথা আছে। বিবেকের তাড়না আর দায়বদ্ধতা তাকে চরম বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য করেছে। প্রচুর বন্ধু বান্ধব আর শুভাকাংখী থাকলেও কারো সাথে হৃদয়ের হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি। অন্তরঙ্গতা অনেকের সাথে থাকলেও কাউকেই তেমন ভাবে বিশ্বাস করতে পারেনি মঞ্জু। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে নি:স্বার্থ বন্ধু বলতে যা বোঝায় তেমন কারো খোজ পাননি এখনও। যতবারই বিশ্বাস করতে চেয়েছেন, ততবার ঠকেছেন। সবাই কেমন যেন স্বার্থের জন্য বন্ধুত্বে আগ্রহী।   সে কারনেই হতাশাগ্রস্থ আর নি:সঙ্গ জীবনটাকে একাই বয়ে বেড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল ছিল সে। সকলের কাছে একটা দায়িত্ব পালনের যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না। তারও যে একটা মন আছে, সেও যে একজন রক্ত মাংসের মানুষ সেটাই ভুলে যায় সবাই। তবুও কারো বিপদে আপদে মঞ্জুরই ডাক পড়ে সবার আগে। আর মঞ্জুও সব কিছু ভুলে ছুটে যান । সকলের উপর একটা অভিমান একটা না বলা কষ্ট নিয়েই হাসিমুখে বয়ে বেড়ান সব দু:খ, কষ্টগুলো।
আর মনি, তার কথা আর কিই বা বলবো। নিজেকে খুব বুদ্ধিমতি ভাবলেও আদতে খুব বোকা। সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে আর ধোকা খায়। তবে অসম্ভব প্রানবন্ত একজন মানুষ। সুখ-দু;খ, হাসি-কান্না, প্রাচুর্য-অভাব, অবহেলা আর করুনা ভরা জীবনে, তার উচ্ছলতা, প্রানবন্ততা আর হাসিখুশি স্বভাবের কারনে বন্ধু মহলে সবার কাছেই প্রিয়। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস - বন্ধুদের কাছে এক কথায় যে দেবীতুল্য, আপন আত্মীয়দের কাছে সেই সবচেয়ে অনাদরের। এই অনাদর আর অবহেলা যতবার তাকে ভেঙ্গে দিয়েছে ততবারই আবার দ্বিগুন মনোবল নিয়ে নিজেকে স্থির করেছে। ততবার উঠে দাড়াতে চেষ্টা করেছে। তার এই মনোবলটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কথা বলা যেন মনির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কথা বলতে সে খুব পছন্দ করে। কথা বলার মাঝে যে কেউ এত আনন্দ পেতে পারে তা মনিকে না দেখলে বোঝা যাবে না। সেদিনও কোন কারন ছাড়াই কারো সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করছিল। আত্মীয়- স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব বা পরিচিত কারো সাথে না। কারো সাথে ই কোন দায়িত্ব নিয়ে কথা না শুুধু ই কথা বলার জন্য কথা বলতে চাচ্ছিল মনি। তখনই মঞ্জু কে ফোন দেয় সে। কোন কারন ছাড়াই হ্যা, না, কেমন আছেন? কেমন চলছে? এই সব কথা চলছিল দুজনের মাঝে। দুজনেই ঠিক স্বাভাবিক আচরন করতে পারছিল না, কোন কথা খুজে পাচ্ছিল না। বিদেশে থাকা মঞ্জু শীত নিয়ে অনেক উপদেশ দেয় মনিকে। খুব সাবধানে থাকতে বলে। এবারের মতো শীত আর পড়ে নাই। এসব শুনে মনে মনে অস্বস্তি আর হাসিটুকু এড়িয়ে যথেষ্ট গাম্ভীর্য বজায় রেখে কথা বলতে গিয়ে আর বাড়তি গাম্ভীর্য দেখাতে গিয়ে প্রানখোলা হাসিতে ফেটে পড়ে একসময়। আর এটাই যেন মঞ্জু কে নাড়া দেয়। এমন ভাবে প্রানখুলে কেউ হাসতে পারে তাও মাত্র কয়দিনের পরিচয়। মনির হাসিটাই যেন বলে দেয় যে আর যাই হোক কোন ছল-চাতুরী বা ভন্ডামি নেই তার মাঝে। তার পর থেকে কথা হতো প্রায়ই। ক্রমেই মনি জানতে পারে মঞ্জুর না বলা কথা। মঞ্জুও জানে মনির কথা।
একজন ঢাকায় আর একজন ঢাকার বাইরে। কিন্তু আলাপচারিতায় খুব কাছে আসে দুজন। দুপ্রান্তের দুই বাসিন্দা যেন এতদিনে মনের মিল খুজে পায়। কিন্তু সমাজ সংসার আর বিবেক তাদের দুজনকে দুই প্রান্তে ই আটকে রাখে। দেখা নেই, শুধু ফোনে কথা বলেই যে এতটা কাছে আসতে পারে। এতটা আপন হতে পারে কেউ- তার জ্বলন্ত প্রমান ছিল তারাই। কৈশর বা তারুন্যের চঞ্চলতা ছিল না তাদের। দুজনই প্রায় মাঝবয়সী হওয়ায় ছিল না বাধভাঙ্গা প্রেম। অথবা দেয়া-নেয়ার কোন সম্পর্ক। ছিল অসাধারন একটা সহজ সরল সুন্দর কিছুটা রোমান্টিক সম্পর্ক। শত খুজেও এমন কোন সম্পর্ক পাওয়া যাবে কিনা জানিনা। এত সুন্দর, সহজ সম্পর্ক থাকা সত্বেও দুজন দু-প্রান্তেরই বাসিন্দা রয়ে গেল। প্রচন্ডভাবে প্রত্যাশা আর আকাঙ্খার দ্বারপ্রান্তে পৌছাবার আগেই নিজেদের থামিয়ে দিয়েছে তারা। কেউ কিছুই বলেনি, হয়নি কোন জটিলতা তবুও যেমন খুব অল্প সময়ে তারা কাছে এসেছিল তেমনি করেই খুব অল্প সময়েই নিজেদের সামলে নিয়েছিল দুজন। কারন আর কিছু না, বিবেক, কর্তব্য আর দায়িত্ববোধ। তাদের মাঝে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল নিজেদের বিবেক, বিবেকের চোখে পরিবার, সমাজ, সংসারের দায়বদ্ধতা আর দায়িত্ববোধ। মনির মনে সবেমাত্র স্বপ্নগুলো উকি ঝুকি মারতে শুরু করেছিল। ক্ষীন একটা আশার আলো জ্বেলেছিল। কল্পনার রঙিন স্বপ্নগুলো ডানা মেলে আকাশে উড়াল দেবার আগেই থামিয়ে দিল নিজেকে। স্বপ্নটা বাস্তবতার আলো দেখার আগেই মঞ্জুর পরিবারের শান্তির কথা চিন্তা করেই নিজেকে সরিয়ে আনে। তার কারনে মঞ্জুর জীবনে কোন সমস্যা হোক এটা মনি কখনোই চায়নি। আবেগ আর উচ্ছাসের মাত্রা যখন কমে আসে প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ তখনই খুজে পাওয়া যায়। কৈশরের চঞ্চলতার দিনগুলো পার করে, তারুন্যের উদ্দামতার দিন পেরিয়ে মনি আর মঞ্জুর এমন এক সময়ে, এমন বয়সে দেখা হয়েছিল যে বয়সে নি:সঙ্গতা আর একাকীত্ব পেয়ে বসে। তখন একজন সঙ্গীর সান্নিধ্য, শেয়ারিং ই পারে মানসিক প্রশান্তি দিতে। তেমন এক সময়ে ইচ্ছা থাকা সত্বেও, প্রবল আগ্রহ থাকা সত্বেও অদৃশ্য এক শেকলে বন্দি ছিল তারা। অস্পৃশ্য বিবেকের দেয়াল অবরোধ করে রেখেছিল তাদের আবেগ, তাদের ভালোবাসার আকঙ্খা। মনে মনে এখনও দুজন দুজনকে ভালো বাসলেও দুজনই নিজেদের মাঝে একটা দুরত্ব সৃষ্টি করেছে। সরিয়ে নিয়েছে।
দিন চলছে দিনের নিয়মেই। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে বছর.....! আজ কত বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু তবুও মনি ভুলতে পারেনা সেই দিনগুলোর কথা। আজ এতদিন পর সেই কথাগুলো কেন এভাবে মনে পড়ছে? কেন এত মঞ্জুকে মনে পড়ছে মনির। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট গুলোকে ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা ব্যস্ত যে যার মতো। তবুও কি ভুলতে পেরেছে কেউ? সত্যি কি ভুলে থাকা যায়? যদি সত্যি ভুলে থাকা যেত তবে নি:সঙ্গ একাকী মুহুর্তগুলো কেন মনি ভুলতে পারে না মঞ্জুকে? যেন মঞ্জুর এক অদৃশ্য বলয় ঘিরে রাখে মনিকে সবসময়। একটু একা, একটু অবসর হলেই চারদিক থেকে গ্রাস করে মঞ্জু নামক স্মৃতিময় উজ্জ্বল দিনগুলো। কেন চেপে ধরে মনিকে সেই স্মৃতি গুলো? আপন মনেই হেসে ওঠে। কেপে ওঠা ঠোটে কখনো বা শিশুর মতো প্রচন্ড অভিমানে গুমরে ওঠে ভেতরের দলা পাকানো কষ্টগুলো। হাহাকার করে ওঠে অবুঝের মতো। এ কেনর কোন উত্তর খুজে পায় না মনি। উত্তর না পেয়ে আপন মনেই নিজের সাথে কথা বলতে থাকে একাকী, অনর্গল।
আচমকা বিকট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা কে চুরমার করে ট্রেনটা থেমে যায়। কি হলো? উৎসুক, কৌতুহলী সবাই। কেউবা আরামের ঘুমে ব্যঘাত ঘটায় বিরক্ত। অবশেষে জানা গেল লাইন চেঞ্জ করা হবে। বেশ কিছুটা সময় লাগবে। আধা ঘন্টা তো বটেই। ট্রেন থেমেছে যমুনা ব্রীজ স্টেশনে। এ স্টেশনে তেমন একটা লোকসমাগম নেই বললেই চলে তার উপর আবার শীতের রাত! কনকনে শীতে জমে যাওয়া শরীরে রক্ত সঞ্চালন করেত অনেকেই নেমে পড়ে ট্রেন থেকে। আধা ঘন্টা বসে থেকে কি হবে তার চেয়ে একটু হাটাহাটি করা, একটু চা খেয়ে গরম হওয়া এই আর কি? একে তো বেশ রাত তার উপর মনি একা। একটু দ্বিধা দ্বন্দ থাকা সত্বেও নেমে পড়ে ট্রেন থেকে। উদ্দেশ্য স্টেশনের টি স্টল থেকে খাটি গরুর দুধের কড়া লিকারে পর পর দু কাপ চা খাওয়া। ট্রেনে একের পর এক টি ব্যগের চা খেয়ে মুখ পানশে হয়ে গেছে। ট্রেনের দরজায় দাড়াতেই হিমেল বাতাসের আলিঙ্গনে হাড় কাপিয়ে দেয়। ঠান্ডা বাতাসে বুক ভরে স্বাস নেয় মনি। প্লাটফর্মে নেমেই এদিক ওদিক খুজতে থাকে টি স্টল। পেয়েও যায় একটু এগুতেই। দোকানী আপাদমস্তক আবৃত হয়ে চা বানাতে ব্যস্ত। হঠাৎ করে এত রাতে ট্রেন থামাতে কাস্টমারের চাপ বেড়ে গেছে। দম ফেলার ফুরসত নেই। যতক্ষন ট্রেন থেমে আছে ততক্ষনই ব্যবসা। মনি ভীড় দেখে দোকানের ভীতরে ঢোকে না। বাইরেও বেশ কয়েকজন দাড়িয়ে চা-সিগারেট খাচ্ছে। মনি বাইরের দিকেই একপাশে দাড়িয়ে এক কাপ চায়ের কথা বলে দেখতে থাকে স্টেশনের ব্যস্ততা। মনির ঠিক সামনেই এক ভদ্রলোক উল্টোমুখী হয়ে সিগারেট জ্বালাতে ব্যস্ত। দোকানী ব্যস্ত হাতে চায়ের কাপটা ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিতেই ভদ্রলোক দোকানীকে হাত ইশারায় বলেন মনিকে আগে দিতে। দোকানী কাপটা মনির দিকে এগিয়ে ধরতেই মনি বলে ধন্যবাদ, আপনি আগে অর্ডার করেছেন আপনি নেন। আমার টা দেবে। কন্ঠস্বর টা শুনে ভদ্রলোক আর কিছু বলেন না।   কিছক্ষন থেমে কি যেন ভাবেন। তারপর হাতের সিগারেটটা জ¦ালিয়ে ঘুরে দাড়ান মনির দিকে। এতক্ষন কেউ কারো চেহারা দেখেনি। দোকানীর হাত থেকে কাপটা নিয়ে ভদ্রলোক মনিকে প্রশ্ন করেন - কিছু মনে করবেন না, আপনি কি মনি? মুহুর্তেই ঘটে যায় সবকিছু। মনির পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেপে ওঠে। ঝিম ঝিম করতে থাকে শরীর । এতো সেই কন্ঠস্বর! যে কন্ঠ সে গেথে রেখেছে হৃদয়ের অন্ত:স্থলে। কোন রকমে আমতা আমতা করে বলে - -  আ..আপনি মঞ্জু ? মনির বিষ্ফোরিত চোখের দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপটা এগিয়ে বলে... নাও মনি তোমার চা। সম্মোহিতের মতো হাত বাড়িয়ে কাপটা নেয় মনি। কিন্তু ভুলে যায় কাপে চুমুক দেবার কথা। দুজনই কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়। মঞ্জু নিজেকে সামলে আনমনে সিগারেটের ধোয়া ছেড়ে বলে - - চা খাও মনি, তোমার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক একটা রোবটের মতো চায়ের কাপটা মুখে তুলে নেয় মনি। ভুলে যায় কথা। যে মনি কথার খৈ ফুটাতো অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে সে যেন একদম বোবা হয়ে গেছে। কত কথা ছিল দুজনার। অথচ আজ দুজনেরই ভাষা হারিয়ে গেছে। মনে মনে মঞ্জু বলতে থাকে কত কথা - - মনি আমার মনি, কত রাত কেটেছে তোমাকে ভেবে। সেই তুমি আজ আমার সামনে, এভাবে.....কিন্তু..... ঝাপসা হয়ে আসে মঞ্জুর চোখও। ক্রিম কালার জমিনে কমলা পাড়ের শাড়ীতে জড়ানো মনিকে দু-চোখ ভরে দেখে মঞ্জু। নি:শব্দে চা শেষ করে দুজন। মঞ্জু আবার চায়ের অর্ডার দিয়ে মনিকে বলে, আমি জানি তোমার চায়ে আপত্তি নেই তাই তোমার অনুমতি না নিয়েই চায়ের কথা বলেছি, খাবে তো? ফ্যাকাশে মুখে একটু হেসে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় মনি। পাছে মঞ্জু তার চোখের পানি দেখে ফেলে। অকারনেই মেরুন রঙা শালটা ঠিকঠাক করে নেয়। কি বলবে ভেবে পায় না কেউ। নি:শব্দে সময় কেটে যায় তাদের। পর পর দুকাপ চা শেষ করতেই হুইসেল বেজে ওঠে ট্রেনের। চমকে উঠে দুজনেই। এক অজানা বিচ্ছেদ ব্যাথায় ব্যকুল হয়ে পড়ে। দুজনার চোখেই প্রবল তৃষ্ণা, হাহাকার কিন্তু বোবা অভিব্যক্তি। চল মনি তোমাকে তোমার কামরায় পৌছে দেই। বুক ভার করা বোবা কষ্টের বোঝাটা নিয়ে মঞ্জুকে অনুসরন করে মনি। কামরায় উঠার আগ মুহুর্তে মনি ঘুরে দাড়ায় কিছু বলার জন্য। কিন্তু গলার কাছে দলা পাকানো কষ্ট গুলো কিছুই বলতে দেয় না। কোন কথা ই বলা হয় না মনির। ঘোলা চোখের পানিগুলো নিরবেই গড়িয়ে পড়ে  গাল বেয়ে। মঞ্জু কথা খুজে পায় না। মনির গড়িয়ে পড়া চোখের পানিটা মুছে দিয়ে বলে ভালো থেকো। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মনি। ট্রেনটা হেলে দুলে এগুতে থাকে। কোন রকমে হাত নেড়ে বিদায় জানায় মঞ্জুকে। চাপা কান্নাটাকে আর ধরে রাখতে পারে না। মেরুন রঙা শালটাতে মুখ গুজে ভেঙ্গে পড়ে কান্নায়। মন, মানসিকতার এত মিল তবু কেন এত বাধা? কেন এত দেরিতে খুজে পেল দুজন দুজনকে? বিধাতার কি বিধান- হয়তো সময়মতো দেখা হলে খুব ভালো সঙ্গী হতে পারতো তারা। দুজনের মনেই এই গোপন যন্ত্রণা, একটা হাহাকার নিয়ে ফিরে যায় যে যার গন্তব্যে। ট্রেনের গতি বাড়ার সাথে সাথে মনির কান্নার বেগও বাড়তে থাকে। আসেপাশের কৌতুহলী যাত্রীদের কৌতুহল কোন কিছুই মনিকে থামাতে পারেনা। হঠাৎ করেই মাথায় কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করে মনি। ফোপাতে ফোপাতেই মুখ তোলে মনি। আরেকবার বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যায়। চমকে উঠে - মঞ্জু দাড়িয়ে আছে!! মনির মাথায় হাত বুলিয়ে মঞ্জু বলে - এভাবে ছেলেমানুষের মতো কাদলে চলবে? আচ্ছা বোকা মেয়ে দেখি তুমি। মনি কি বলবে ভেবে পায় না। দুষ্টু হেসে মঞ্জু বলে, কি আমাকে একটু বসতে দেবে না তোমার পাশে??
মনি ভুলে যায় স্থান, কাল, অবস্থান। আসে পাশের কৌতুহলী আর জিঙ্গাসু দৃষ্টি উপেক্ষা করে ঝাপিয়ে পড়ে মঞ্জুর বুকে। মঞ্জুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাদতে থাকে।
গাঢ় কুয়াশার চাদর ভেদ করে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে সাপের মতো একে বেকে চলা ট্রেনটার সাথে তাল মিলিয়ে মঞ্জু আর মনি নিজেদের নি:সঙ্গতাকে ভেঙ্গে এগিয়ে চলে অজানা ভবিষ্যতের পথে।

 


মন্তব্য