kalerkantho


দিপুর নানুবাড়ি ভ্রমণ

মোহসেনা হোসেন ইলোরা   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৫:৫৭



দিপুর নানুবাড়ি ভ্রমণ

সকালে নাস্তার টেবিলে আম্মুর ব্যস্ততা এত বেশি থাকে যে কোনও কথা বলার উপায় থাকে না। ব্যস্ততা থাকবে না কেন? সকাল সকাল সব কাজ গুছিয়ে ছুটবেন অফিসে। ঘরের কাজ, বাইরের কাজ সব মিলিয়ে কত যে কষ্ট করতে হয় আম্মুকে! তাও তো এখন আমার স্কুল ছুটি বলে কিছুটা রক্ষা। স্কুলে আনা নেয়া, বাসার রান্না সহ সব কাজই আম্মুকে করতে হয় একহাতে। এত কাজের ফাঁকে আম্মুকে আর কিছু বলার সুযোগ হয়ে ওঠে না দিপুর।

কথা ছিল নানুবাড়ি যাব। পরীক্ষার শেষে সবাই মিলে শীতের ছুটিতে।
পরীক্ষার আগে থেকে সেই উৎসাহ আর আনন্দের জোয়ারে ভাসছিল দিপু। কবে পরীক্ষা শেষ হবে। কবে যবো নানুবাড়ি। অনেক দিন নানুবাড়ি যাওয়া হয়না।

এ বছর যেহেতু পিএসসি পরীক্ষা ছিল তাই অন্যান্য বছরের চেয়ে চাপ টা ছিল অনেক বেশি। দিপু মনে মনে কত জল্পনা কত কল্পনা করে রেখেছে নানুবাড়ি গিয়ে কি কি করবে, কোথায় কোথায় ঘুরবে, কার কার সাথে খেলবে- কিন্ত সব আনন্দ মাটি হয়ে গেছে অবরোধের কারণে। নানুবাড়ি যাওয়া হচ্ছেনা এখন। শীতের ছুটিটা এমনি এমনিই কাটছে বাড়িতে বসে। অস্থির দিপুর দিন যেন আর কাটেনা। কতক্ষন ই বা গল্পের বই পড়ে আর টিভি দেখে কাটানো যায়। এখন কেমন যেন টিভি ও দেখতে ইচ্ছে করে না অথচ পরীক্ষার সময় টিভি দেখার জন্য প্রানটা আকুপাকু করতো। আর আম্মুটাও সাড়াদিন বাসায় থাকে না। আম্মু বাসায় থাকলে অনেক মজা হয়। একটু পরেই বের হবেন আম্মু। দিপুর মনমরা ভাব দেখে আম্মু জিজ্ঞেস করলেন কিরে শরীর খারাপ? পেট ব্যথা? মুখটা অমন শুকিয়ে আছে কেন? কিছু না বলে নাস্তার টেবিল থেকে উঠে পড়ে দিপু। আম্মু কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কাজে। দুপুরের খাবার তৈরী করে সব কাজ শেষ করে আব্বু-আম্মু একসাথে বেড়িয়ে পড়েন অফিসের উদ্দেশ্যে। যাবার আগে কখন কি করতে হবে, কখন কি খেতে হবে সব বলে যান।
একা একটুও ভাল লাগেনা দিপুর। কিছুক্ষণ টিভি দেখে উঠে পড়ে। ঘরময় পায়চারি করতে থাকে।
অফিসে পৌছে ফোন করে আম্মু-
-হ্যালো, কি করছো বাবা?
দিপু- কিছু করছি না আম্মু
আম্মু- কেন বাবা তোমার মন খারাপ নাকি অন্য কিছু? আব্বু কি তোমাকে বকেছে?
দিপু- না আম্মু, সেসব কিছু না। এমনিই কিছু করতে ভালো লাগছে না।
আম্মু- টিভি দেখ
দিপু- না, টিভি দেখতেও ইচ্ছা করছে না।
আম্মু- টেবিলের উপর দুপুরের খাবার ঢেকে রাখা আছে ঠিকমতো খেয়ে নিও। ফ্রিজে মিষ্টি আছে, অন্যান্য খাবার আছে ক্ষুধা লাগলে খেয়ো কেমন।
দিপু- ঠিক আছে আম্মু তুমি চিন্তা করো না।
আম্মু- ঠিক আছে আমি এখন কাজ করি তুমি খারাপ লাগলে আমাকে ফোন দিও।
দিপু- ওকে আম্মু, বাই। ফোনটা কেটে যায়।
শামিমা ফোনটা রেখে চিন্তিত হয়ে অফিসের কাজ শুরু করে। কিন্তু মন বসাতে পারে না কাজে। ছেলেটার আজ কি হলো মন খারাপ না শরীর খারাপ কিছুই তো বললো না। বরাবর চঞ্চল আর দুষ্টু দিপু কখনো চুপচাপ থাকে না। জেনে হোক না জেনে হোক কথা বলতেই থাকে। প্রয়োজনীয় কথা, অপ্রয়োজনীয় কথা অনবরত বলে যেতে থাকে। একটু চুপ করে থাকার জন্য কতযে বকুনি দেয় শামিমা। অথচ আজ চুপচাপ দিপুকে যেন অচেনা লাগছে। এমন তো কখনো হয় না। একটা অজানা দুশ্চিন্তায় মনটা জানি কেমন করে ওঠে। অবরোধের কারণে জনজীবনে এক অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়া হয়ে উঠছে না। ছেলেটার শীতের ছুটিটা ঘরে বসে বসেই কেটে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের যা অবস্থা, একা একা কোথাও যেতে দেয়া যায় না বাচ্চাদের। কখন যে কোথায় কি ঘটে সেই আশংকায় থাকার চেয়ে ঘরে বসে থাকা ভালো। দুশ্চিন্তা স্বত্বেও কাজে মন দিতে চেষ্টা করে শামিমা।
আব্বু আম্মু বের হয়ে যাবার পর দিপু কিছুক্ষণ বই পড়ে, কিছুক্ষণ টিভি দেখে, কিছুক্ষন ছবি আঁকে। কোন কিছুতেই যেন মন বসে না। বিরক্ত হয়ে বারান্দায় রোদে মাদুর পেতে বসে রাস্তায় তাকিয়ে ভাবতে থাকে সে। আজ মাথা থেকে কিছুতেই নানুবাড়ির চিন্তাটা দুর করতে পারে না সে। নানুবাড়ি মানেই হাজারো আনন্দের বন্যা। নানা-নানুর আদর। মামাদের কাছে আব্দার আর নানা রকম পিঠা খাবার ধুম। সেই কুয়াশা ঢাকা সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা- খেলাধুলার শেষ নেই। নেই কোন আব্দারের শেষ। আম্মুর বকুনি স্বত্বেও মামা-খালাদের আদরের শেষ নেই। এই সব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতে বারান্দায় মাদুরের উপর ই ঘুমিয়ে পড়ে দিপু। রোদের উষ্ণতায় গভীর ঘুমে ডুবে যায়।
শামিমা কিছুতেই অফিসে মন বসাতে পারে না। বার বার মনটা ছুটে যায় বাসায় দিপুর কাছে। মনমরা ছেলেটাকে বাসায় রেখে এসে মাতৃহৃদয় যেন মুচড়ে উঠছে। শামিমা দিপুর বাবাকে ফোন করে জানতে চায় আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে পারবে কিনা? দিপুর আব্বু জানায় আজ সন্ধ্যায় মিটিং, ফিরতে রাত হবে কিছুতেই আগে বাসায় যেতে পারবে না। অগ্যতা শামিমা সিদ্ধান্ত নেয় আজ লাঞ্চের সময় বাসায় চলে যাবে। কিছুতেই মন টিকছে না। ছেলেটা না জানি কি করছে? অফিসে বড় ঝামেলা হলেও কিছু করার নেই, বাচ্চার জন্য বাসায় তাকে যেতেই হবে। অনেক বলে কয়ে বসকে রিকোয়েস্ট করে অবশেষে ছুটি পায়। সোজা রওনা হয় বাসার উদ্দেশ্যে।
এদিকে দিপু বারান্দায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে সে নানুবাড়ী গেছে। অনেক হৈ চৈ অনেক মজা করছে। কুয়াশা ভেজা মাঠে ছুটোছুটি। দিপুর কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে সকাল বেলার পুকুর টা। কেমন যেন ধোয়া উঠতে থাকে পুকুর খেকে। নানু গরম গরম পিঠা বানাচ্ছেন। চুলার চারপাশে গোল হয়ে বসে সবাই পিঠা খাচ্ছে। ছোটমামা এই শীতে গামছা কাঁধে নিয়ে পুকুরে যাচ্ছেন গোসল করতে। পিঠা খেতে খেতেই দিপু ছোটমামার পিছু পিছু পুকুরের দিকে এগোতে থাকে। পেছন থেকে আম্মুর ডাক অগ্রাহ্য করেই সে কুয়াশা ঢাকা গ্রামের ধোয়া ওঠা পুকুরে নেমে যায়। আম্মু দৌড়ে আসেন পুকুর পাড়ে। ঠান্ডা লেগে জ্বর হবে দিপুকে ডাকছেন কিছুতেই দিপু উঠছে না পুকুর থেকে। আম্মুও গলা ফাটিয়ে, চিৎকার করে ডেকেই যাচ্ছেন………..।
শামিমা বাসার কাছাকাছি এসে ভাবে ছেলেটা খুব খুশি হবে অসময়ে তাকে বাসায় পেয়ে। ছেলের জন্য চিপস্ চকোলেট নিয়ে বাসায় গিয়ে দরজায় নক্ করে। একবার.. দুবার… তিনবার… কিন্তু দিপু দরজা খুলছে না কেন? কি হলো? কোনও বিপদ হলো নাতো? প্রচণ্ড ভয় আর আশংকায় অস্থির হয়ে ওঠেন শামিমা। খুব জোড়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন আর দরজা ধাক্কাতে থাকেন।
হঠাৎ দিপুর ঘুম ভেঙে যায়, শুনতে পায় অবিকল স্বপ্নের মতো কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে আর দরজা নক করছে। আরে এতো আম্মুর গলা…. আর দরজা ধাক্কানোর শব্দ। একটু দ্বিধায় পড়ে যায় দিপু, এসময় তো আম্মুর আসার কথা না, তাহলে? কে এল? একটু ভয় আর শঙ্কা নিয়ে দরজা খুলতেই আম্মু দিপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। দিপুও ভ্যাবচেকা খেয়ে বলে আম্মু এসময় তুমি?
শামিমা ছেলেকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে কি হয়েছিল বাবা? কি করছিলি এতক্ষণ? সেই কখন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছি খুলছিস না কেন? আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
দিপুও লজ্জা পেয়ে যায় আমতা আমতা করে বলে… এই তো .. কিছুনা… মানে আমি নানুবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম।
শামিমা অবাক হয়ে বলেন মানে!!! মানে আম্মু আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর ঘুমের মাঝে স্বপ্নে নানুবাড়ি গিয়েছিলাম।

 


মন্তব্য